নিজের দুঃখ জানিয়ে এবার তার দুঃখের নিরসন কীভাবে হতে পারে, তারই উপায় বলছেন মাদ্রী। সেকালের দিনে সপত্নীর ব্যাপারে অনেক ধরনের জটিলতা ছিল। পুরুষের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই বহুবিবাহের চল থাকায় সপত্নীদের মধ্যে জটিলতাও ছিল অনেক। খোদ ঋগবেদে আমরা ইন্দ্রপত্নী পৌলমী শচীকে দেখেছি–স্বামীর চোখে সবসময় মধুরা থাকার জন্য অন্য সপত্নীদের ওপর তিনি প্রভুত্ব চেয়ে মন্ত্র পড়ছেন। যাতে তাঁর নিজের পুত্র-কন্যারা সপত্নী-গর্ভজাত সন্তানদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় এবং যাতে সপত্নীরা তার স্বামীকে আপন প্রভাবে প্রভাবিত করতে না পারে, সে জন্য পৌলমী শচী মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। পরিশেষে তার অভীষ্ট সিদ্ধি ঘটেছে এবং তখন তিনি সোচ্চারে বলছেন–আমি পেরেছি, পেরেছি, আমার সমস্ত সতীনদের আমি হটিয়ে দিতে পেরেছি, এখন আমার স্বামীর ওপরে এবং এই রাজ্যের ওপরেও আমি আমার একার প্রভুত্ব চালাতে পারব–
সমজৈষমিমা অহং সপত্নীরভিভূবরী।
যথাহমস্য বিরাজানি জনস্য চ।
ঋগবেদ ছেড়ে অথর্ববেদে আসলে দেখবেন, সেখানে সতীন-কাঁটা তোলার জন্য মারণ-উচাটন সব কিছুরই ব্যবস্থা আছে। মহাভারতের যুগে সমাজ অনেক পরিশীলিত। এখানে কুন্তীর সঙ্গে মাদ্রীর সুসম্পর্ক আছে। একে অন্যের জন্য যথেষ্ট ভাবেন। কিন্তু ভাবনা-চিন্তা, যুক্তি-তর্ক আছে বলেই মানসিক জটিলতাও আছে। মাদ্রী কুন্তীকে সোজাসুজি তাঁর মনের বাসনা জানালে আরও সুফল ঘটত বলে মনে করি। কিন্তু বড় রানী হিসেবে কুন্তীর ওপরে মাদ্রীর যতই শ্রদ্ধা থাকুক, তিনি কুন্তীর কাছে কোনওভাবেই নত হবেন না। তিনি কুন্তীর সঙ্গে নিজের তুল্যতার হিসেব কষে স্বামীকে দিয়েই আপন ইষ্টসিদ্ধি ঘটাতে চান।
মাদ্রী বললেন–কুন্তী যদি আমাকে একবার গর্ভধারণের সুযোগ দেয়, তবে আমার প্রতিও তার যথেষ্ট অনুগ্রহ প্রকাশ করা হবে, আর তোমারও সেটা ভালই হবে। তোমার বংশ বাড়বে। কিন্তু হাজার হোক কুত্তী আমার সতীন, তাকে আমি নিজের মুখে এ কথা বলতে পারব না–সংস্তম্ভো মে সপত্নীত্ব বক্তং কুন্তিসুতাং প্রতি। তবে হ্যাঁ, আমার ওপর যদি তোমার কোনও ভালবাসা থাকে, তবে তুমি তাকে এ কথা জানাতে পার। কিন্তু আমি বলব না।
পাণ্ডু মাদ্রীকে যথেষ্টই ভালবাসতেন, হয়তো কুন্তীর চেয়ে একটু বেশিই। ছোটবেলা থেকে নানান জটিলতার মধ্যে মানুষ হওয়ায় বিবাহিতা কুন্তীর মধ্যে যুবতীসুলভ চঞ্চল রমণীয়তার চেয়ে গৃহিণীসুলভ প্রবীণতা বেশি ছিল। এদিক দিয়ে ছোট রানী মাদ্রীর বিলাস-বৈদগ্ধ্য অনেক বেশি। তার বয়স কম, কিন্তু সরসতা বেশি। আর নিজের স্বামীর সঙ্গে সম্বন্ধে এই বিলাস-বৈদগ্ধীর সচেতনতাও তার যথেষ্ট। ফলে মাদ্রী তার প্রস্তাব পেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই পাণ্ডু তাকে বলেছেন–আমিও এই একই কথা ভাবছি, মাদ্রী! কিন্তু আমি তোমায় বলতে পারছি না। তুমি আবার আমার কথায় কী মনে কর না কর, সেই ভেবেই কিছু বলিনি, মাদ্রীন তু ত্বং প্রসহে ব ইষ্টানিষ্ট–বিবক্ষয়া। আমার ভাবনার সঙ্গে তোমার ভাবনা যখন মিলে গেছে, অতএব আমি এ বিষয়ে চেষ্টা করব। কেননা আমার ধারণা–আমি যদি কুন্তীকে বলি, তবে তিনি অবশ্যই রাজি হবেন।
পাণ্ডু অবশ্য সোজাসুজি কথাটা বলতে পারলেন না কুন্তীকে। আমরা যাকে ভণিত করা বলি, পাণ্ডু প্রথমে সেইরকম ভণিতা করা আরম্ভ করলেন। বললেন–তুমি আমার বংশের বিস্তার ঘটাও আর লোকের একটু উপকারও করো। তাছাড়া যশ, নাম, খ্যাতি বলে একটা জিনিস আছে না? এই যে দেখো দেবরাজ ইন্দ্র, তিনি তোত শত যজ্ঞ করে শতক্রতু হয়েছেন, কিন্তু তার পরেও তিনি যজ্ঞ করে গেছেন। কিসের জন্য? যশের জন্য–যজ্ঞেরিষ্টং যশোর্থিনা। এই যে দেখ, ব্রাহ্মণ ঋষি মুনিরা, তারা কত তপস্যা করেছেন, কত তত্ত্বজ্ঞান দান করেছেন, তবুও তারা আবারও গুরুর কাছে যান, গুরুসেবা করেন। কেন জান? যশের জন্য যশসোর্থায় ভাবিনি। আমি তাই বলছিলাম–তুমিও তোমার কীর্তি, যশ বৃদ্ধি করতে পারো। তুমি একজনের দুঃখ-সাগরের ভেলা হতে পারো। তুমি তো জানোনা মাত্রীর কোনও পুত্র নেই। তুমি তাকে একটি সন্তানের জননী করে তার অপার দুঃখ দূর করতে পারো; তাতে সকলে তোমার সুখ্যাতি করবে–সা ত্বং মাদ্রীং প্লবেনৈব তারয়ৈনাম্ অনিন্দিতে।
পাণ্ডুর কথা শুনে কুন্তী তাকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন–তুমি যা বলেছ ধর্মশাস্ত্রের নিয়ম তাই বটে। তুমি নিশ্চিন্তে থাক, এই অনুগ্রহটুকু আমি মাদ্রীকে করব। কুন্তী মাদ্রীকে ডেকে দুর্বাসার বশীকরণ মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বললেন–তুমি একবার মাত্র যে কোনও দেবতাকে এই মন্ত্রে আহ্বান করতে পারোসকৃচ্চিন্তয় দৈবত। আর তাতেই তোমার উপযুক্ত পুত্র হবে।
মাদ্রী কুন্তীর ইঙ্গিতটুকু ঠিকই বুঝেছেন। তিনি ভাবলেন–স্বর্গভূমিতে যমজ দেবতা হলেন অশ্বিনীকুমার। তাদের একক কোনও সত্তা নেই। অতএব তাদের আহ্বান করলে একই আহ্বানে দুটি পুত্র হবে। যে ভাবনা সেই কাজ। মাদ্রীর দুই পুত্র জন্মাল। রূপে গুণে অতুলনীয়, কারণ অশ্বিনীকুমারদ্বয় নিজেরাও খুব রূপবান বলে দেবতামহলে পরিচিত। সব মিলিয়ে পাণ্ডুর পুত্রসংখ্যা দাঁড়াল পাঁচ।
তদানীন্তন সমাজের সংস্কার অনুযায়ী শতশৃঙ্গবাসী ঋষিরা পাণ্ডুর ছেলেদের নামকরণ করলেন। বয়সের অনুক্রমে সে নামগুলি যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেব। পাণ্ডুর ছেলেদের বয়স যথেষ্টই কম, কিন্তু তাদের বাড়-বৃদ্ধি বেশ ভাল, দেখতে বেশ বড় বড় লাগে। পাঁচটি ছেলে যখন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, তখন পাণ্ডুর মনে হয় যেন পাঁচ দেবশিশু তার প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়াচ্ছে–দেবরূপান্ মহৌজসঃ। পর পর কয়েকটি দেবোপম পুত্র লাভ করে অপিচ এই পুত্রজন্মের মধ্যে তার সমস্ত সঙ্কোচ ঘুচে যাওয়ায় পাণ্ডুর মনের মধ্যে বোধহয় এক ধরনের বিকার কাজ করছিল। কিন্তু কুন্তীকে আবার অনুরোধ করলেন, যাতে মাদ্রী আরও দুয়েকটি পুত্র লাভ করতে পারেন।
