হরিবংশে দেখতে পাচ্ছি–নাগরাজ কালিয় সোজা মানুষ নন। হতে পারে–খগরাজ গরুড়ের তাড়া খেয়ে তিনি পালিয়ে এসেছেন এখানে। কিন্তু নিজভূমিতে তার অখণ্ড প্রতাপ। আমরা আগে জানিয়েছি–নাগগোষ্ঠীর জনজাতিরা যেমন সাপের টোটেম ব্যবহার করতেন, তেমনি খগ-গোষ্ঠীর লোকেরাও ব্যবহার করত পাখির টোটেম। হয়তো খগ বা পক্ষীর টোটেম ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নাগ গোষ্ঠীর জনজাতির চিরন্তন শাশুতিক শত্রুতা ছিল এবং হয়তো তারা খগদের হাতে প্রচুর মারও খেয়েছেন।
কিন্তু যমুনার তীরভূমিতে বৃন্দাবন থেকে এক ক্রোশ পথ পরে কালিয় হলেন অবিসংবাদিত রাজা। কোনও মানুষ এই নাগদের ত্রিসীমানার মধ্যে প্রবেশ করে না বা প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখে না। সেইজন্যেই কৃষ্ণ বলেছেন–কালিয় যমুনাকে দূষিত করেছে তেনেয়ং দূষিতা সর্বা যমুনা সাগরঙ্গমা। তবে আসল কথাটি হরিবংশ থেকেই টের পাওয়া যায় এবং সেটা ঐতিহাসিক তথ্য। কৃষ্ণ নাগরাজ কালিয়ের সীমানার মধ্যে প্রবেশ করে যা দেখেছেন তা হল–বড় বড় ঘাস বনটাকে ছেয়ে রেখেছে একেবারে। ছোট ছোট আগাছা এবং বড় বড় গাছে এই ভূখণ্ড পরিপূর্ণ এবং নাগরাজ কালিয়র বিশ্বস্ত মন্ত্রীরা এই বন সযত্নে রক্ষা করে–রক্ষিতং সর্পরাজস্য সচিবৈরাগুকারিভিঃ।
অনুমান করা যায়–এরা কেউ আমাদের দেখা সাপের মতো নয়। কৃষ্ণ আরও বলেছেন–এই বনটি যেন আকাশের মতো নিরালম্ব। বিয-মিশ্রিত অন্নের মতো এই বনকে যেন স্পর্শও করা যায় না এবং বনের চতুর্দিকে কালিয়র গুপ্তচরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে– তৈরাপ্তকারিভি নিত্যং সর্বতঃ পরিরক্ষিতম্।
বিষণ্ণমিব দুঃস্পৃশম–বিষমিশ্রিত অন্নের মতো দুস্পর্শ–এই পংক্তিটি থেকে বোঝা যায়–এই বনের মধ্যে ঢোকা মোটেই নিরাপদ নয়। কৃষ্ণ কালিয়র মন্ত্রীদের কথা, গুপ্তচরদের কথা বলছেন বটে, কিন্তু তাদের দেখতে পাচ্ছেন না কোথাও। হয়তো কালিয় এবং তার মন্ত্রীদের এই দুস্পর্শ, অদৃশ্য চরিত্রই তাদের ওপর সর্পের চরিত্রের অনুমান ঘটিয়েছে। কৃষ্ণ একটি হ্রদ দেখতে পাচ্ছেন যার তীরে শৈবাল, পদ্ম এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লতা-বৃক্ষ দেখা যাচ্ছে। আমাদের অনুমান–এটি জলাধার, কোনও হ্রদ নয়, বিস্তীর্ণ বনভূমির মধ্যে এটিই কালিয়র আবাসস্থল, যার পাশে আছে প্রবাহিনী যমুনা। কৃষ্ণকে বলতে হচ্ছে–আমাকে এই হ্রদ পর্যন্ত আসবার জন্য দুই দিক থেকে উপযুক্ত পথ তৈরি করতে হবে–কর্তব্যমাগো ভ্রাজেতে হ্রদস্যাস্য টাবুভৌ। তারপর শাস্তি দিতে হবে কালিয়কে।
হরিবংশের পরবর্তী বর্ণনা বিষ্ণুপুরাণ বা ভাগবত পুরাণের মতোই। তিনি কালিয়-হ্রদে এলেন, কদম-গাছের উচ্চচূড়ে উঠলেন আর ঝাঁপ দিলেন যমুনায়। বাস্! কালিয়র সঙ্গে যুদ্ধ বেধে গেল। কিন্তু এই মনোমুগ্ধকর বর্ণনায় যাবার আগে সাহিত্যের অন্তরে বসে ইতিহাসের তথ্যটুকু সাজিয়ে দিয়েছেন হরিবংশের লেখক-ঠাকুর। কৃষ্ণ বলেছেন–আমি যদি এই নাগরাজকে দমন-নিগ্রহ করি, তবে এই নদীর জল সমস্ত ব্রজবাসীর উপকারে আসবে, ব্রজোপভোগ্যা চ যথা…ভবেচ্ছিবজলাশয়া। উদ্দেশ্য আছে আরও–নাগরাজ দমিত হলে–এইখানে সমস্ত ব্রজবাসী সুখে বিচরণ করতে পারবে এবং এই নদীর সমস্ত ঘাট আমাদের সুখের আশ্রয় হয়ে উঠবে–সর্বত্রসুখসঞ্চারা সতীর্থ-সুখায়াঃ।
বেশ বোঝা যায়–কালিয়ের বসতি স্থানটি ব্রজবাসীদের ভীষণ প্রয়োজন–শুধু জমির জন্যই নয় জলের জন্যও। তাছাড়া অন্য জায়গা থেকে নতুন জায়গায় এসে কাঁধের ওপর জাতি-শত্রু নিয়ে বাস করা যায় না। অতএব কালিয়কে নিগ্রহ করা দরকার। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে–আর্যায়নের প্রথম কল্পে আর্যরা যখন সপ্তসিন্ধুর ধারে এসে পৌঁছেছিলেন, তখন বৈদিক ঋষির বর্ণনায় আমরা দেখেছি বৃত্রাসুর সর্পের রূপ ধরে সপ্ত সিন্ধুর জল আটকে রেখেছিলেন। বৃত্রকে বার বার সেখানে অহি নামে ডাকা হয়েছে। আর দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যোদ্ধা–পুরুষ ইন্দ্র সেই বৃত্ররূপ অহিকে মেরে সপ্তসিন্ধুর ধারা মুক্ত করেছিলেন–যো হত্বাহি অঋণাৎ সপ্তসিন্ধু।
বেদের এই বর্ণনা-কল্প মাথায় থাকলে কালিয়কে সর্পের টোটেম ধারী নাগগোষ্ঠীও ভাবতে হবে না। বরঞ্চ ভাবা যাবে–এঁরা আর্যদের ভূখণ্ড দখলের পথের কাঁটা, শত্রু। বেদের টীকাকার সায়নাচার্য মিথলজিস্টদের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব-বুদ্ধি সম্পন্ন। তিনি একবারও অহি মানে সাপ লেখেননি। লিখেছেন অহিম আহন্তার অর্থাৎ যারা আক্রমণ করে। কালিয়ও তাই। তিনিও আর্যায়নের শত্রু, আক্রমণকারী। তার নিরুপদ্রব বৃক্ষচ্ছায়াসমন্বিত হ্রদ-তুল্য আবাসটি আক্রান্ত হলে, তিনিও পালটা আক্রমণ করবেন–এইটাই স্বাভাবিক।
.
৮৯.
পণ্ডিতেরা বলেছেন–সৌরকুলের দেবতা হলে অমনই হয়। কৃষ্ণের মধ্যে ইন্দ্রের প্রতিচ্ছায়া দেখে অথবা বৈদিক ইন্দ্রের মধ্যে কৃষ্ণের আনটিসিডেন্ট দেখে আমরা যে শুধু সপ্তসিন্ধুর ধারারোধী বৃত্রাসুর, বা অহির কল্পনা করছি, তা শুধু এই ভারতবর্ষেই নয়, সমস্ত পুরাতন সভ্যতাতেই এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যাবে। মিরচা এলিয়াদে, যাকে নিয়ে কল্পনায় মৈত্রেয়ী দেবীর ন হন্যতে রচিত হল, সেই মিরচা-মহাশয়ের দু-একখানা তুলনামূলক ধর্মেতিহাস পড়লেই এ বিষয়ে নানা কথা জানা যাবে। অ্যাপোলো যে টাইফঁও নামক নাগরাজকে মেরেছিলেন, সে কথা আমরা পূতনা-রাক্ষসীর নাম–সাম্য দেখানোর সময়েই বলেছি। এবার এলিয়াদের দৃষ্টিতে আরও কিছু কথা।
