আসলে সত্যিই এখানে কৃষ্ণের নলীলা মাধুর্যের পরিসর বেশি। ডেভিড কিংসলে (David Kinsley) সাহেব শত্রুদমনরত অবস্থাতেও তার নৃত্য পরায়ণ ভাবটি দেখে বলেছেন–শুধু এই কালিয়র ব্যাপারেই নয়, যে কোনও দৈত্য রাক্ষসের ক্ষেত্রেই কৃষ্ণের খেলা-খেলা এই ভাবটা কোথাও যেন নষ্ট হয় না। কালিয়কে বাগে পেয়েও এই যে তিনি তাকে ছেড়ে দিয়ে নিজ-জনের মর্যাদা দিলেন এর মধ্যে কৃষ্ণের মাধুর্যের প্রকাশই ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। কালিয়কে দমন করার সময়েও কৃষ্ণ তাঁর লীলায়িত ক্রীড়া-স্বভাব থেকে একটুও চ্যুত হননি।
কালিয়-দমনের মধ্যে কৃষ্ণের করুণাগুণ এবং মাধুর্যের সরসতা শতমুখে বলেও মিথলজিস্টরা কিন্তু ধর্মীয় ইতিহাসের টিপ্পনীটুকু উল্লেখ করতে ভুললেন না। হাইনরিখ ডিমার লিখলেন–কালিয়কে দমন করার আসল মানে হল–a primitive snake-cult was super seded by the worship of an anthropomorphic divine Saviour.
কৃষ্ণের কথা শুনে কালিয় যমুনা ছেড়ে চলে গেলেন কৃষ্ণের পদচিহ্ন মাথায় নিয়ে। গৃহ্য মূত্ন তু চরণৌ কৃষ্ণস্যোরগপুঙ্গবঃ। কৃষ্ণ যখন কালিয়–হুদ অথবা আমাদের বিপর্যয়ী ভাষায় কালিদহ থেকে ব্রজের মানুষদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন, তখন সকলে ধন্য ধন্য করতে লাগলেন গোপকুলপতি নন্দের। তারা বলেন–ধন্য মশাই, আপনি ধন্য যাঁর এইরকম একটি ছেলে আছে। আজ থেকে এই ছেলে হবে আমাদের বিপদের আশ্রয়, আমাদের প্রভু। শুধু আমাদেরই নয়, আমাদের জীবিকা এই গোরুগুলি এবং আমাদের বাসস্থান এই গোষ্ঠভূমিরও রক্ষক, আশ্রয় এবং অধিকারী প্রভু হবে এই তোমার ছেলে
অদ্য প্রভৃতি গোপানাং গবাং গোষ্ঠস্য চানঘ।
আপৎসু শরণং কৃষ্ণঃ প্রভুশ্চায়তলোচনঃ।
মনে আছে–যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে রাজভয়-ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ নিজের পুত্রকে ত্যাগ করার মুহূর্তে নন্দগোপালকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন–একে কেমন করে মানুষ করবে তুমি?–তখন নন্দগোপ বলেছিলেন–ও একবাড়িতে দুধ খাবে, আরেক বাড়িতে ননী, একবাড়িতে দই আরেক বাড়িতে মিষ্টান্ন, অন্য বাড়িতে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে ঘোলের হাঁড়ির দিকে। এককথায় ও হবে আমাদের ঘোষেদের প্রভু।
নিশ্চয় লক্ষ্য করলেন–নাগ জনজাতির এক প্রবল প্রতিপক্ষ প্রতিহত হবার পর আজ সেই বালক সত্যিই ঘোষেদের প্রভু হয়ে গেছেন। ঘোষেরা অন্যের অধ্যুষিত এক ভূখণ্ড অধিকার পেয়ে আজকে নিজেদের আবাস সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত। যমুনার জল তারা আজ স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করছে, শক্ররা এখন আর তাদের গোরুগুলি ধরে নিয়ে যাবে না–তীরে চাস্যাঃ সুখং গাবো বিচরিষ্যন্তি নঃ সদা।
গোপেরা কৃষ্ণের অনেক প্রশংসা করল বটে, কিন্তু তাই বলে তাকে কেউ ভগবান বলে ভাবেনি। তাদের সমস্ত আবেগের মধ্যে কৃষ্ণের মনুষ্যত্ব ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ধরা আছে, যদিও কৃষ্ণের ব্যক্তিত্ব পরিণত হওয়ায় কৃষ্ণ তাদের কাছে এখন খুবই বড় মানুষ। তারা বলেছে–আমরা গ্রাম্য গয়লা মানুষ–ব্যক্তমেব বয়ং গোপা–আমাদের কৃষ্ণ যেমন ছাই চাপা আগুনের মতো, তার যে এত ক্ষমতা তা আমরা সত্যিই বুঝিনি–মহভূতং ন জানীমচ্ছন্নমগ্নিমিব ব্রজে।
ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণের মহত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য সর্পরাজ কালিয়র অপনয়ন যেমন দায়ী, ঠিক তেমনি দায়ী হল ব্রজভূমির মধ্যে চিরপরিচিত ইন্দ্ৰযজ্ঞের প্রতিরোধ। এই ঘটনাকে মানুষেরা জানেন গোবর্ধন-ধারণের মাহাত্ম্যে। কিন্তু ঐতিহাসিক দিক দিয়ে গোবর্ধন-পাহাড় আপন অঙ্গুষ্ঠে ধারণ করাটা নিশ্চয়ই অলৌকিক শোনাবে, কিন্তু এর পিছনে খুব বড় ঘটনা যেটা সেটা কিন্তু ওই চিরপ্রচলিত এক প্রথা চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কতখানি ব্যক্তিত্ব থাকলে গ্রাম্য গোপ-সমাজে এই প্রথা স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কালিয়-দমনের প্রসঙ্গে জিমার যেমন মন্তব্য করেছেন এই ঘটনার মাধ্যমে পূর্বতন নাগপূজার তত্ত্ব নিরস্ত হয়ে কৃষ্ণের মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হল, ঠিক তেমনি গোবর্ধন-ধারণের মাধ্যমে পূর্বর্তন ইন্দ্ৰ-পূজা বন্ধ হয়ে ব্রজবাসীদের আপন জীবিকার মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হল।
মনে রাখা দরকার–ইন্দ্র হলেন একজন বৈদিক দেবতা। মহাভারতের যুগে তার মাহাত্ম্য যতই ক্ষীণ হয়ে আসুক, তখনও তার বৈদিক পরম্পরা সুপ্রতিষ্ঠিত আছে। শুধু তাই নয় বৈদিক দেবতাকুলের মধ্যেও ইন্দ্রের মাহাত্ম বোধহয় সবচেয়ে বেশি। তিনি সমস্ত দেবতার রক্ষাকর্তা এক ক্ষত্রিয় নেতা, তাই শুধু নয়। ঋগবেদের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মন্ত্র রচিত হয়েছে ইন্দ্রেরই উদ্দেশে। সে যাই হোক, গোপজনের মধ্যে ইন্দ্রপূজার চল ছিল খুব বেশি। এই পূজা-উৎসবে গোপজনের সার্বিক অংশগ্রহণ এতটাই প্রথাসম্মত ছিল যে আমরা পূর্বে দেখিয়েছি–যেদিন নন্দের ঘরে মৃত শিশুকন্যাটি জন্ম নিল, নন্দ সেই রাত্রেই সেই শিশুর শব-শরীর যমুনায় বিসর্জন দেবার জন্য বেরিয়ে পড়েছেন। এর পিছনে কারণ একটাই। পরের দিন ঘোষেদের বার্ষিক উৎসব ইন্দ্রযজ্ঞের অনুষ্ঠান হবার কথা। সেই উৎসবে গোপজনের মন যাতে মলিন না হয়, সেইজন্যেই নন্দ শিশু-কন্যাকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন। সামান্য শোক করবার মতোও অবকাশ পাননি তিনি। ঘোষেদের কাছে ইন্দ্রযজ্ঞের মহিমা বা আড়ম্বর এতটাই।
হরিবংশের বৃত্তান্ত অনুযায়ী কৃষ্ণ যে সময় কালিয়-দমন করেছেন, সে সময়টা বর্ষাকাল চলছিল। এখন বর্ষাকাল চলে গেছে–ব্যতিতৌ স্ম বার্ষিকৌ। এর মধ্যে কংসের পাঠানো দু-একটি তথাকথিত অসুরবধও হয়ে গেছে। ধেনুকাসুর আর প্রলম্ব–এদের একজনের চেহারা গর্দভের মতো অন্যজন মানুষের রূপ ধরতে ওস্তাদ–এরা দুজনেই মারা পড়ল বৃন্দাবন-সংলগ্ন তালবনে এবং ভাণ্ডীর বনে। আমাদের মতে এরা কংসের চর নাও হতে পারে। হয়তো এই তালবনে, ভাণ্ডীবনে এদেরই পূৰ্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিল; এরা মারা যেতে–হরিবংশে দেখছি ঘোষেদের গোরু চরানোর অনেক সুবিধে হয়েছে। তারা নতুন জায়গায় নির্ভয়ে বিচরণ করছে–বীতশোকভয়ায়াসাশ্চর্যন্ত সমস্ততঃ।
