আমরা জানি–কালিয়র মাথার ওপরে কৃষ্ণের একটা নৃতরঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে অনেক পুরাণেই। কালিয়র পাঁচটি ফণার ওপর ক্রমান্বয়ে নৃত্য করতে করতে একেবারে মধ্য ফণাটির ওপর তাঁর নাচটা স্টিল হয়ে যায় এবং তখনি সেটা ছবি এবং ভাস্কর্যের বিষয় হয়ে পড়ে। ভাগবতপুরাণে এই নৃত্যভঙ্গির মধ্য দিয়েই কালিয়-দমন সম্পূর্ণ হয় এবং সেখানে শত্রুর দর্পমোচনের সঙ্গে নাগপত্নীদের স্তব কবি-দার্শনিকের হৃদয় বিগলিত করবে। হরিবংশ, বিষ্ণুপুরাণ এবং সব পুরাণেই এমনকি বালচরিত নাটকও কালিয়র মাথার ওপর কৃষ্ণকৃত এই নৃত্যের কথা আছে এবং সোজা কথায় এই নৃত্যের অর্থ একদিকে যেমন শত্রুদমনের সম্পূর্ণতা সূচনা করে, তেমনি অন্যদিকে শত্রুদমনে কৃষ্ণের নান্দনিক স্বাতন্ত্র্য রচনা করে।
আমরা জানি–কালিয়দমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নতুন বসতি বানানো ব্রজবাসীদের রিহ্যাবিলিটেশন–যাতে ব্রজবাসীরা নির্ভয়ে যমুনার তীরবর্তী অঞ্চলে তাদের অধিকার, পায়নিস্ক্রাসাস্তু সুখং যেন চরেয়ু-ব্রজবাসিনঃ। কৃষ্ণ কালিয়কে মারেননি, তাকে নিষ্প্রভ করেছেন মাত্র। কালিয়কে তিনি যমুনা ছেড়ে চলে যেতে বলেছেন। বালচরিত নাটকে কালিয় স্বীকার করেছেন যে, তিনি যমুনার জল বিষাক্ত করেছেন এবং যাবার সময় তিনি সমস্ত বিষ তুলে নিয়েই চলে যাবেন। সত্যি কথা বলতে কী, এই বিষ-সংহরণ করার মধ্যেই আমাদের জাগতিক যুক্তিগুলি কাজ করতে থাকে। এর আগে কৃষ্ণ তাঁকে অনুরোধ করেন–তুমি আজ থেকে এই বৃন্দাবনের গো-ব্রাহ্মণ এবং বৃন্দাবনবাসী প্রজাদের আর কোনও ক্ষতি করবে না–অদ্য প্রভৃতি গো-ব্রাহ্মণপুরোগাসু সর্বপ্রজাসু অপ্রমাদঃ কর্তব্যঃ।
গো-ব্রাহ্মণ হল আর্য সভ্যতার প্রতীক। নতুন জায়গার পুরাতন আবাসিককে দমন করে গো-ব্রাহ্মণের সুরক্ষার ব্যবস্থা হতেই কৃষ্ণের সঙ্গে ব্রজবাসীরাও নিশ্চিত হয়েছেন। হরিবংশ থেকে আরম্ভ করে ভাগবত পুরাণ, অথবা ভাসের বাচরিত থেকে আরম্ভ করে চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের লেখা কাব্য-নাটকে বর্ণিত কালিয়-দমনের উপাখ্যানে কৃষ্ণের বীরতা বা ঐশ্বর্যশালিতার কোনও মূল্য নেই, ঠিক যেমন মূল্য নেই কালিয়র বিষময়তা নিষ্ফল হওয়ার। এমনকি পরাজিত কালিয় যে কৃষ্ণকে ভগবান নারায়ণের স্বরূপ বলে মেনে নিলেন, তারও খুব একটা তাৎপর্য নেই। লিয়-দমনের মধ্যে যেটা সবচেয়ে বড় মুগ্ধতা তৈরি করে সেটা হল পরাজিত শত্রুর প্রতি কৃষ্ণের করুণার মাহাত্ম্য। এমনকি ভাসের বালচরিত নাটকের মধ্যেও কৃষ্ণের একান্ত মনুষ্যোচিত গুণগুলি এমনভাই প্রকট হয়ে উঠছিল, যাতে বলা যায় চৈতন্যপন্থীরা কৃষ্ণের মনুষ্য-মাধুর্য আবিষ্কার করে সাংঘাতিক নতুন কিছু করে ফেলেননি। তার পরম্পরা রয়ে গেছে হরিবংশে, বিষ্ণুপুরাণে ভাগবত পুরাণে অথবা বালচরিত নাটকের মানবিক অভিসন্ধিতে।
হাইনারিখ জিমার, যিনি ভারতবর্ষের প্রাচীন ভারতের শিল্প, সভ্যতা এবং সংস্কৃতি নিয়ে অসাধারণ কিছু কাজ করেছেন, সেই জিমারের মতে–কৃষ্ণ কালিয়র সঙ্গে এমন কষ্টকর অপমানের ব্যবহার করেননি, যা একজন বিজেতা পুরুষ পরাজিত শত্রুর প্রতি করে থাকে। এখানে কৃষ্ণের ব্যবহারে এমনই এক মধুর মর্যাদা যুক্ত হয়েছে যাতে অন্যদের মতো কালিয়কে মেরে ফেলেননি তিনি। তিনি যা করেছেন, তা হল কালিয়কে তিনি তার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দিয়েছেন–banishes him to his proper place at the periphery of the cosmos, sending him back to the sea where he belongs.
বালচরিত নাটকে বা অন্যান্য পুরাণে যেমন দেখছি, তাতে নৃত্যপর ভঙ্গিতে কৃষ্ণ তাঁর পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন কালিয়র মাথায়। কালিয়র বসবাস ছিল সমুদ্রে, কিন্তু তিনি সর্পভোগী গরুড়ের ভয়ে যমুনার আবাস বেছে নিয়েছিলেন। কৃষ্ণ তাঁকে অভয় দিয়ে বলেছেন–তোমার মাথায় আমার পদচিহ্ন আঁকা রইল, নাগরাজ! গরুড় যদি এই পদচিহ্ন দেখেন তবে কোনওদিন তোমার প্রতি বিরূপ হবেন না।
মম পাদেন নাগেন্দ্র চিহ্নিতং তত্ব মূর্ধনি।
সূপর্ণ এব দৃষবৈং অভয়ৰ্থতি প্রদাস্যতি।
কৃষ্ণকে যাঁরা অবতার হিসেবে মেনে নিয়েছেন, তাঁরা বলেন কৃষ্ণাবতারের এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হল শত্রুর প্রতি করুণা–প্রকাশ। কিন্তু লক্ষণীয়, শত্রুর প্রতি করুণা প্রকাশের এই বৈশিষ্ট্য যতই উজ্জ্বল হয়ে উঠুক প্রায় সর্বত্রই কৃষ্ণের শত্রুরা কিন্তু সশরীরে হত হয়েছে। এমনকি রূপ গোস্বামী কৃষ্ণকে যে হতারিগতিদায়ক (শত্রু হত হলেও তাকে তার প্রাপ্যের চেয়েও ঊর্ধ্ব গতি যিনি দান করেন) বলে একটা জব্বর বিশেষণ দিয়েছেন, সেটা যতই সার্থক হোক, তাতে পূতনাও জননীর গতি লাভ করতে পারে, অঘাসুর, বকাসুরও মুক্তির পদবি লাভ করতে পারে, কিন্তু তাদের সবাইকে মরতে হয়েছে।
এই নিরিখে কালিয় কিন্তু এক অসাধারণ ব্যতিক্রম। কৃষ্ণ তাকে মারেননি এবং কালিয়কে তিনি নিজের জন অথবা পরম ভক্তের মর্যাদা দান করেছেন। ভাগবত পুরাণে কালিয় নাগের পত্নীরা স্বয়ং জানিয়েছে যে, কালিয়র মাথায় কৃষ্ণের পদচিহ্ন হল তার অপরিসীম করুণারই অম্লান প্রকাশ। যে পরম পদ লাভ করার জন্য লক্ষ্মী অযুত বৎসর তপস্যা করেন–যায়া শ্রীললনাচরত্তপঃ–সেই পদচিহ্ন তিনি স্বয়ং এঁকে দিয়েছেন কালিয়র মাথায়। এর থেকে বেশি করুণা আর কীই বা হতে পারে। ভাগবত পুরাণে এই ভক্তিবাদী কথা শুনে অন্যেরা হাঁ-হাঁ করে ওঠেন। বলেন–ভাগবতের ওই একই স্বভাব। সব জায়গাতেই কৃষ্ণের করুণা দেখে ভাগবতের স্রষ্টা একেবারে বিগলিত হয়ে ওঠেন। আমরা বলি–তা না হয় হল। কিন্তু ভাসের বালচরিত তো খ্রিস্টীয় ২/৩ শতাব্দীতে লেখা হয়েছে। সেখানে কালিয়র মাথায় পদচিহ্ন নিয়ে এত বাড়াবাড়ি কথা কেমন করে এল? ভাস তো আর চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণব নন, তিনিই বা কেন কালিয়র মাথায় কৃষ্ণের পদচিহ্ন দেখে এত বিচলিত হলেন।
