বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মতোই কৃষ্ণ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত আগে জানিয়ে পরে অন্যদের মত চাইছেন। তিনি বললেন–যদি আমার ওপর আপনাদের একটুও ভালবাসা থাকে, যদি আমি একবারের তরেও আপনাদের বন্ধু হয়ে কি–যদ্যন্তি ময়ি বঃ প্রীতির্যদি বা সুহৃদো বয়ম্ তাহলে আপনাদের এই গোযজ্ঞই করতে হবে–গাবো হি পূজ্যাঃ সততং–যদি আমার কথায় আপনাদের বিশ্বাস থাকে, তবে বিনা বিচারে আপনারা আমার কথা শুনবেন–এতন্মম বচস্তথ্যং ক্রিয়তাম অবিচারিতম্।
কৃষ্ণ এখন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত আছেন, সেই মর্যাদা অতিক্রম করে কেউ অন্য কথা বলবে, এমন যে হতে পারে না, তা কৃষ্ণ জানতেন। গোপজনেরা বললেন–তোমার এই বুদ্ধি এবং বিচার আমাদের মনে খুব ধরেছে, সত্যিই আমাদের গোরুগুলির মঙ্গল হবে তাতে–প্রণয়ত্যেব নঃ সর্বান্ বুদ্ধিবৃদ্ধিকরী গবা। ব্রজবাসীরা কৃষ্ণের কাছে তাদের ঋণ স্বীকার করে বললেন–আজ তোমার জন্যই আমরা এই বিশাল গোচারণভূমি আর গোরু নিয়ে সুখে আছি, নিরুপদ্রবে আছি–ত্বকৃতে কৃষ্ণ গোষ্ঠোয়ং ক্ষেমী মুদিতগোকুলঃ। কোনও শত্রু আজ এমুখো হয় না–এসব তোমার জন্যই সম্ভব হয়েছে। জন্ম থেকেই তুমি যেসব কাজ করেছ, তা দেবতারাও পারবেন না। সেই তোমার মতো মানুষের কথা শুনে–হতে পারে তোমার কথার মধ্যে অহংকার আছে, কারণ তুমি বলেছ–গোযজ্ঞই করতে হবে–কিন্তু তোমার সাহংকার কথা শুনে আমাদের আশ্চর্য লাগছে–বোদ্ধব্যাচ্চাভিমানাচ্চ বিস্মিতানি মনাংসি নঃ।
আশ্চর্য লাগবারই কথা। কারণ কৃষ্ণ এক অতি সচল সামাজিক প্রথা রদ করে অন্য এক নতুন প্রথা প্রবর্তন করছেন। প্রবল ব্যক্তিত্বের এমন সাহংকার প্রতিষ্ঠা মানুষকে স্তব্ধ করে, বিস্মিত করে। মানুষ তার মধ্যে শক্তি, দীপ্তি, আর মাধুর্যের সমহিম প্রকাশ দেখতে পেয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে ইন্দ্র, সূর্য অথবা চন্দ্রের সঙ্গে তার একাত্মতা স্থাপন করে–দেবেম্বিব পুরন্দরঃ, দেবেবি দিবাকরঃ, দেবেধিব নিশাকরঃ। তারা বলতে থাকে–তোমার শক্তি, তোমার এই শরীর এবং তুমি পূর্বে যা করে দেখিয়েছ–তাতে তোমার কথা অতিক্রম করবে এমন শক্তি কারও নেই। মহাসাগর কি কখনও নিজের বেলাভূমি অতিক্রম করে? অতএব গিরিযজ্ঞ সম্বন্ধে তুমি যা বললে, তাই হবে–কল্লঙ্ঘয়িতুং শক্তো বেলামিব মহোদধেঃ। আজ থেকেই বন্ধ হয়ে যাক ইন্দ্ৰযজ্ঞ, আর তুমি যা বললে সেই তোমার কথামতো গোপজনের মঙ্গলজনক গিরিযজ্ঞ সাড়ম্বরে আরম্ভ হয়ে যাক–
স্থিতঃ শক্রমহস্তাত শ্ৰীমান গিরিমহত্বয়ম্।
ত্বৎপ্রণীতোদ্য গোপানাং গবাং হেতোঃ প্রবর্ততা।
বুড়ো গয়লা কৃষ্ণের অসাধারণ ক্ষমতা, তাঁর বাক্য-বল-পৌরুষ এবং ব্যক্তিত্বের কথা বারবার উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিল যে, এরপর ভাল-মন্দ যাই হোক, তার দায়িত্ব কিন্তু কৃষ্ণের। কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই সে চিৎকার করে উঠল–বড় বড় হাঁড়ি-কলসী যা আছে নিয়ে এসো সবাই। অন্তত তিনদিনের দুধ ভরে রাখতে হবে–ভাজনানি উপকল্পস্তাং পয়সঃ পেশলানি চ। ভাল রকম খাবার-দাবার জোগাড় করো–ভক্ষ্য, ভোজ্য, পানীয়। ভাল চালের ভাত রাঁধতে হবে, তার সঙ্গে থাকবে মাংস। তার জন্যও পাত্র চাই অনেক–ভাজনানি চ মাংসস্য ন্যস্যামোদনস্য চ। মোষ–বলি অথবা যেসব পশুমাংস আমরা খাই সেসব পশুর বলি হবে–বিশস্যতাঞ্চ পশবো ভোজ্যা যে মহিষাদয়ঃ।
আমাকে অনেকে জনান্তিকে জিজ্ঞাসা করেন–আচ্ছা! কৃষ্ণ কি মাছ-মাংস খেতেন আপনার মনে হয়? আমি বহুবার তাদের সন্দেহ নিরসন করে বলেছি–খেতেন বইকি, অবশ্যই খেতেন। তিনি সেকালের ক্ষত্রিয়বংশের ছেলে, আমিযান্ন তার পুষ্টি এবং সুখাদ্যের অন্যতম। এমনকি এখন তো দেখা গেল–যে গয়লা–ঘরে তিনি মানুষ হচ্ছিলেন, সেখানেও মাংসের স্বাদু এবং পরিমাণ কিছু কম নয়। যত বড় বড় পাত্রের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তাতে কৃষ্ণের ভাগে মাংস কিছু কম পড়বে বলে মনে হয় না। তবে কৃষ্ণের সঙ্গে এই যে নিরামিষ ভাবনার অনুষঙ্গ জুটেছে, সেটা পরবর্তীকালের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রভাব এবং তা নিছকই ভক্তজনের পালনীয়।
যাই হোক, গয়লা বুড়োর হুংকারের সঙ্গে সঙ্গে ব্রজবাসীরা আনন্দে মেতে উঠল– আনন্দজননো ঘোষো মহান্ মুদিতগোকুলঃ। ঢাক-ঢোল, বাদ্যি-বাজনা বাজতে আরম্ভ করল। গোরু-বাছুর-ষাঁড় চেঁচাতে লাগল এক সঙ্গে। দুধ-দই-ঘি-ঘোলের পাত্রগুলি হ্রদের মতো দেখতে হল। মাংস আর সুসংস্কৃত অন্নের পাহাড় তৈরি হল–মাংসরাশিঃ প্রভৃঢ্যঃ প্রকাশৌদনপর্বতঃ। গন্ধ-মাল্য-ফুলের স্তূপ রাশীকৃত হল। হৃষ্টপুষ্ট এবং সন্তুষ্ট গোপজনের সঙ্গে দেখা গেল বিচিত্রবেশিনী গোপললনাদের–তুষ্ট গোপজনাকীর্ণো গোপনারীমনোহরঃ। গিরিযজ্ঞ আরম্ভ হল কৃষ্ণের কথায়।
যজ্ঞ আরম্ভ হল একেবারে বৈদিক কায়দায়। আজ্যস্থালী, চরুস্থালী এবং ব্রাহ্মণদের স্বস্তি-বাচনে যজ্ঞস্থল মুখরিত হল। অন্ন-পান আর দক্ষিণায় তুষ্ট হয়ে–তুষ্টাঃ সম্পূর্ণমনসাঃ ব্রাহ্মণরা প্রভূত আশীর্বাদ করে আসন ছেড়ে উঠলেন। গয়লাদের আনা দই, দুধ, ঘৃত, মাংস কৃষ্ণই আস্বাদন করার সুযোগ পেলেন সবার আগে। তার আদেশ সিদ্ধ হয়েছে, অতএব সন্তুষ্টমনে তিনি গয়লাদের উপহার গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষ্ণ গোবর্ধন পাহাড়ের সঙ্গে একাত্ম হলেন যেন। বস্তুত, গোবর্ধন নামটি বোধহয় আগে ছিল না। আজ এই অনুষ্ঠানে গোপজনের জীবিকা-গো-বৃদ্ধি বা বর্ধনের জন্যই যেহেতু যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেই যজ্ঞ যেহেতু এই পাহাড়ের পাশেই বিস্তৃত প্রদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল অতএব সেই গো-বর্ধন বা গো-মঙ্গল উৎসবই–বুদ্ধিবৃদ্ধিকরী গবাম–গোবর্ধনপূজার সঙ্গে একাত্মক হয়ে গেল।
