পাণ্ডুর ইচ্ছামতো কুন্তী দেবরাজ ইন্দ্রাকে সাদর আহ্বান জানালেন মিলনের জন্য। মিলন সম্পূর্ণ হল এবং গর্ভকাল পরিপক্ক হল ফান মাসের এক দিনের বেলায় পূর্বফাল্গুনী আর উত্তরফান্থনী নক্ষত্রের সন্ধিক্ষণে কুন্তীর তৃতীয় পুত্র জন্মাল। ফাল্গুন মাস আর দুই ফাল্গুনী নক্ষত্রের একত্র সমারোহে এই পুত্রের নামই হয়ে গেল ফাল্গুন অথবা ফানী–জাতস্তু ফাল্গুনে মাসি তেনাসৌ ফানঃ স্মৃতঃ। বালকের জন্মমাত্রেই আকাশ থেকে দৈববাণী হল–এ ছেলে কার্তবীর্য অর্জুনের মতো শক্তিধর হবে, শিবের মতো পরাক্রম হবে, এ করবে, সে করবে–এরকম শত কিসিমের ভবিষ্যদ–বাণী হল, যা মহাভারতের ঘটনা চলাকালীন ঘটবে।
ভবিষ্যদ-বাণীতে বিশ্বাস নাই করলাম। ধরে নেওয়া যাক অর্জুনের জন্মকালে শতশৃঙ্গবাসী মানুষ-জনেরা অনেক শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। এই শুভেচ্ছা জানানোর পৌরাণিক কল্পটি একটু বেশি মাত্রায় স্বর্গীয়। সেখানে স্বর্গে দুন্দুভি বাজাবে, পুষ্পবৃষ্টি হবে, লোকপিতারা আকাশ থেকে বীরপুত্রের মঙ্গল কামনা করবেন। গন্ধর্বরা গান গাইবেন, সেই গানের তালে তালে নৃত্য করবেন আয়তনোচনা অপ্সরারা। অর্জুনের জন্মলগ্নেও এই সমস্ত উত্সব ক্রমান্বয়ে ঘটল। আমাদের মতে এর মধ্যে লক্ষণীয় শুধু একটি অসাধারণী রমণী। মেনকা-সহজন্যা অথবা তিলোত্তমা-প্রমাথিনীর বিশাল বিশাল দলের মধ্যে তাকে বড় চেনা যায় না। কিন্তু ভবিষ্যতে এই রমণীর মোহন রূপের আলো ছড়িয়ে পড়ার অর্জুনের মুখে। তার নাম উর্বশী। পরে যখন অর্জুনের সঙ্গে উর্বশীর দেখা হবে, তিনি এই উর্বশী কিনা তাতে আমাদের সন্দেহ থাকবে এবং সন্দেহের নিরসনও ঘটবে সেই সময়েই এখন শুধু মনে রাখতে হবে যে, উর্বশী অর্জুনের জন্মোৎসবে নৃত্য করে গেলেন।
.
৯২.
অর্জুনের জন্মের সময়ে বেশ একটা অলৌকিক পরিবেশ সৃষ্টি হল। স্বর্গীয় নৃত্য, গান, আর স্তব-স্তুতিতে অর্জুনের জন্ম যেন উৎসবে পরিণত হল। আমাদের ধারণা–অর্জুনের জন্মে পাণ্ডু যে মহা–মহোৎসবে মেতে উঠেছিলেন, তারই যেন প্রতিরূপক এই স্বর্গীয় উৎসব। অর্জুনের জন্মে পাণ্ডু বেশ একটু উৎসাহিতও হয়ে উঠলেন। দুর্বাসার বশীকরণ মন্ত্র এবং কুন্তীর উর্বরতায় তিনি এতই খুশি হয়ে উঠলেন যে, তিনি আবারও কুন্তীর কাছে পুত্রলাভের জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন।
কুন্তী এবার বিরক্ত বোধ করলেন। না হয় তিনি দেবসঙ্গমের বশীকরণ মন্ত্র জানেন, না হয় যাঁদের সঙ্গে তিনি পাণ্ডুর অনুরোধে সঙ্গত হয়েছেন, তাঁরা দেবতা, কিন্তু দেবতা হলেও তো তারা পুরুষ বটে। অক্ষম স্বামীর অনুরোধে কুন্তী তিন-তিনবার সাগ্রহ অভিনয়ের স্মিতহাস্যে তিন দেবতার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। কিন্তু এই মিলনের মধ্যেও পর-পুরুষের চেতনাটুকু তাঁর সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়নি। স্বামীর অনুরোধে এবার তিনি তাই বিরক্ত হয়ে বললেন–খুব বিপদের সময়েও এই নিয়োগের পদ্ধতিতে চতুর্থ পুত্র উৎপাদনের কথা ভদ্রজনে অনুমোদন করেন না। তিন-তিনটি পুত্রলাভের পর এবার যদি ওই একই উপায়ে আমি চতুর্থ পুত্র লাভ করি, তবে লোকে আমাকে স্বৈরিণী বলবে, আর তারপরে যদি আরও একটি, মানে পঞ্চম পুত্র চাই, তবে আমাকে বেশ্যা বলবে লোকে–অতঃপরং স্বৈরিণী স্যাৎ পঞ্চমে বন্ধকী ভবেৎ। কুন্তী সানুনয়ে পাণ্ডুকে বললেন–তুমি ভদ্রজনের আচার–আচরণ জান। কাজেই সব জেনেও যেহেতু এমন অনুরোধ তুমি করছ, তাতে বুঝি তুমি কোনও ভাবনা বিচার না করেই বেখেয়ালে এ–সব কথা বলছ–অপত্যার্থং সমুক্রম্য প্রমাদাদিব ভাষসে।
পাণ্ডু আর কথা বাড়াননি। তিনটি পুত্র লাভ করে তিনি যথেষ্টই আনন্দ লাভ করেছেন এবং এর পরে কুন্তীর কাছে আর কীই বা তিনি চাইতে পারেন। ভরতবংশের পরম্পরা রক্ষার জন্য কুন্তীর কাছে তিনি ঋণী হয়ে গেছেন। পাণ্ডুর খুশি হবার আরও কারণ ছিল। ওদিকে ধৃতরাষ্ট্র শতপুত্র লাভ করেছেন, কিন্তু ভাইতে ভাইতে অসম্ভব শ্রদ্ধাভাব থাকা সত্ত্বেও যতটুকু রেষারেষি থাকে, সেই রেষারেষিতে পা জিতে গেছেন। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ পুত্রের চেয়ে বয়সে বড়। রাজবংশে এই বয়সাধিক্যের মূল্য আছে। পাণ্ডু এখানে জিতে আছেন।
কিন্তু কুন্তীরও পুত্র হল, গান্ধারীরও পুত্র হল। প্রসিদ্ধ ভরতবংশের দুই কুলবধূ পুত্রলাভ করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মর্যাদাও অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু এরই মধ্যে যে পুত্রহীনা রমণীটি আপন দুর্ভাগ্য বহন করে স্বামী এবং সপত্নীর উদ্ভাসিত মুখ সদা-সর্বদা দেখে যাচ্ছিলেন, তিনি আর কেউ নন পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী মাদ্রী। মাদ্রী অসাধারণ রূপবতী এবং যৌবনবতী। পুত্রলাভের ব্যাপারে তার নিজের কোনও দোষও নেই। এমন যদি হত যে, কুন্তীরও পুত্র নেই, তারও পুত্র নেই, তখন একই সু-সমতায় স্বামীর কাছে ধরা দিতেন তারা। কিন্তু কুন্তীর পুত্রলাভের পর থেকেই মাদ্রীর মনে একটি মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, তার মনের মধ্যে জটিলতাও কিছু বেড়েছে।
সেদিন শতশৃঙ্গ পর্বতের এক বিজন স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাণ্ডু। কুন্তী তাঁর তিন পুত্রকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কাছেপিঠে তপস্বী সজ্জনেরাও কেউ নেই। মাদ্রী আস্তে আস্তে পাণ্ডুর কাছে এগিয়ে এসে কিছু গোপন কথা বলার জন্য প্রস্তুত হলেন যেন–মদ্ররাজসুতা পাণ্ডুং রহো বচনমব্রবীৎ। মাদ্রী বললেন–তোমার পুত্র উৎপাদনের ক্ষমতা নেই, সে কথা আমি জানি এবং তাতে আমার দুঃখও নেই। কিন্তু আমি রাজকন্যা, আমার গর্ভধারণের যোগ্যতাও আছে, অবশ্য তাতেও আমি দুঃখ পাই না। ওদিকে গান্ধারীর শত পুত্র জন্মেছে, জেনেছি। তাতেও আমি এমন কিছু দুঃখ পাই না। কিন্তু তোমার বড় রানী কুন্তীর সঙ্গে আমার কিসের তফাত আছে? না রূপে, না গুণে। সব ব্যাপারেই আমরা সমান, কিন্তু সমান হওয়া সত্ত্বেও কুন্তীর পুত্র আছে, আমার নেই–এই দুঃখই আমাকে বিধে মারছে–ইদন্তু মে মহ দুঃখং তুল্যতায়ামপুত্রতা।
