বর্ষার দুই মাস চলে যেতেই রাখালদের বার্ষিক উৎসব ইন্দ্রযজ্ঞের সময় এসে গেল। লক্ষণীয়, শরৎকালে যখন পাকা ধান ঘরে ওঠে, তখনি এই পূজার সময়। পণ্ডিতেরা এর মধ্যে ফার্টিলিটি কাল্ট দেখতে পাবেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই, অনেকে আবার ইন্দ্রপূজার উপাচারের ফ্যালিক কাল্ট ও নজর করবেন। কারণ এই পূজার সময় গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বংশদণ্ড পুঁতে তার চারপাশে কাপড় জড়িয়ে পূজা করা হয়, সেটাকেই ইন্দ্ৰধ্বজ বলা হয়। ধ্বজ অর্থ আপনারা জানেন এবং ধ্বজপূজাকে ফ্যালিক ওয়ারশিপের মধ্যে পরিগণনা করতে পণ্ডিতদের আয়াস আছে স্বাভাবিক কারণেই।
আমাদের দৃষ্টিতে এই ফার্টিলিটি বা ফ্যালিক কাল্ট-এর মতো পণ্ডিতী বিষয় আপাতত দূরে থাকুক। আমরা ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণের গুরুত্ব লাভের পরম্পরা ব্যাখ্যায় ব্যস্ত আছি। মনে রাখা দরকার, যারা মথুরা-দ্বারকার কৃষ্ণের সঙ্গে বৃন্দাবনের-কৃষ্ণকে মেলাতে পারেন না, তাদেরই মনে রাখা দরকার–একটি মানুষ শুধু কংস-জরাসন্ধকে প্রতিহত করে ঐতিহাসিকতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন না এবং এই ঐশ্বর্যশালিতারও একটা পরম্পরা আছে। আমরা মনে করি বৃন্দাবনেই সেই পরম্পরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা মনে করি–রাজশক্তি এবং পররাষ্ট্রনীতির কৌটিল্য-বুদ্ধি হৃদয়ে থাকলে একটি কংস বা একটি জরাসন্ধকে প্রতিহত করা অনেক সহজ, কিন্তু একটি সমাজ-সচল প্রথাকে স্তব্ধ করে দিয়ে অন্য প্রথা চালিয়ে দেওয়াটা অনেক কঠিন। মানুষ দীর্ঘকাল ধরে যা বিশ্বাস করে আসছে, যে বিশ্বাসের ওপর তাদের জীবন এবং জীবিকা ভিত্তি করে আছে, সেই বিশ্বাসকে উম্মলিত করে নতুন প্রথার প্রস্তাবনায় অনেক বেশি ব্যক্তিত্ব লাগে।
আমরা আগে দেখেছি–শকট-পূজা, বৃক্ষ-পূজা এমনকি জিমারের দৃষ্টিতে নাগপূজাও প্রতিহত হয়েছে কৃষ্ণের ব্যক্তিত্বে। এই ব্যক্তিত্ব এতটাই যে জে. এন. ব্যানার্জির মতো মহাপণ্ডিত বলতে বাধ্য হবেন যে, পূর্বর্তন শকট-বৃক্ষ নাগের ঘটনাগুলি আসলে–accounts of the subjugation of some of the lower cults by the higher one which was soon to be accepted as authoritative by the orthodox Vedic section of the people. এই ব্যক্তিত্ব কি মথুরা-দ্বারকার কৃষ্ণের চেয়ে কিছু কম হল যে, বৃন্দাবনের কৃষ্ণকে আলাদা মানুষ বলব?
০৯০. ব্রজভূমি বৃন্দাবনে ইন্দ্ৰযজ্ঞের তোড়জোড়
৯০.
ব্রজভূমি বৃন্দাবনে যখন ইন্দ্ৰযজ্ঞের তোড়জোড় চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কৃষ্ণ-বলরাম বোধহয় বাড়িতে ছিলেন না। বর্ষাকালের দুমাস ধরেই তারা এ-বন সে-বন ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তাল-বন, ভাণ্ডীর-বনের মতো জায়গায় ধেনুক-প্রলম্ব ইত্যাদির অধিকার চলে যাবার কারণেই হোক, অথবা এইসব নতুন জায়গায় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই হোক, অথবা ক্লান্তি অপনোদনের জন্যই হোক, বর্ষার দুমাস কৃষ্ণ-বলরাম বাড়ি ছিলেন না–বনে বিচরতোমাসৌ ব্যতিযাতৌ স্ম বার্ষিকৌ।
কৃষ্ণ-বলরাম বাড়ি ফিরতেই দেখলেন–ইন্দোৎসবের জোগাড় হচ্ছে। ধূমধাম ভালই হবে, তার মধ্যে ব্রজভূমিতে নানান উৎপাতের অবসান ঘটায় এবার সকলের মনে ফুর্তিও খুব। কৃষ্ণ দেখলেন–এই উৎসবের জন্য সকলে উদ্গ্রীব, লালায়িত–গোপাংশ্চোৎসবলালসান। সময় বুঝে মানুষ দেখে কৃষ্ণ এক গয়লা-বুড়োকে জিজ্ঞাসা করলেন–আচ্ছা। এই ইন্দ্র-যজ্ঞ ব্যাপারটা কী, যার জন্য তোমাদের মনে এত ফুর্তি আসছে–কোয়ং শমখো নাম যেন বো হর্ষ আগতঃ?
বুড়ো গয়লা বললেন–আমরা এখানে ইন্দ্রের ধ্বজা বসিয়ে পুজো করি, এবং কেন করি, তার কারণ বলি শোনো। ইন্দ্র হলেন দেবতাদের রাজা আর তিনি হলেন মেঘ-বৃষ্টির দেবতা। তিনি আমাদের চিরকালের রক্ষক। অতএব সেই রক্ষাকর্তার পুজোর জন্যই বহুদিন ধরে ওই উৎসব চলে আসছে–তস্য চায়ং মখঃ কৃষ্ণ লোকনাথস্য শাশ্বতঃ। আকাশের মেঘরাশি সেই ইন্দ্রের শাসন মেনে বর্ষার নতুন জলধারা বর্ষণ করেন আর তার ফলেই মাঠে মাঠে শস্য ফলে। ইন্দ্র যে শস্য নিষ্পন্ন করেন, সেই শস্য খেয়েই আমরা বাঁচি; মানুষ বাঁচে, আমাদের গোরু, বলদ, ষাঁড়, সব হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে, গোরুরা ভাল দুধ দেয়। আর সত্যিই তো, যেখানে বর্ষণমুখর মেঘরাশি আছে–বৃষ্টিমন্তো বলাহকাসেখানে শস্যের অভাব নেই, তৃণের অভাব নেই, ক্ষুধা বলেও সেখানে কিছু নেই–নাশস্যা নাতৃণা ভূমি-ন বুভুক্ষার্দিতো জনঃ।
গয়লারা মেঘস্তুতির মাধ্যমে যেভাবে ইন্দ্ৰস্তুতি করল, তাতে বেশ বোঝা যায় যে, জমির উর্বরতা বা ফার্টিলিটির কারণেই এই ইন্দ্র-যজ্ঞের ব্যবস্থা। কাল্ট ফ্যাকটরটা না হয় বেশ বোঝা গেল, কিন্তু এর মধ্যে লক্ষণীয় আছে আরও কিছু। বুড়ো গয়লা যেভাবে ইন্দ্ৰস্তুতি করল এবং পরবর্তী কয়েকটি শ্লোকে সেই স্তুতির ভাষা যেমনটি হরিবংশ ঠাকুর বুড়ো গয়লার মুখে বসিয়ে দিয়েছেন, তা প্রায় বৈদিক ইন্দ্রস্তুতির ধ্রুপদী অনুবাদ। বুড়ো বলেছেন–সূর্যদেবের দিব্য কিরণ-সমূহই পৃথিবীর জল শোষণ করে পয়স্বিনী মেঘরাশিতে পরিণত হয়। ভগবান ইন্দ্র সেই পয়স্বিনী কিরণ-ধেনু দোহন করেন। সেই কিরণ-ধেনুই নতুন পবিত্র জলরূপী দুগ্ধ ক্ষরণ করে পৃথিবীর বুকে, পৃথিবী শস্যে ভরে ওঠে।
মেঘ, বৃষ্টি, জল, শস্য-বুড়ো গয়লার মুখে কৃষি সম্পর্কিত এই সব শব্দ এবং সেই সঙ্গে আর্যসভ্যতার অন্যতম প্রধান দেবতা ইন্দ্রের জয়কার শুনে বোঝা যায় তখনও পর্যন্ত বৈদিক দেবতার উত্তরাধিকার হ্রাস পায়নি। বুড়ো গয়লা বলেছে–সমস্ত প্রাণীর শ্রীবৃদ্ধির জন্যই ইন্দ্র এই জল বর্ষণ করেন–পর্জন্যঃ সর্বভূতানাং ভবায় ভুবি বৰ্ষতি। সেইজন্যই এই বর্ষাকালেই রাজাদের ইন্দ্রপূজার সময়। আমরাও এই সময়ে নানা উৎসবে ইন্দ্রযজ্ঞ পালন করি।
