কুন্তীর আর ধৈর্য রইল না। একেতেই তিনি মাদ্রীর ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়েই ছিলেন। কারণ তাঁর পুত্রলাভের ব্যাপারে কুন্তী যে সাহায্য করেছেন, সে সাহায্যের জন্য মাদ্রী নিজে কোনও অনুরোধ করেননি। রাজপত্নীর সমস্ত সচেতনতা বজায় রেখে, স্বামী-সোহাগিনীর সমস্ত অহমিকা বজায় রেখে স্বামীকে দিয়ে তিনি নিজের কাজ করিয়ে নিয়েছেন। কুম্ভী তাই ক্রুদ্ধ হয়েই ছিলেন। অতএব পাণ্ডু যেই না কুন্তীর কাছে মাদ্রীর বিষয়ে সামান্য প্রস্তাব করেছেন, অমনই ঝংকার দিয়ে কথা শোনালেন কুন্তী–আমি বলেছিলাম–একবার। একবারের জন্য তুই কোনও দেবতাকে আহ্বান কর, তুই পুত্রলাভ করবি। তা, সে কিনা আমাকে বঞ্চনা করে যমজ দেবতাকে ডেকে একেবারেই দুটি পুত্র লাভ করল–উক্ত সকৃদ দ্বধূমে লেভে তেনাশ্মি বঞ্চিত। ওর ওই কুবুদ্ধি দেখে সব সময়েই আমার মনে হয় ও আমাকে টেক্কা দিতে চাইছে আর ওর মতো দুষ্টা মহিলা এরকম করতেই পারে–কুস্ত্ৰীণাং গতিরীদৃশী।
কুন্তী মাদ্রীর ব্যাপারে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন। সপত্নী হিসেবে মাদ্রীই এই জটিলতা তৈরি করেছেন কুন্তীর মধ্যে। কুন্তী বললেন–আমি মহা-বোকা বলেই বুঝতে পারিনি যে, জোড়া-দেবতাকে একবার ডাকলেও জোড়া ছেলে হবে–নাসিষমহং মূঢ়া দ্বন্দ্বাহ্বানে ফুলদ্বয়ম্। অতএব তুমি আমাকে আর একটুও অনুরোধ করো না এবং এই অনুরোধটুকু না করলেই আমি মনে করব–তুমি আমায় বরদান করেছ।
পাণ্ডু বিরত হলেন। সত্যিই তো কুন্তী অনেক করেছেন এবং যা যা তিনি করেছেন সব পাণ্ডুর মত নিয়েই করেছেন। পুত্রহীনতার জন্য পাণ্ডুর যত দুঃখ ছিল, সে সব দুঃখ কুন্তী মুছে দিয়েছেন আপন ক্ষমতায়। অতএব পাঁচটি দেবোপম পুত্র নিয়েই তিনি পরম আনন্দে শতশৃঙ্গবাসী ঋষিদের সাহচর্যে দিন কাটাতে লাগলেন। পুত্রেরা বড় হতে লাগল।
এর পরে বেশ কিছুদিন গেছে। পাণ্ডু তবু হস্তিনাপুরে ফিরছেন না। এই না ফেরার কারণ কী, সে সম্বন্ধে মহাভারতের কবি স্বকণ্ঠে কিছু বলেননি। এমনকি ভরতবংশের গৌরবে পাঁচটি উপযুক্ত পুত্র লাভ করেও কেন তিনি হস্তিনায় ফিরছেন না, এটা খুব প্রাসঙ্গিক এবং সন্দেহ করার মতো প্রশ্ন। এতকাল রাজবাড়ি ছেড়ে এসে শতশৃঙ্গ পর্বতের আরণ্যক পরিবেশই তার খুব ভাল লেগে গেছে, অতএব রাজ্যে ফিরছেন না–এই যুক্তি মোটেই আদরণীয় নয়। আমাদের ধারণা–ধৃতরাষ্ট্র চক্ষুহীনতার জন্য রাজা হতে না পেরে যে গভীর দুঃখ পেয়েছিলেন, এ কথা পাণ্ডু ভালই জানতেন। তিনি এটাও জানতেন–ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যশাসন করতে খুব ভালবাসেন। পাণ্ডু তার হাতে রাজ্যভার ছেড়ে দিয়ে এলে তিনি অসীম মমতায় রাজ্য রক্ষা করছিলেন, তাই শুধু নয়, এই রাজ্য চালানোর অধিকার এবং ক্ষমতাটুকু তিনি বেশ উপভোগ করছিলেন।
সিংহাসন-লিপ্সু এই প্রার্থীর উপভোগে পাণ্ডু বাধা দিতে চাননি, বিশেষত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মনে এই ব্যাপারে দুঃখ আছে বলেই তিনি নির্লিপ্ত মনে বসেছিলেন শতশৃঙ্গের শান্ত আশ্রয়ে। এমনকি তার পাঁচটি পুত্রই যেহেতু গার্হস্থ নিয়মে জন্মায়নি, অতএব তার পুত্রগুলিকে পরিচয়। করিয়ে দেবারও একটা দায়িত্ব ছিল পাণ্ডুর। কিন্তু কেন জানি না, ক্ষোভেই হোক, করুণাতেই হোক অথবা মমতায়, পাণ্ডু ফিরে গেলেন না হস্তিনাপুরে।
এইভাবে দিন চলতে চলতে শতশৃঙ্গ পর্বতে বসন্তকাল এল। সমস্ত পাহাড় যেন ফুলে ভরে উঠল। পলাশ ফুল, তিল ফুল, চম্পক আর স্থলপদ্মের হাসিতে, কোকিলের কুহুতে। মধুকরের মন্ত্র-গুঞ্জরনে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হল, যাতে সমস্ত প্রাণীর মনের মধ্যে ভর করল। সম্মোহনের আবেশ–ভূতসম্মোহনে কালে কদাচিন্মধুমাধবে। শতশৃঙ্গবাসী পাণ্ডুও এই সম্মোহন এড়াতে পারেননি। তিনি তাঁর প্রিয়া পত্নীর সঙ্গে এ বনে সে বনে ঘুরে বেড়িয়ে বসন্তের শোভা দেখতে লাগলেন। কিন্তু নির্জন স্থানে যৌবনবতী রমণীর সাহচর্য লাভ করলে বাসন্তিক আবেশের সঙ্গে দেহাবেশও কিছু ঘটে। পাণ্ডুরও তা ঘটল–পাণ্ডো–বর্নং তৎ সম্প্রেক্ষ্য প্রজজ্ঞে হৃদি মন্মথঃ।
পাণ্ডু তার পত্নীর সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন বটে, কিন্তু সে পত্নী কুন্তী নন। তিনি মাদ্রী। পাণ্ডুকে একা একা ঘুরতে দেখে তিনিই তার বসন্ত-ভ্রমণের সহচরী হয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও দোষ ছিল না। মাদ্রী যৌবনবতী, কুন্তীর মতো তিনি গিন্নি-বান্নি নন। পাণ্ডুর কাছে তিনি এসেছেন বসন্তের আভরণে সজ্জিত হয়ে। তার গায়ের সুসূক্ষ্ম পরিধান ফুটাস্ফুট ব্যঞ্জনায় তার বয়স এবং যৌবন দুটোই প্রকাশিত করছিল। পাণ্ডু তাকে দেখে ধৈর্য রাখতে পারলেন নান শোক নিয়ন্তং তং কামং কামবলার্দিতঃ। কামনার বশীভূত হয়ে শূন্য বিজন বনচ্ছায়ায় মাদ্রীকে জড়িয়ে ধরলেন পাণ্ডু।
মৃগমুনির মরণান্তক অভিশাপের কথা তার একটুও মনে পড়ল না–তং শাপং নাম্ববুধ্যত। এই মুহূর্তে তিনি মাদ্রীর শরীর ছাড়া আর কিছু স্মরণ করতে পারলেন না। মাদ্রী অনেক বাধা দিলেন, অনেক অনুনয় করলেন; কিন্তু রাজার গায়ে তখন পশুশক্তি ভর করেছে। তিনি কোনও বাধা মানলেন না। আপন শক্তিতে তিনি মাদ্রীকে বশীভূত করলেন–বাৰ্যমানস্তয়া দেব্যা…সোন্বগচ্ছদ বলাদিব। মৃগমুনির অভিশাপ ছিল–মৈথুনে লিপ্ত হলেই পাণ্ডুর মৃত্যু হবে। সেই মৃত্যুর জন্যই যেন তিনি কামনার বশীভূত হলেন। রাজার ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি এবং বিবেক সব কিছু আচ্ছন্ন হয়ে গেল। মাদ্রীর সঙ্গে মৈথুনে লিপ্ত হবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হলেন।
