সব কিছুই যখন মিটে গেল, তখনই ইন্দ্রদেবের গভীর চিন্তা হল মনে। এত অত্যাচার, এত কষ্ট দিয়েও যখন কৃষ্ণের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারলেন না ইন্দ্রদেব, তখন তিনি কৃষ্ণের অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন হলেন। স্বর্গের ইন্দ্রসভা ছেড়ে তিনি এলেন ডুয়ে। সামান্য অহংকার তখনও বুঝি ছিল, তাই ঐরাবতের আরোহণ-মঞ্চটি তিনি ত্যাগ করেননি আরুহ্যেরাবতং নাগমাজগাম মহীতল। ইন্দ্র এসে দেখলেন–কৃষ্ণ সেই গোবর্ধন পাহাড়ের একটি পাথরের ওপর বসে আছেন। এত যে ঝড়-ঝাপটা গেল, এত যে ঝুট-ঝামেলা গেল, তাতে কৃষ্ণের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সেই ময়ূরপুচ্ছটি মাথায় এখনও লাগানো আছে, সেই গোপবেশ, সেই রাখাল-রাজার মাধুর্য–গোপবেশধরং বিষ্ণুং প্রীতিং লেভে পুরন্দরঃ। অর্থাৎ কৃষ্ণের মনুষ্যস্বভাব একটুও স্থলিত হয়নি।
কৃষ্ণকে এমন অবস্থায় দেখে ইন্দ্র বেশ খুশি হলেন। কৃষ্ণের উপযুক্ত সম্ভ্রম রক্ষা করে ইন্দ্রদেব নেমে এলেন ঐরাবত থেকে। হরিবংশের বর্ণনায় এই মুহূর্তে ইন্দ্রের মুখে অসংখ্য প্রশংসা-বাক্য বেরিয়েছে কৃষ্ণের উদ্দেশে। কৃষ্ণ এখানে পরম ঈশ্বরের মাহাত্ম্য লাভ করেছেন এবং কৃষ্ণের সঙ্গে বৈদিক বিষ্ণুর একাত্মতাও স্থাপিত হয়েছে এই সুযোগে। পণ্ডিতেরা এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলেন। বলেন–ভারতবর্ষে কৃষ্ণের মাহাত্ম্য এতই প্রাচীনকাল থেকে কীর্তিত হয়েছে যে, শুদ্ধ কৃষ্ণ–পূজার ধারা থেকে শুদ্ধ বিষ্ণু-পূজার ধারাকে আলাদা করাই কঠিন। বিষ্ণুর-ক্রিয়া-কর্ম সবই বহু প্রাচীনকাল থেকে চেপে গেছে কৃষ্ণের ওপর। আবার কৃষ্ণের ক্রিয়া-কর্মও সব চেপে গেছে বিষ্ণুর ওপর। এই অবস্থায় সর্বশুদ্ধ বিষ্ণু-তত্ত্ব অথবা সর্বশুদ্ধ কৃষ্ণ-তত্ত্বের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য-রেখাও টানা যাবে বলে মনে হয় না। বার্থ সাহেব তো আবার এমন কথাও বলেছেন–Visnu himself assumed importance through his identification with Krishna.
আমাদের সুশীল দে মশায় অবশ্য এ মত মানেন না। তিনি বলেন যে, সম্পূর্ণ মহাভারত জুড়ে বিষ্ণু এবং বাসুদেব কৃষ্ণের একাত্মতা এমন সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, বিষ্ণু-কৃষ্ণের পুরাতন ইতিহাস কিছুই জানা যায় না। আমরা অবশ্য এই বিষ্ণু-কৃষ্ণের একাত্মতার তত্ত্ব একটু অন্যভাবে দেখি। আমাদের ধারণা–বিষ্ণু-কৃষ্ণের একাত্মতার ফলে বৈদিক বিষ্ণু যেমন নিজেকে বেশ খানিকটা মানবায়িত করতে পেরেছেন, তেমনি ওই একই একাত্মতার ফলে মনুষ্য কৃষ্ণও নিজেকে বেশ খানিকটা দেবায়িত করতে পেরেছেন।
এসব তত্ত্বকথা থাক। আমরা ইন্দ্রের কথায় আসি। ইন্দ্র নিজের পরাভবের পর আমাদের গোপবেশী কিশোরটিকে একেবারে ভগবান বলেই মেনে নিলেন প্রায়। এমনকি নতুন লোকের সঙ্গে কথা আরম্ভ করতে গেলে আমরা যেমন পূর্বের আত্মীয়তার সম্বন্ধ খুঁজে বার করবার চেষ্টা করি, সেই রকম ইন্দ্রও কৃষ্ণকে বললেন–পুরাকালে তুমি আমারই মা অদিতির গর্ভে আমার ছোটভাই হয়ে জন্মেছিলে, আমাকে তুমি তখন দাদা বলে মেনেছিলে–অদিতে-গর্ভ-পৰ্য্যায়ে পূর্বজস্তে পুরাকৃতঃ। আমরা বুঝতে পারি এখানে অবতারবাদের প্রতিষ্ঠা আছে। বামন অবতারে ভগবান বিষ্ণু দেবতাদের সহায়তা করার জন্য অদিতির গর্ভে ইন্দ্রের ছোটভাই উপেন্দ্র হয়ে জন্মেছিলেন। দৈত্যরাজ বলিকে ছলনা করে অদ্ভুত বামন-বিষ্ণু ইন্দ্রকে স্বর্গরাজ্যের অধিকার জুগিয়ে দিয়েছিলেন পুনর্বার।
ইন্দ্র সেই উপেন্দ্রের ভ্রাতৃ-সম্পর্কে আজকে গৌরবান্বিত বোধ করছেন। কৃষ্ণাকে অনেক প্রশংসা করার পর তিনি নিজের অধিকার খানিকটা ছেড়ে দিতেও রাজি হলেন। বড় মানুষের সঙ্গে ভাই-ভাই সম্পর্ক পাতিয়ে অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট লোকেরা যেমন গৌরবান্বিত বোধ করেন, তেমনি ইন্দ্র কৃষ্ণকে বললেন–আমি দেবতাদের ইন্দ্র বটে, তবে তুমি এই ব্রজের গোরুগুলিকে যেভাবে রক্ষা করেছ, তাতে তোমাকে এই গোকুলের ইন্দ্র বলতেই হবে–অহং কিলেন্দ্রো দেবানাং ত্বং গবামিতাং গতঃ। আজ থেকে মর্ত্যের মানুষ তোমাকে গোবিন্দ বলে ডাকবে।
ইন্দ্র কৃষ্ণকে রীতিমতো স্বর্গ-মর্ত্যের অধিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। সোনার কলসের দিব্য বারি সেচন করে কৃষ্ণের একটা অভিষেকও করলেন তিনি। প্রশংসা-স্তুতিবাক্যের বান ডাকল, মুনি-ঋষিরা মন্ত্র পড়লেন কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে। সব কিছু হয়ে যাবার পর ইন্দ্রকে আমরা একটা অদ্ভুত অনুরোধ করতে দেখছি কৃষ্ণের কাছে এবং এটা অনুরোধ নয়, বলা উচিত ইন্দ্র এক আগাম সাহায্য চাইছেন কৃষ্ণের কাছে।
এই মুহূর্তটির জন্য মিথলজিস্টরা একেবারে মুখিয়ে থাকবেন প্যাটার্ন মিলিয়ে নেবার জন্য। তারা বলতে পারেন–বেদের মধ্যে চিরকাল দেখা গেছে ৰিয় সব সময় ইন্দ্রের সহায় হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন শকে তা করার সময় বৈকি বিষ্ণু ইন্দ্রের সাহায্যকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। অতএব প্যাটার্ন মিলিয়ে নিলে ইন্দ্রের এই সাহায্য-প্রার্থনার মধ্যে আশ্চর্য কিছু নেই। কিন্তু আমাদের কাছে আপাতত এই প্রার্থনাটাই আশ্চর্য।
ইন্দ্র বললেন–তুমি কংস-বধ করো, কি কেশী দানবকে বধ করো, অথবা অরিষ্টাসুরকেও তুমি না হয় মেরে ফেলো। কিন্তু আমার একটা আর্জি আছে। তোমার পিসিমা কুন্তীর গর্ভে আমার একটি ছেলে হয়েছে–পিতৃম্বসরি জাতস্তে মমাংশোহমিব স্থিতঃ। আমারই মতো তার তেজ, সে আমার দ্বিতীয় সত্তা। তুমি সেই পিসিমার ছেলেটিকে সদা-সর্বদা আগলে রাখবে, তাকে আদর করবে, এক কথায় তুমি তাকে তোমার বন্ধু করে নিও–স তে রক্ষ্যশ্চ মান্যশ্চ সখ্যে চ বিনিযুজ্যতা।
