দেবতা হওয়ার দরুন ইন্দ্র বেশ কিছু ভবিষ্যদ্বাণীও করে দিলেন, যেগুলিকে আমরা পৌরাণিক কথকঠাকুরের অভ্যাস-চর্চা মনে করি। কারণ তা না হলে, কবে সেই মহাভারতের বিরাট যুদ্ধ বাধবে, আর সেই সময় পর্যন্ত কৃষ্ণ এবং তাঁর পিসিমার ছেলেটির মধ্যে যে সুসম্পর্ক থাকবে, তার সম্বন্ধে আগাম বলা যায় কী করে! অবশ্য দেবতা বলে মানলে সবই বলা সম্ভব। কিন্তু আমরা আপাতত দেবতার বিশ্বাসে না প্রবেশ করেও মহাভারতের কাহিনীর ঐতিহাসিকতা বিচার করার চেষ্টা করছি। সেই চেষ্টা যদি সফল করতে হয় তবে একটিমাত্র সংবাদই এখান থেকে সংগ্রহ করার যোগ্য। তা হল–ইন্দ্র তার আত্মজ পুত্র অর্জুনের প্রতি কৃষ্ণকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার কথা বলছেন।
ইন্দ্র অর্জুনের খবর দিতে কোনও দ্বিধাবোধ করেননি। পরিষ্কার জানিয়েছেন–কুন্তীর গর্ভে ভরতবংশের কুলগৌরব যে পুত্রটি জন্মেছে, সে আসলে আমারই পুত্র, তার নাম অর্জুন–ময়া পুত্রোর্জুনো নাম সৃষ্টঃ কুন্ত্যাং কুলোহঃ। ইতিহাসের দিক থেকে যেটা আরও জরুরী কথা, সেটা হল–ইন্দ্র অর্জুনের যতটুকু পরিচয় দিচ্ছেন, তাতে দেখছি অর্জুনের তখন অস্ত্রশিক্ষার পর্ব সমাপ্ত হয়ে গেছে। ইন্দ্র বলেছেন–দেবতাই বল, আর রাজাই বল, তুমি ছাড়া আর দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই, যে আমার অর্জুনের অস্ত্ৰগতি বুঝতে পারবে। সত্যিই সে ধনুর্বিদ্যায় অসাধারণ নৈপুণ্য লাভ করেছে–তস্যাস্ত্ৰচরিতং মার্গং ধনুষো লাঘবেন চ। নানুযাস্যন্তি রাজানো দেবা বা ত্বাং বিনা প্রভো।
ইন্দ্র অর্জুনের কথা অনেক বলেছেন, যা পরে ঘটবে, সে সব আগাম কথাও অনেক বলেছেন। কিন্তু পৌরাণিকের কল্পবৃক্ষ থেকে যে ঈপ্সিত ফলটি আমাদের ইতিহাসের তথ্য হিসেবে তুলে নিতে হবে, তা হল–কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে ইন্দোৎসবের প্রথা রুদ্ধ করে নিজের প্রভুত্ব স্থাপন করে ফেলেছেন, তখন ওদিকে হস্তিনাপুরে অর্জুনের অস্ত্রবিদ্যা সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। ততদিনে তিনি এক বিরাট ধনুর্ধর বীরে পরিণত হয়েছেন।
আমার সহৃদয় পাঠককুলের স্মরণ থাকবে যে, আমরা পাণ্ডুর দ্বিতীয় পুত্র ভীমের জন্ম–মাত্র কীর্তন করেই হঠাৎ হস্তিনাপুর থেকে মথুরায় চলে এসেছিলাম। চলে এসেছিলাম এই কারণে যে, বসুদেবের এই মহাপ্রভাব পুত্রটি পাণ্ডব ভীমের চেয়ে বয়সে ছোট। জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের অগ্রগণ্য পুরুষেরা মহাভারতের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে কালের গণ্ডী পেরনোর চেষ্টা করেছেন। এফিমেরিস ঘেঁটে তারা মহাভারতের কালে পৌঁছে গিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের সংস্থান বিচার করেছেন পঞ্চপাণ্ডব এবং কৃষ্ণের জন্মকালে। তাদের মতে পাণ্ডব-জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের চেয়ে এক বছর দু মাস আট দিনের বড়। দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম কৃষ্ণের চেয়ে চারমাস দশ দিনের বড়। আর এইমাত্র ইন্দ্রের মুখে তার পরম প্রিয় যে আত্মজ সন্তানটির খবর পেলাম, সেই অর্জুন কিন্তু কৃষ্ণের চেয়ে ছমাসের ছোট।
কৃষ্ণ অর্জুনের চেয়ে বড় এবং ভীমের চেয়ে ছোট বলেই আমরা ভীমের জন্ম-কথা বলেই মথুরায় কৃষ্ণ-জন্মের আসরে চলে গিয়েছিলাম। তবে আমরা প্রতিনিয়তই অপেক্ষা করছিলাম–কখন পৌরাণিক কথক ঠাকুর অর্জুনের প্রসঙ্গে আসেন। কৃষ্ণের জন্ম এবং কৈশোর কথা যৎসামান্য বলেছি, কিন্তু তার যৌবনের সন্ধিলগ্নেই অর্জুনের সম্বন্ধে একটা টিপ্পনী যেই পেলাম, তখনই আমাদের দায় আসে হস্তিনাপুরে ফিরে যাবার। কিন্তু হস্তিনাপুরে আমাদের এই মুহূর্তেই ফেরার উপায় নেই। কারণ হস্তিনাপুরের স্বীকৃত রাজা পাণ্ডু এখনও শতশৃঙ্গ পর্বতেই আছেন। তিনি তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ভীমকে লাভ করার পর দুর্বাসার মন্ত্রশক্তি এবং কুন্তীর অসামান্য ক্ষমতা সম্বন্ধে পরম নিশ্চিন্ত হয়েছেন। স্মার্ত ধর্মশাস্ত্রকারেরা বলেন মানুষের প্রথম পুত্রটিই হল ধর্মজ, অন্য পুত্র-কন্যারা কামজ। ধর্মজ এই কারণে যে, পুত্রহীনতার মধ্যে যে শূন্যতা থাকে পিণ্ড-লুপ্তি তথা বংশলুপ্তির যে আশঙ্কা থাকে প্রথম পুত্র জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে আশঙ্কা চলে যায়। পাণ্ডুর সে সব আশঙ্কা চলে গেছে। তিনি কুন্তীকে স্বয়ং ধর্মরাজকে আহ্বানের পরামর্শ দিয়ে সব আক্ষরিক অর্থে একটি ধর্মজ সন্তান লাভ করেছেন। দ্বিতীয় পুত্র ভীমকে তিনি কামনা করেছিলেন আপন ক্ষত্রশক্তির প্রতীক হিসেবে প্ৰাহু ক্ষত্রং বলজ্যেষ্ঠ–ইত্যাদি।
কিন্তু ক্ষত্রশক্তি অধিরাজ হবার যোগ্য নয়। এই শক্তির মধ্যে শুধু উন্মাদনা আছে। ভীম জন্মাবার পর পাণ্ডু এমন একটি পুত্র চাইলেন কুন্তীর কাছে, যিনি মর্তবাসীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ পুরুষ হবেন–কথং নু মে বরঃ পুত্রো লোকশ্রেষ্ঠো ভবেদিতি। এমন একটি পুত্র, যার মধ্যে দৈব এবং পুরুষকার একাকার হয়ে যাবে। অর্থাৎ দেবতার পরম আশীর্বাদ নিয়ে সে জন্মাবে, অথচ পুরুষকার প্রতি পদক্ষেপে তাকে মহিমান্বিত করবে। পাণ্ডু বলেছেন–দৈব এবং পুরুষকার, এই দুয়ের ওপর ভিত্তি করেই এই লোকযাত্রা চলে। পুরুষকার এমনই এক বস্তু যার সঙ্গে দৈব যুক্ত হয় সময়কালে–তত্র দৈবন্তু বিধিনা কালযুক্তেন লভ্যতে।
পাণ্ডু এই কথাগুলি কেন বলেছেন, তা আমরা জানি। দৈব এবং পুরুষকার–এই দুটির মধ্যে পুরুষকারের প্রাধান্য, আবার দৈবও কিন্তু ফেলনা নয়। এই পৃথিবীতে পুরুষকারহীন অবস্থায় যে শুধু দৈববলে বিশাল সাফল্য লাভ করে, মানুষ তাকে বলে–লোকটা ফাপা শুধু কপাল ওকে তুলে দিল। আর যে শুধু পুরুষকারের দ্বারাই সম্পদলাভের চেষ্টা করে, এবং দৈব যদি তাকে একটুও সহায়তা না করে সে শুধু সংসারে খেটে যায়, খেটেই যায়, আমরা তখন সেই মানুষটার ওপর মায়া করি–আহা বেচারা, এত খাটে তবু ওর ভাগ্য ফিরল না। নীতিশাস্ত্র তাই বলে–লোকাত্রার প্রতীক একটি অশ্ববাহিত রথের যদি একটি মাত্র চাকা থাকে, তাহলে যেমন সে রথে গতি আসে না, তেমনি দৈব কিংবা পুরুষকার যে কোনও একটিকে বাদ দিয়ে মানুষের জীবন-রথ চলতে পারে না।
