কৃষ্ণ ধৈর্য ধরে গয়লা-বুড়োর সব কথা শুনলে মানুষের ওপর বৈদিক ইন্দ্রের প্রভাব যে কত, তাও তিনি ভাল জানেন। সব শুনে, সব বুঝেও কৃষ্ণ কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করতে উদ্যত হলেন। ব্রজবাসীদের বিপদে, আপদে, ভূবিস্তারে কৃষ্ণ পূর্বাহ্নেই তাঁদের নায়ক হয়ে উঠেছেন। সকলে এখন তাকে এমনই এক আশ্রয়স্থল বলে মনে করে যে, কৃষ্ণ এটা বুঝে গেছেন–তার কথা লোকে শুনবে।
কৃষ্ণ বুড়ো গয়লাকে বললেন–আমরা হলাম গিয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়ানো বনচারী গয়লা জাতের মানুষ। গোরু-বাছুর নিয়ে আমরা জীবিকা নির্বাহ করি–বয়ং বনচরা গোপাঃ সদা গোধনজীবিনঃ। আপনারও এটা জানা উচিত যে,–যা আমাদের জীবিকা, সেই গোরু, যা আমাদের চতুর্দিক থেকে রক্ষা করে, সেই পর্বত, আর যেখানে আমরা থাকি, সেই বন এইগুলোই আমাদের দেবতা–গাবোস্মদ্দৈবতং বিদ্ধি গিরয়শ্চ বনানি চ।
কৃষ্ণ এবার বেশ অর্থশাস্ত্রীয় কায়দায় ব্রজভূমির মানুষদের বুঝিয়ে বললেন–কৃষকরা জীবিকা নির্বাহ করে কৃষিকর্ম করে, ব্যবসায়ী দোকানদাররা জীবিকা নির্বাহ করে ক্রয়-বিক্রয়, বিপণন করে, কিন্তু আমাদের বৃত্তি হল গোপালন–গাবোস্মাকং পরা বৃত্তিঃ। যে মানুষ যে বিদ্যা বা বৃত্তির সঙ্গে যুক্ত, সেই বিদ্যাই তার দেবতা, পূজা যদি করতে হয় তবে সেই বিদ্যাষ্ঠাত্রী দেবতার পূজা করা উচিত। যে মানুষ একজনের কাছ থেকে ফল পেয়ে, সেই ফল ভোগ করে, তারপর অন্য জনের আদর-আপ্যায়ন করে–যোন্যস্য ফলমানঃ করোত্যন্যস্য সৎক্রিয়া তার মতো কৃতঘ্ন মানুষের ইহলোকে, পরলোকে কোথাও ঠাই হবে না।
কথাগুলি বলে কৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলেন–এতদিন যা করা হয়েছে, তা ঠিক হয়নি। কিন্তু এখন যা করতে হবে, সেটা প্রতিষ্ঠা করতে হলে, তার জন্য তাঁকে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। একটি পুরাতন সামাজিক প্রথা বাতিল করে যদি নতুন সামাজিক প্রথা প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে প্রখর ব্যক্তিত্বকেও তর্ক-যুক্তির অবতারণা করতে হয়। কৃষ্ণ তাই করছেন এবং সেই অসাধারণ প্রক্রিয়ার মধ্যে কৃষ্ণের মধ্যে এক পাক্কা এনভিরনমেন্টালিস্টকে খুঁজে পাব আমরা। কৃষ্ণ বলেছেন–যে পর্যন্ত আমাদের কৃষি-জমি, সেই পর্যন্তই ব্রজভূমির সীমা। সীমার শেষে আছে বন, সেই বনের শেষে পর্বত। সেই পর্বতই আমাদের একমাত্র আশ্রয়–বনান্তা গিরিয়ঃ সর্বে সা চাস্মাকং গতিধ্রুবা।
বস্তুত, সেকালের মানুষের কাছে পাহাড় ছিল এক অবাক বিস্ময়। তাকে আশ্রয় বলতেও কেউ দ্বিধা করত না। শত্রুপক্ষের আক্রমণের পথে পাহাড় ছিল নিদারুণ বাধা। পণ্ডিতজনেরা বলেছেন–পাহাড় হল দেবতাদের আবাস এবং তারা রাজা-মহারাজাদের এমন জায়গায় থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে চারপাশে পাহাড় আছে। পাহাড় সেখানে দুর্গের কাজ করে। বৃন্দাবনের এই গোবর্ধন পাহাড়টি অন্যান্য গিরিদুর্গের তুলনায় কিছুই নয়, তবু এই পাহাড়কেই কৃষ্ণ এক সুরক্ষার স্থল বলে মনে করেছেন। এই গোবর্ধন পাহাড় সংলগ্ন বৃন্দাবন এক বনভূমি। এই বনভূমির জন্যও কৃষ্ণের দুশ্চিন্তা আছে। তিনি মনে করেন–পাহাড় বনভূমিকেও সুরক্ষিত রাখে। তিনি বলেছেন–পাহাড়ে বাঘ-সিংহের মতো যেসব হিংস্র জন্তু আছে, তারা সেইসব মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়–যারা বন কাটতে চায়। এইভাবে পাহাড়-সংলগ্ন বনকে পাহাড় নিজেই রক্ষা করে–বনানি স্বানি রক্ষন্তি ত্রাসয়ন্তো বনচ্ছিদঃ। যে মানুষ বনের আশ্রয়ে থেকে জীবিকা নির্বাহের জন্য সেই বনেরই ক্ষতি করে–যদা চৈষাং বিকুন্তি তে বনালয়জীবিনঃ–সেই সব মানুষেরা তাদের রাক্ষুসে কাজের জন্য নিজেরাই মারা পড়ে।
কৃষ্ণ যে কথাগুলি বলেছেন, তা যদি খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়/তৃতীয় শতাব্দীতেও পৌরাণিকেরা সংকলিত করে রেখে থাকেন, তবে বলতে হবে–এ অত্যন্ত আধুনিক ভাবনা। আজকে যারা অরণ্য-সংরক্ষণ বা পশু সংরক্ষণের কথা ভাবছেন, তারা জানবেন আজ থেকে প্রায় দুহাজার বছর আগেও এই দুর্ভাবনা ছিল। কৃষ্ণ তার বৃক্ষ-লতা সংকুল অরণ্যভূমির আবাস বৃন্দাবন এবং তার সুরক্ষা-বলয় গোবর্ধন পাহাড়কে বৈদিক দেবতা ইন্দ্রের চেয়েও বেশি মূল্য দিয়েছেন। বৃন্দাবনের বন আর গোবর্ধন পাহাড়ই তাঁর কাছে দেবতার মতো। তিনি বলেছেন–ব্রাহ্মণরা মন্ত্রযজ্ঞ করেন, আর কৃষকরা পুজো করেন হল–লাঙলের। কিন্তু আমরা গোপজনেরা করব গিরিযজ্ঞ-গিরিযজ্ঞস্তথা গোপা ইজ্যোস্মাভিগিরির্বনে।
কৃষ্ণ প্রধানত গিরিযজ্ঞের কথা বললেও বৃক্ষ-সমন্বিত বন এবং গোপজনের পালনীয় পশুদের পুজোও তার গিরিযজ্ঞের অঙ্গ। তিনি বলেছেন–আমরা স্বস্তিবাচন করে কোনও বড় গাছের তলায় অথবা কোনও ভাল জায়গায় আমাদের পাল্য পশুদের একত্র করব। তারপর সাড়ম্বরে আমাদের পূজা আরম্ভ হবে। কৃষ্ণ যে আড়ম্বরের কথা বলেছেন, তাতে অর্থসম্পত্তির প্রয়োজন হয় না তত। গোপজনের আর্থিক অবস্থা তিনি জানেন, অতএব সেই অনুযায়ী তার নির্দেশ হল–গোরুগুলোর শিঙ মুড়ে দিতে হবে শারদ ফুলের রাশিতে, আর তাতে বাঁধা থাকবে ময়ূরের পালক। ঘণ্টা ঝুলিয়ে দিতে হবে প্রত্যেকটি গোরুর গলদেশে। অঞ্জলি ভরে আনতে হবে শরৎকালের ফুল। পুজোর জন্য। গোপূজার সঙ্গে সঙ্গেই আরম্ভ হবে গিরিযজ্ঞ। স্বর্গের দেবতারা দেবরাজ ইন্দ্রের পূজা করুন, আমরা গিরিরাজ গোবর্ধনের পূজা করব।
