বস্তুত পৃথিবীর সূর্যসম্ভব দেবতারা সকলেই মহা–মহা সর্পরাজকে মেরেছেন জীবনের কোনও না কোনও সময়ে–এ কথা পৃথিবীর সমস্ত পণ্ডিতেরা এক ধরনের প্যাটার্ন হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তারা বলেছেন–কত উদাহরণ চাই? থ্রাকটাওনা অজি দহককে মেরেছেন, ফেরেসাপা মাথা নুইয়ে দিয়েছেন সর্প–রাক্ষস গান্ডারেওয়ার। এমনকি পরম আবেশের মুহূর্তে খ্রিস্টকেও দেখা যাবে–তিনি এক সর্পরূপী ড্রাগনের গর্ব খর্ব করেছেন। আরও প্রাচীন সভ্যতা মিশরে আসুন। দেখুন, রা পরাজিত করেছেন সাপের মাথাওয়ালা সেবানকে অথবা সাপ-দানো নাককে। উপকথার রাজ্যে মারডুক টিয়ামাটকে জয় করছেন আর স্বয়ং গ্রিক হেরাক্লিস পরাজিত করেছেন জল–সর্প হাইড্রাকে।
গ্রিক পণ্ডিত মেগাস্থিনিস তো হেরাক্লিসের মধ্যেই কৃষ্ণের সন্ধান পেয়েছেন। অতএব কালিয়–নাগের ব্যাপারে আমাদের এই আন্তর্জাতিক প্যাটার্নও খুব ভালভাবেই খাটে। আমরা অবশ্য আমাদের পুরাণ-ইতিহাসের ধারায় কালিয়-দমনের ঘটনাটি বিবৃত না করে পারব না। কৃষ্ণ যখন কদম গাছের ওপর থেকে কালি-দহে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তখন কালিয় জল ছেড়ে ওপরে চলে এল–উদতিষ্ঠজ্জলাৎ সর্পো রোষ–পৰ্যাকুলক্ষণঃ। ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশির মতো তার শরীর। ক্রোধে চোখ লাল হয়ে গেছে এবং পঞ্চমুখে সে বিষাগ্নি উদগিরণ করছে। নাগরাজের স্ত্রীরা, পুত্রেরা এবং তার অনুগত সাপেরাও নাগরাজের সঙ্গে যোগ দিল কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্য। তারা সকলে মিলে কৃষ্ণকে কামড়াতে লাগল বটে, কিন্তু হরিবংশঠাকুর মন্তব্য করেছেন যে, কৃষ্ণ তাতে মারা গেলেন না–ন মমার চ বীর্যবান।
আসলে ঘটনাটা সত্যিই খুব বিপজ্জনক ছিল। কৃষ্ণ একা কালিয়র আবাসে এসেছেন এবং আমরা আগেই দেখেছি কালিয়র বাসস্থান সাধ্যমতো ঘেরা ছিল। সহজপথে তিনি কালিয়র আবাসে প্রবেশ করতে পারেননি বলেই গাছে উঠে তাকে কালিয়র শাসন-সীমা অতিক্রম করতে হয়েছে। তারপর কদমগাছ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কালিয়র কাছে যেতে হয়েছে। এটা সত্যি মনে হয়, কারণ এইভাবে শত্রু-শিবিরে প্রবেশ করার অভ্যেস কৃষ্ণের আছে। যারা মহাভারতের ঐশ্বর্যশালী কৃষ্ণের সঙ্গে মধুর গোপালক-কৃষ্ণকে মেলাতে পারেন না, তাদের জানাই–এহল সেই একই উপায় বা স্ট্র্যাটেজি যা জরাসন্ধকে হত্যা করার সময় কৃষ্ণ অবলম্বন করবেন। দেখবেন, সেখানেও কৃষ্ণ সোজাপথে আসেননি। দুই পাণ্ডব-ভাইকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের এক পাশ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কৃষ্ণ জরাসন্ধের আবাসে ঢুকেছিলেন। এখানেও একই ব্যাপার, শুধু পাহাড়ের বদলে গাছ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কৃষ্ণ। সোজা পথে না ঢুকে অতর্কিতে আক্রমণ–সামগ্রিক কৃষ্ণ-চরিত্রের সঙ্গে এটা বেশ মেলে।
কৃষ্ণ কালিয়র ডেরায় ঢুকে যাবার পর বৃন্দাবনের মানুষ এবং তাঁর রাখাল বন্ধুরা নন্দরাজ এবং যশোমতীকে খবর দিল, খবর দিল অন্যান্য সবাইকে। তারা ভয়ত্রস্ত হয়ে আকুলি-বিকুলি করতে লাগলেন যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে। কালিয়কে কৃষ্ণ যখন শায়েস্তা করেছেন, তখন তার যা বয়স এবং সেটা পুরাণকারেরা যেমন বলেছেন, তাতে রীতিমতো সন্দেহ জাগাবে যে, ওই বয়সে এমন অদ্ভুত কর্ম করা সম্ভব কিনা। এ বিষয়ে বালচরিত নাটকে ভাস যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতে নাটকীয়তার জন্যই হোক অথবা সত্য ঘটনাই হোক কৃষ্ণাকে অনেক বেশি বাস্তবচরিত্র বলে মনে হয়।
বালচরিত নাটকে দেখা যাচ্ছে–কৃষ্ণ-জ্যেষ্ঠ বলরামই আগে কালিয়র খবর পেয়েছিলেন। কৃষ্ণকে কালিয়র খবর দিচ্ছে সেই বুড়ো গয়লার ভাগনে দামক! সে কৃষ্ণের কাছে এসে বলছে–বলরামকে বারণ করুন, কত্তা! বারণ করুন। তিনি কালিয়কে রুখতে গেছেন। কৃষ্ণ বললেন–এই কালিয়র কথা আমিও অনেক শুনেছি বটে। তাকে শায়েস্তা করা দরকার বৃন্দাবনের সমস্ত মানুষ এবং গো-ব্রাহ্মণকে সে বড় হেনস্তা করে গোব্রাহ্মণাদয়স্তেন সুহৃষ্যন্তে কিল প্রজাঃ।
গো-ব্রাহ্মণ এবং বৃন্দাবনের মানুষ–এই তিনটি শব্দ শুনলেই আর্য-সভ্যতা; বিরোধী এই নাগ-জনজাতির প্রতিপক্ষতা বেশ সপ্রমাণ হয়ে যায়। যাই হোক, কৃষ্ণ যখন কালিনহের দিকে এগোতে লাগলেন, তখন কৈশোরগন্ধী যুবতীরা বারণ করতে লাগলেন কৃষ্ণকে। গোপপল্লীর মধ্যে যে বালকটি নিজের শক্তি এবং মাধুর্যে এখন ভর্তা দামোদরে পরিণত, সে যে পল্লীবাসিনী রমণীদের কাছে অথবা জনপদবধূর কাছে যথেষ্ট স্পৃহণীয় এক নায়ক হয়ে দাঁড়াবে, তাতে সন্দেহ কি?
বালচরিত নাটকে কৃষ্ণ যখন কালিয়কে শাস্তি দেবার জন্য এগিয়ে চলেছেন, তখন গোপকন্যারা তাঁকে বাধা দিল। গোপকন্যাদের সম্বন্ধে কৃষ্ণের স্বগতোক্তিগুলি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। কৃষ্ণ বলছেন–এই মেয়েরা সরাজের ভয়েই আমার পিছন পিছন আসছে। এদের চোখগুলো চকোরপাখির মতো। এদের শরীরে উদ্ভিন্ন যৌবন, ঠোঁটগুলি কাঁপছে, কেশরাশি আলুলায়িত। ভয়ে ত্রাসে তাদের উত্তরীয়বস্ত্র বিস্রস্ত হয়ে পড়েছে।
কৃষ্ণের স্বগতোক্তির মধ্যে যে নিপুণ দৃষ্টিশক্তি আছে, তাতেই বোঝা যায়–তিনি নায়ক হয়ে উঠেছেন। গোপরমণীরা কৃষ্ণকে যথাসাধ্য বারণ করতে লাগলেন, কিন্তু যতই এই বারণ-বাণী তীব্র হতে থাকে কৃষ্ণের সংকল্পও তত বাড়তে থাকে। কৃষ্ণ কালিয়ার আবাসে প্রবেশ করলেন, কিন্তু লক্ষণীয়, যারা এই অমানুষী যুদ্ধ দেখতে চাইছে–যেমন তাদের মধ্যে একজন সেই বুড়ো গয়লা–তাকে কিন্তু একটি কুম্ভপলাশ গাছে উঠে কৃষ্ণ-কালিয়র যুদ্ধ দেখতে হচ্ছে। যুদ্ধে কালিয়র পরাজয় নেমে আসল ক্রমে ক্রমে। জলের মধ্যে নয়, কৃষ্ণ কালিয়কে ধরে আছাড় মারছেন মাটিতে–এষ প্রসহ্য সহসা ভুবি নিক্ষিপাসি।
