জানি, এখনই বলবেন– এই তো আবার আরম্ভ করলে ভ্যাজর ভ্যাজর। যে রকম প্রস্তুতি হয়েছিল তাতে এখনই বেশ পাণ্ডব-কৌরব আর চন্দ্রবংশের পরম্পরা শোনা যেত। তা না, যত সব উটকো প্রক্ষিপ্ত কাহিনী নিয়ে তোমার মাথা-ব্যথা। আমি বলব মাথা ব্যথা শুধু আমার নয়, আপনাদেরও মাথাতেও সেই ব্যথা আমি খানিকটা ধরিয়ে দিতে চাই। কেন না ব্যথা না। থাকলে–আইনস্টাইন-স্টিফেন হকিংও জলভাত, ব্যাস-বাল্মীকিও জলভাত। সেই জলভাতী বিদ্যায় ওপর-চালাকি করার সুবিধে হতে পারে, কাজের কাজ কিছু হয় না। তবু আপনাদের আকাক্ষা মতো আমি আগেই ঘটনার তাৎপর্যে প্রবেশ করব না, বরং ঘটনাটার সঙ্গে সঙ্গে মাথা–ব্যথার টিপ্পনিগুলি দিয়ে যাব।
সমুদ্রমন্থনের উপাখ্যানে মহাভারতে কোনও ভণিতা নেই। সৌতি উগ্রশ্রবা বললেন, সুমেরু নামে একটি মহাপর্বত আছে। সে পর্বতের আকার যেমন সুন্দর, তেমনই তার চাকচিক্য। সোনার মতো সে পাহাড়ের রং আর সেখানে বিচরণ করেন শুধু দেবতারা আর গন্ধর্বরা-কনকাভরণং চিত্রং দেবগন্ধর্বসেবিত। এত উঁচু সেই পাহাড় যেন স্বর্গকেও আবরণ করে দেয় নাকমাবৃত্য তিষ্ঠতি। সেই সুমেরু পর্বতের সবচেয়ে উঁচু শিখরে উঠে স্বর্গবাসী। দেবতারা অমৃত আহরণ করার জন্য আলোচনা আরম্ভ করলেন। দেবতাদের অমৃত মন্ত্রণা আরম্ভ হতেই ভগবান নারায়ণ ব্রহ্মাকে ডেকে বললেন, দেবতারা অসুরাদের সঙ্গে নিয়ে সমুদ্র মন্থন করুক, তাতেই অমৃত পাওয়া যাবে দেবৈ রসুরসঘৈশ্চ মধ্যতাং কলশোদধিঃ। উদধি মানে সমুদ্র আর কলশ মানে কলসী।
ছোটবেলায় যদি রূপক কর্মধারয় সমাস পড়ে থাকেন, তাহলে কলশ রূপ সমুদ্র বুঝতে কোনও অসুবিধেই নেই। সমুদ্র যার বৃহৎ রূপ, কলশ তারই ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। সেই সমুদ্র-কলশ মন্থন করে অমৃত তুলতে হবে। কিন্তু কেন, কী কারণ ঘটল অমৃত মন্থন করার? মহাভারত তা বলেনি, কারণ অন্যান্য পুরাণে তা বলা আছে। সমুদ্র মন্থনের কারণ নিয়ে পুরাণে পুরাণে মতভেদ আছে। কিন্তু ভেদ যাই থাকুক, কারণ একটা ছিলই। একটি পুরাণে অমৃত লাভ করা বা অমৃত পান করার পূর্বাবস্থা বর্ণিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে দেবতাদের অবস্থা খুবই খারাপ। অসুর-দানবদের সঙ্গে যুদ্ধে তারা মোটেই পেরে উঠছেন না। মাঝে মাঝে তাদের অস্ত্রাঘাত এমন কঠিন হয়ে বাধছে দেবতাদের বুকে যে, তাদের অনেকেই মারা যেতে আরম্ভ করলেন। তাদের আর উঠে দাঁড়াবার শক্তি রইল না–
তদা যুদ্ধে সুরৈর্দো বধ্যমানাঃ শিতায়ুধৈ।
গতাসবো নিপতিতা নোত্তিষ্ঠের স্ম ভূরিশঃ।
ধরে নিই, এই অবস্থায় তারা সুমেরু পর্বতের সু-উচ্চ শিখরে উঠে সমুদ্র মন্থন করার কথা ভাবতে আরম্ভ করলেন।
অন্যতর আরও একটি বিখ্যাত পুরাণে সমুদ্রমন্থনের কারণ একেবারেই ভিন্নতর। সেখানে দেখা যাচ্ছে ব্যাপা মুনি দুর্বাসা পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন –চচার পৃথিবীমিমা। ভ্রাম্যমাণ মুনির সঙ্গে এক বিদ্যাধর বধুর দেখা হয়ে গেল এক মুক্ত বনস্থলীর মধ্যে, একান্ত আকস্মিকভাবে। কোনও পুরাণ মতে ইনি হলেন অপ্সরা সুন্দরী মেনকা। যাই হোক মেনকাই হোন, আর বিদ্যাধরীই হোন তার হাতে জড়ানো ছিল গন্ধে উন্মাদ করে দেওয়া একটি মালা। মালাটি স্বর্গের সন্তানক পূষ্প দিয়ে তৈরি। এমন তার গন্ধ যে সমস্ত বন সেই গন্ধে মম করছিল; সেই বনের পথ বেয়ে যারা আসছিল তারা সবাই আকৃষ্ট হচ্ছিল এই উন্মাদিনী মালার গন্ধে। ওই বনের পথে সেই বিদ্যাধরীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল খ্যাপা দুর্বাসার।
পুরাণকার এই অধ্যায়ের প্রথমাংশে উন্মত্ত শব্দটা ব্যবহার করেছেন অন্তত পাঁচ পাঁচ বার। প্রথমত দুর্বাসার চেহারা ছিল ‘উম্মত্ত’ পাগলের মতো উন্মত্তরূপধূ। তিনি যে ব্রত পালন করেছিলেন তা এতই দুষ্কর যে, তার কষ্টে মানুষ পাগল হয়ে যায়–উন্মত্ততধৃগ বিপ্রঃ। সেই দুর্বাসা বনভূমির মধ্যে বিদ্যাধরীর হাতে জড়ানো সন্তানক-পুষ্পের উম্মদ গন্ধ পেয়ে তার কাছে মালাখানি চেয়েই বসলেন। খ্যাপা মুনিকে দেখে বিদ্যাধর বধূ দ্বিতীয় কোনও চিন্তা না করে সাদরে সপ্রণিপাতে সন্তানক-মালা দিলেন মুনির হাতে। মুনি অধিকতর মর্যাদায় সেই মালা জড়িয়ে নিলেন নিজের মাথায়। ফুলের গন্ধে মাতাল মৌমাছিরা উড়ে এসে বসতে থাকল দুর্বাসার মাথায় জড়ানো মালায়। শুষ্ক ব্রতক্লিষ্ট চেহারার মধ্যে রুক্ষ জটাজুটে কোমল মধুর মালা জড়িয়ে উন্মত্তের মতো মুনি পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন-তামাদায়াত্মননা মূর্ধি … পরিবভ্রাম মেদিনীম্।
ঠিক এই রকমভাবে ভ্রমণ করতে করতে হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে গেল দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে। মদমত্ত ঐরাবতে চড়ে তিনি হেলে-দুলে আসছেন। না, দুর্বাসা তাতে কোনও রাগ করেননি। মদোন্মত্ত হাতি, দুলে দুলেই তো আসবে। কিন্তু বহু পরিভ্রমণের পর দেবরাজ ইন্দ্রকে দেখে এতই আনন্দিত হলেন যে, তিনি তাঁর মস্তকলম্বী উন্মত্ত-পদা’ মালাখানি উন্মত্তের মতো ছুঁড়ে দিলেন দেবরাজের দিকে। দেবরাজ মালাটি ধরে নিলেন বটে, কিন্তু আধুনিক সভায়। সভাপতির মতো তিনি মালাখানি নিজে না পরে তা দুলিয়ে দিলেন গজরাজ ঐরাবতের মাথায়। দেখে মনে হল যেন কৈলাস-শিখর থেকে গঙ্গা নামছেন ভূঁয়ে।
যে মালা দুর্বাসার মাথায় ছিল সেই মালা সম্মান করে নিজের মস্তকে স্থাপন না করে ইন্দ্র যে হাতির মাথায় দুলিয়ে দিলেন, তাতেও দুর্বাসা ক্রোধ করেননি। কিন্তু সন্তানক-পুষ্পের উন্মাদ গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ঐরাবত হাতি তার শুড় দিয়ে টেনে নিল মালাটি। তারপর হাতির যেমন বুদ্ধি হয়। মালাটি শুড় দিয়ে খুব খানিকটা আঘ্রাণ করে সেটা পায়ের তলায় পিষে ফেলল গজরাজ ঐরাবত। ব্যস্। আর যায় কোথা। ব্রতক্লিষ্ট মুনি হয়েও যে দুর্বাসা বিদ্যাধরসুন্দরীর কাছ থেকে আগ্রহভরে চেয়ে নিয়েছেন, যে মালা একমাত্র দেবরাজের ইন্দ্রের হঠকারিতায় ভূমিতে নিষ্পিষ্ট হল–এই অমযাদা এবং অপরাধ দুর্বাসা সইতে পারলেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে দেবরাজকে অভিশাপ দিলেন–ওরে বদমাশ তুই ইন্দ্রের ঐশ্বর্য পেয়ে এতই গর্বিত এবং মত্ত হয়ে গিয়েছিস যে, আমার দেওয়া চিরলক্ষ্মীর প্রতীক সেই মালাটা তোর পছন্দ হল না। কোথায় মালাটা হাতে নিয়ে মাথায় ঠেকাবি, কোথায় আমার পায়ে পেন্নাম করে বলবি–আমি আপনার প্রসাদ লাভ করে ধন্য হলাম, মুনিবর! তা না, মালাটা ফেলে দিলি মাটিতে–প্ৰসাদ ইতি নোক্তত্তে… ন চাপি শিরসা ধৃতা।
