যজ্ঞান্তে কৃষ্ণ যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তখন কিন্তু তিনি গোপজনদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন–আমার প্রতি যদি তোমাদের দয়া থাকে, তবে এই গোরুগুলির মধ্যেই তোমরা আমার পূজা কোরো–অদ্য প্রভৃতি চেজোহং গোযু যদ্যস্ত মে দয়া। এরপরে কৃষ্ণের মুখ দিয়ে যেসব কথা বেরিয়েছে, তাতে গোরু এবং গোবর্ধন পাহাড়–দুইই একাত্ম হয়ে গেছে কৃষ্ণের সঙ্গে। কৃষ্ণের কথাগুলোর মধ্যে এখানে পৌরাণিকদের অবতারবাদের আবেশ জড়িয়ে গেছে, কিন্তু একটি বৃহৎ এবং মহান ব্যক্তিত্বের দেবতত্ত্বে আরোহণ সম্পূর্ণ হয় এইভাবেই। ইন্দ্ৰযজ্ঞের প্রচলিত প্রথা রদ করে এখন তিনি Final Messiah, গো-পূজা এবং গিরিপূজার অলক্ষ্যে যা ঘটল তা হল–নবীন কৃষ্ণ পুরাতন বৈদিক ইন্দ্রের স্থলাভিষিক্ত হলেন। সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখেছেন–
Thus the account of Krishna fighting the Indra–cult, instructing the cowherds to abandon the old ritual and to worship the mountain and cattle, is only a record of the superimposition of the new Vasudeva-Krishna cult on the old, worn-out Indra–cult.
পুরাতন প্রথা রদ হয়ে গিয়ে যখন নতুন প্রথা নতুন দেবতার প্রতিষ্ঠা হয়, তার মধ্যে ঝুট-ঝামেলা কিছু থাকে। পুরাতন দেবতা নির্দ্বিধায় বিনা দ্বন্দ্বে তার আসন ছেড়ে দেন না। এখানেও তা হল না। গোপূজা এবং গিরিযজ্ঞ সম্পূর্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ইন্দ্রদেব তার। মেঘমণ্ডলকে আদেশ করলেন ব্রজভূমি ভাসিয়ে দিতে। মেঘ-ভৃত্যদের নানা নাম আছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হল সংবর্তক। বজ্র-বিদ্যুৎ আর বর্ষণ ক্ষমতায় সে অতুলনীয়। ইন্দ্র তাকেই আদেশ করলেন–সাতদিন নিরন্তর বর্ষণ করার। তিনি কথা দিলেন বজ্র আর বিদ্যুতের সহায়তা নিয়ে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন এই প্রলয় মহোৎসবে। হুংকার দিয়ে বললেন–যারা আজ এত জীবিকা চিনেছে, গোরুর গৌরবে আজকে যারা নিজেদের গোপত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত, সেই গোরুগুলিকেই ভাসিয়ে দাও সাতদিনের মধ্যে–তা গাবঃ সপ্তরাত্রেণ পীড্যাং বৰ্ষমারুতৈঃ।
ইন্দ্রের আদেশ শুনে যুগান্তকারী মেঘের দল বেরিয়ে পড়ল আকাশ ছেয়ে। সঙ্গে আরম্ভ হল মেঘের গর্জন, ইন্দ্রের বজ্রপাত। ইন্দ্র আজ দেখে নেবেন সবাইকে। তার সবচেয়ে বেশি রাগ নন্দগোপের পুত্র দামোদর কৃষ্ণের ওপর। কৃষ্ণের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত নন্দ ইত্যাদি প্রধান প্রধান গোপজনদেরও তিনি ভাসিয়ে দিতে চান, কেননা তারা ইন্দ্রের বিদ্বেষী। ইন্দ্র বলেই দিয়েছেন–আজকে যারা আমার আশ্রয় ত্যাগ করে ওই সেদিনের ছেলে দামোদরের আশ্রয় নিয়েছে–এতে বৃন্দাবনগতা দামোদর-পরায়ণাঃ–তাদের আমি ছাড়ব না।
মিথলজিস্টদের দৃষ্টিতে দেখতে গেলে কৃষ্ণ নিজের ব্যক্তিত্বে এতদিন বৈদিক বিষ্ণুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন। গোপা শব্দটা রক্ষাকর্তা অথবা ত্রাণকর্তা হিসেবে বেদেই ব্যবহৃত হয়েছে, হয়তো সেই জন্যই কৃষ্ণ একজন গোপ। অন্যদিকে দামোদর শব্দটাও আছে বৌধায়নের শ্ৰেীতসূত্রে। কাজেই ইন্দ্রযজ্ঞের প্রতিরোধ মানেই কৃষ্ণ-বিষ্ণুর প্রতিষ্ঠা ঘটছে পুরাতন ইন্দ্রপূজার ওপর।
যাই হোক, একটু আগেই যেখানে শারদ ফুলের অর্ঘ্য সাজিয়ে গিরিযজ্ঞের ব্যবস্থা হয়েছিল, সেখানে বর্ষার এই ঘন-ঘটা ব্রজবাসীর মনে ভয় জাগিয়ে তুলল–খ্যাপা মেঘ ছুটে এল আশ্বিনেরই আঙিনায়। পৌরাণিকেরা খুব যুৎসই করে এই বর্ষণের ভয়ঙ্কর বর্ণনা দিয়েছেন। ব্রজের সর্বত্র জলে জলাকার হয়ে গেল। ব্রজবাসীদের জীবন কিছু গোরু মারাও পড়ল। সকলে কাতর চোখে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি কী করেন সেটাই এখন দেখার।
হয়তো এমন হয়েছিল–ইন্দ্রের রাগ-টাগ কিছুই নয়। কিন্তু ইন্দ্ৰযজ্ঞ স্তব্ধ হবার পরেই দারুণ বর্ষণ হয়েছিল ব্রজভূমিতে আর সেটাকেই ইন্দ্রের রাগ বলে ধরে নিয়েছিলেন ব্রজবাসীরা। সমস্ত ব্রজবাসীদের করুণ অবস্থা দেখে কৃষ্ণ তাদের সবাইকে জড় হতে বললেন গোবর্ধন পাহাড়ের কোলে। কৃষ্ণ তার বাম হস্তের কনিষ্ঠিকায় গোবর্ধন পাহাড় উপড়ে তুলেছিলেন কিনা জানি না। কিন্তু এটা ঠিক যে, পাহাড় মানেই উঁচু জায়গা, সেখানে খাদ আছে, গুহা আছে, পাহাড়ী গাছের ছত্র আছে। কৃষ্ণ সকলকে নিয়ে গোবর্ধন পাহাড়ে এলেন আশ্রয়ের জন্য। পৌরাণিক এক মুহূর্তের ভুলে বলে ফেলেছেন–যে, পাহাড়টিকে পৃথিবীতে নির্মিত গৃহের মতোই লাগছিল–পৃথ্বীগৃহনিভোপমঃ–অথবা ব্রজবাসীরা সেখানে আশ্রয় নেবার ফলেই পাহাড়ও গৃহের সমতা লাভ করেছিল–গৃহভাবং গতাস্তত্র গৃহাকারেণ বচসা।
পর্বতকন্দরে, গিরিগুহায় আশ্রয় নিয়ে ব্রজবাসীরা সেদিন মেঘ-বৃষ্টি-বজ্রপাত কোনওটাই টের পায়নি। তারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। কৃষ্ণের বুদ্ধি এবং পর্বতের আশ্রয় সেই ভীষণ দুর্দিনে এতটাই বোধহয় প্রয়োজনীয় ছিল যে, এই প্রয়োজনের সিদ্ধিতেই গোবর্ধন পর্বত আজও কৃষ্ণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে রয়েছেন। এক টুকরো গোবর্ধন পাহাড় এখনও চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবের কাছে কৃষ্ণের স্বরূপ। আর এই পরম আশ্রয়ের ব্যবস্থা যিনি করেছিলেন তার উদ্দেশে লোকে নিজের স্বামীপুত্র ত্যাগ করে গীত রচনা করে–মুঝে তো গিরিধারী-গোপালা দুসরা ন কোই।
.
৯০.
বর্যার প্রবল ধারাপাতে ব্রজভূমি অবরুদ্ধ হল বটে, তবে বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রদেব ব্রজবাসী গোপজনের কোনও ক্ষতি সাধন করতে পারলেন না। কৃষ্ণ তাঁর পরমপ্রিয় আত্মীয়স্বজন বন্ধুদের রক্ষা করলেন গোবর্ধন পর্বতের আশ্রয়! সাতদিন অবিরাম বৃষ্টিপাত করে ক্লান্ত শ্রান্ত ইন্দ্রদেব স্বর্গে ফিরে গেলেন! বৃন্দাবানর রাখাল গোপজানেরাও তাদের গোরু-বাছুর নিয়ে নিজের নিজের জায়গায় ফিরে এল–স্বঞ্চ স্থানং তত ঘোষঃ প্রত্যয়াং পুনরব সং! গোবর্ধন পর্বতও হিত হল নিজের জায়গায়।
