পাণ্ডু এই তত্ত্বটা খুব ভালই বোঝেন। তাই তিনি এমন একটি পুত্র লাভ করতে চান যার মধ্যে ভাগ্য এবং পুরুষকারের মেলবন্ধন ঘটবে। তার মনে হল দেবরাজ ইন্দ্রের কথা। বৈদিক দেবকুলে যাঁরা প্রধান দেবতা ছিলেন–বায়ু, সূর্য, মিত্র, বরুণ তাদের কারও প্রভাবই কম নয়, কিন্তু সমস্ত দেবতারা ইন্দ্রকে রাজা হিসেবে বরণ করেছিলেন। এটাই তার ভাগ্য, তার দৈব। কিন্তু ইন্দ্রের নিজের গুণ হল অধ্যাবসায়, সাহস, শক্তি এবং উদ্যম। এইগুলিই তাকে অসুর-শক্তি নিধন করার ক্ষমতা জুগিয়ে দেবরাজ্য নিষ্কণ্টক করার সুযোগ দিয়েছে। পাণ্ডু তাই দেবরাজ ইন্দ্রের মতো একটি পুত্র চান। সেই পুত্রের মধ্যে ইন্দ্রের রাজকীয় প্রাধান্য তো থাকতেই হবে, আর থাকবে তার শক্তি, ক্ষমতা উৎসাহ।
পাণ্ডু জানেন–এমন একটি পুত্রের জন্য তাকে সাধনা করতে হবে। গুণবান পুত্রের জন্য ভাবনা এবং সাধনার কথা আমাদের প্রাচীনরা সদা সর্বদা বলে এসেছেন। শুধু কামনার মাধ্যমে উত্তম পুত্রের জনক হওয়া যায় না, উত্তম লোকপ্রিয় পুত্রের জন্য তপস্যা চাই, মনে মনে তার জন্য আসন পেতে রাখা চাই, তবে সুপুত্র জন্মাবে–এই ছিল তখনকার মানুষের বিশ্বাস। পুরাণ কাহিনীতে বহু উদাহরণ পাওয়া যাবে, যাতে দেখব পিতা-মাতা তপস্যা করছেন উত্তম পুত্র লাভের জন্য। লক্ষ্য করে দেখবেন–পুরাণ কাহিনীর অনেক পুত্র-কন্যারা অযযানি-সম্ভব। তারা সব হৃদয় থেকে জন্মাচ্ছেন। এমনকি এই পাঁচশো বছর আগে মহাপ্রভু চৈতন্যের জন্ম প্রসঙ্গেও এই হৃদয় থেকে পুত্র-জন্মানোর কথা বলেছেন চরিতকারেরা। আমাদের মতে–এই হৃদয় হল সুপুত্র-লাভের ভাবনার আসন, যেখানে মনের ঈপ্সিততম প্রথম স্থান লাভ করে।
পাণ্ডু আজ সেই বরপুত্র লাভের জন্য তপস্যায় বসছেন। বলতে পারা যায়–পাণ্ডু তার প্রথমজ পুত্রের জন্য তপস্যা করলেন না, দ্বিতীয় পুত্রটির জন্য তপস্যা করলেন না। হঠাৎ আজকে এই তৃতীয় পুত্রের জন্ম-সময়ে তার চেতনা হল? উত্তরে বলতে পারি–প্রথম পুত্রের পরামর্শে দুর্বাসার মন্ত্রের ঘোর লেগেছিল তার চোখে। কুন্তী যেমন অবিশ্বাসী হয়ে মন্ত্রপরীক্ষার জন্য সূর্যকে ডেকে এনেছিলেন, তেমনি পাণ্ডুর মনেও সংশয় ছিল। যার জন্য তিনি কোনও রিস্ক নেননি। ধর্মকে ডাকার পরামর্শ দিয়ে ধর্মজ সন্তানের আশ মিটিয়েছেন। দ্বিতীয় পুত্রের বেলায় তাঁর আশ্চর্যভাব মোটেই কাটেনি। ভেবেছেন–কুন্তী যা বলেছেন, তাই তো হল রে। এমন অনায়াসে এমন সুপুত্র লাভ! তাই তো, তাই তো, তাহলে একটি শক্তিমান পুত্র চেয়ে দেখি তো, হয় কিনা? তাও হয়েছে। এখন তিনি পুত্রলাভের পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত। মনে যেই স্থিরতা এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে চিরন্তন সংস্কারও তার মনের মধ্যে কাজ করেছে। পুত্রলাভের জন্য এই প্রথম তিনি কুন্তীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে ইম্ভলবঙ হচ্ছেন। বলছেন–সেই অমিতপ্রভাবশালী দেবরাজকে তপস্যায় সন্তুষ্ট করে আমি পুত্র লাভ করতে চাইতং তোষয়িত্ব তপসা পুত্রং লন্স্যে মহাবলম্। তিনি স্বর্গের দেবরাজ, তিনি আমাকে যে পুত্র দেবেন, সেই হবে আমার বীরশ্রেষ্ঠ পুত্র। আমি আজ থেকে কায়–মনো-বাক্যে সেই মহান পুত্র লাভের তপস্যা করবকর্মা মনসা বাঁচা তস্মাত্ তন্স্যে মহত্তপঃ।
পাণ্ডু শতশৃঙ্গবাসী মহর্ষিদের সঙ্গে পরামর্শ করে কুন্তীকে এক বৎসর ধরে এক কল্যাণকর ব্রত করার নির্দেশ দিলেন। পাণ্ডু নিজেও কঠোর তপস্যা আরম্ভ করলেন উপযুক্ত পুত্রলাভের জন্য–ভার্যয়া সহ ধর্মাত্মা পৰ্য্যতপ্যত ভারত। বীরপুত্রকামী দুই তাপস-তপস্বিনীর কষ্টকর প্রয়াসে সন্তুষ্ট হয়ে দেবরাজ দেখা দিলেন। পাণ্ডুকে তিনি আশ্বস্ত করলেন–গো-ব্রাহ্মণের রক্ষক এবং শত্রুদের দুঃখকারী এক উৎকৃষ্ট পুত্র লাভ করবে তুমি–দুহৃদাং শোকজননং সর্বান্ধব-নন্দন।
ইন্দ্রের কথা শুনে পাণ্ডু বড় খুশি হলেন। কুন্তীকে ডেকে বললেন–যেমনটি চেয়েছিলাম তেমনি হবে–যথা সংকল্পিতং হৃদা। তুমি এখন সেই পুত্রলাভের যত্ন করো। অলৌকিক শক্তিধর, সূর্যের সমান তার তেজ, অতি উদার এবং ক্ষত্রিয় তেজের একমাত্র আশ্রয় সেই পুত্র আমি লাভ করব বলে দেবরাজ অঙ্গীকার করেছেন। তুমি সেই পুত্রলাভের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রকেই আহ্বান করো–লব্ধঃ প্রসাদো দেবেন্দ্রাত্তমায়ূয় শুচিস্মিতে।
আমরা আগেও একথা বলেছি যে, মহাভারতীয় যুগের প্রথম কল্পেও বৈদিক দেবতা–কুলের প্রভাব মোটেই চলে যায়নি। ইন্দ্র হলেন বৈদিক দেবতাদের মধ্যে ক্ষত্রিয়, যোদ্ধা এবং রাজা। মহাভারতের পরিক্ষীণ বৈদিকতার কালে পাণ্ডু তাঁর এই তৃতীয় পুত্রটির মধ্যে বৈদিক ইন্দ্রের আর্কিটাইপ (archetype) দেখার চেষ্টা করছেন। সেই বৈদিক রাজার প্রভাব এখনও ক্ষুণ্ণ হয়নি।
আমরা পূর্বে দেখাবার চেষ্টা করেছি–এই যে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ইত্যাদি দেবতা–এঁরা উত্তমশ্রেণীর মানুষই। এটা নিশ্চয়ই বলা ঠিক হবে না যে, বৈদিকেরা তাদের যে নেতাটিকে ইন্দ্র বলে সম্বোধন করেছিলেন, সেই ইন্দ্র মহাভারতের যুগেও বেঁচে আছেন। পণ্ডিতেরা বলেন–বৈদিক আর্যরা বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিলেন এবং ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, সূর্য এঁরা একেকজন গোষ্ঠী-নেতা। ইন্দ্র অবশ্য নেতারও নেতা। বৈদিক যুগের যখন অবসান হয়ে আসছে, তখন সেই দেবোত্তম ইন্দ্রটি না থাকলেও ইন্দ্র-গোষ্ঠীর মানুযের। ছিলেন নিশ্চয়। তাদের আমরা ঐন্দ্রও বলতে পারি। তবে এ সম্বন্ধে সঠিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়, বলাটা ঠিকও হবে না। শুধু এইটুকু বলতে পারি–ইন্দ্রকুলের যে ব্যক্তিটি মহাভারতের যুগেও ছিলেন, অথবা যাঁকে ইন্দ্র বলে তখন নির্বাচন করা হয়েছিল, সেই ইন্দ্রকেই আহ্বান করার কথা পাণ্ডু জানিয়েছেন কুন্তীকে। নিয়োগ-প্রথার নিয়ম হল–কোনও উত্তম পুরুষকে দিয়ে পুত্রোৎপাদন করানো। এই নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও ব্রাহ্মণ বা অন্য কোনও উত্তম পুরুষের বদলে পাণ্ডু বৈদিক বর্গের দেব-পুরুষদের বেছে নিয়েছেন। আর সেই তৃতীয় পুত্রটির বেলায় একেবারে স্বয়ং দেবরাজকেই পাণ্ডুর পছন্দ হয়েছে!
