এরপর হরিবংশে ঘোয-পরিবারের নতুন করে সংসার পাতার বর্ণনা আছে। দুধ-দই, ঘি-মাখন তৈরি করার জিনিস, মন্থন-দণ্ড, রজু আর গোশকটের আকীর্ণ বর্ণনায় হরিবংশের দশ পনেরোটা শ্লোক ব্রজবাসীদের সংসারের খুঁটি-নাটি তুলে ধরেছে। বর্ষাকালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনাও এখানে আছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা প্রণিধানযোগ্য, সেটা হল–কৃষ্ণ ছোট ছিলেন বড় হয়েছেন। তিনি এখন একা একা ঘুরে বেড়ান কখনও বা বন্ধুদের সঙ্গেও গরু চরাতে আসেন।
এই গোরু চরানোর ব্যাপারটাও কিন্তু নিস্তরঙ্গ কর্তব্যসাধনমাত্র ছিল না। কৃষ্ণের গোপালক বন্ধুরা রীতিমতো তানপুরা, বীণা-টিনা নিয়েই গোরু চরাতে আসে। কৃষ্ণের হাতে যেন একটি বাঁশী দেখছি, একটি ময়ূর-পুচ্ছও দেখছি তার কণ্ঠসূত্রের সঙ্গে লাগানো আছে। তিনি কখনও গান করছেন, কখনও খেলা করছেন, কখনও তালপাতার বাঁশী বানিয়ে বাজাচ্ছেন–কচি গায় ক্কচিৎ ক্রীড়ংশ্চৰ্য্যংশ্চ কচি ক্কচিৎ।
বোঝা যাচ্ছে কৃষ্ণের মধ্যে নতুন এক ব্যক্তিত্বের স্পর্শ লেগেছে, হয়তো বা তিনি একটু রোম্যান্টিকও হয়ে উঠছেন। ভাগবত পুরাণে এখন কৃষ্ণের মধুর রূপ আরও মধুরতর হয়ে কবি–কল্পের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, কিন্তু হরিবংশে এখনও বাস্তববোধ এবং ইতিহাসবোধটুকু চলে যায়নি। দেখতে পাচ্ছি–কৃষ্ণ একদিন গোরু চরাতে চরাতে এবং খেলা করতে করতে যমুনার তীরে এসে পড়েছেন।
এর আগে যে বৃন্দাবনের বর্ণনা আছে, তাতে কোথাও যমুনার উল্লেখ নেই। এখন যমুনার জলরাশির মোহন রূপে কৃষ্ণকে প্রায় মোহগ্রস্ত দেখছি। কৃষ্ণ দেখতে পেলেন–যমুনায় নামবার জন্য ঘাট আছে এখানে। জলের স্বাদও অতি চমৎকার। বোঝা যায়কৃষ্ণ এসব আগে দেখেননি। বেশ কয়েকটি শ্লোকে এখানে যমুনার বর্ণনা করা হয়েছে রমণী-শরীরের সারূপে। কিন্তু এমন সুন্দর যমুনা এবং যমুনার তীর বৃন্দাবনবাসী গোপজনের ভোগর আওতায় আসেনি।
তীরের কাছাকাছি যমুনার প্রবাহ কিছু ক্ষীণ এবং সেইজন্যেই যমুনার মধ্যে একটা জায়গায় চরা পড়েছে। সেটা অবশ্য তীরভূমির কাছাকাছি। কৃষ্ণ জানেন এই হ্রদের এলাকায় নাগেরা বাস করে এবং তারা থাকে তীরভূমিতেই–দুঃখোপসৰ্পং তীরে সসর্পৈ বিপুলৈ বিলৈঃ। বস্তুত সাপেরা জলে এবং গর্তে বাস করে বলেই হয়তো এই হ্রদ এবং বিলের উচ্চারণ। কিন্তু আমাদের ধারণা, এরা ঐতিহাসিক নাগ জনজাতি। তাদের আস্তানা বা বসতি-স্থান হয়তো আর্যদের মতো নয় বলেই এই হ্রদ আর বিলের কল্পনা। জায়গাটা এখানকার নতুন আবাসিক ঘোষদের অগম্য ছিল বলেই হরিবংশকার বারবার বলেছেন যে, সাপের বিষের তাড়নায় এখানে কেউ যেতে পারে না। পশুপক্ষীও যায় না, এমনকি আর্যদের যজ্ঞ-সবনপ্রার্থী দেবতারাও এই স্থান সযত্নে পরিহার করেন–উপভোগৈঃ পরিত্যক্তং সুরৈখ্রিষবনার্থিভিঃ।
এই একটিমাত্র পংক্তি–দেবতারা এই স্থান ত্যাগ করেছেন–এই নিন্দাপংক্তি থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, জায়গাটা আর্যপ্রায় মনুষ্যের আওতায় ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণ নাগ জনজাতির দখলে। হরিবংশ আরও বলেছে বৃন্দাবনের উত্তরদিকে এক ক্রোশ জায়গা শুধু ছিল যেখানে ওই সর্পতুল্য নাগদের বিষাগ্নির জ্বালা পৌঁছত না–ব্রজস্যোত্তরতস্তস্য ক্রোশমাত্রে নিরাময়ে। কিন্তু তার পরেই নাগদের বসতি। অনুমান হয়–এই নাগদের বসতি পেরিয়ে তবেই যমুনায় পৌঁছনো যেত। কিন্তু ঘোযপল্লীর নতুন আবাসিকদের কাছে এই যমুনা নদী ছিল ভীষণ প্রয়োজনীয় এবং সেখানে সবচেয়ে সহজে পৌঁছতে হলে এই নাগদের বসতিটি উচ্ছিন্ন হওয়া দরকার।
কৃষ্ণ এই দরকারটা বুঝেছিলেন, ব্রজবাসীদের মধ্যে এই নিয়ে আলোচনাও কিছু হয়ে থাকবে হয়তো। কৃষ্ণ খুব ভালভাবেই জানতেন যে, যমুনার তীরভূমি-ঘেঁষা এই হ্রদে নাগরাজ কালিয় বাস করেন। তার গায়ের রঙ কালো কাজলের মতো। চিরশত্রু খগরাজ গরুড়ের ভয়ে তিনি এসে এই যমুনার জলে আশ্রয় নিয়েছেন
অস্মিন্ স কালিয়ো নাম কালাঞ্জনচয়োপমঃ।
উরগাধিপতিঃ সাক্ষাত্ হ্রদে বসতি দারুণঃ।
উৎসৃজ্য সাগরাবাসং যো ময়া বিদিতঃ পুরা।
আমরা এর আগে জানিয়েছি যে, এই সর্প-নাগেরা কোনও সরীসৃপজাতীয় প্রাণী নয়, এরা সেকালের আর্যভূমিতে পূৰ্বাধিকারী নাগ জনজাতি। পণ্ডিতজনেরা কেউ তাদের অসুরগোষ্ঠীর অন্যতম মনে করেছেন কেউ তাদের তুরাণী-গোষ্ঠীর নাগ-পূজক জনজাতি ভেবেছেন, আবার কেউ বা তাদের সাধারণ মানুষই ভেবেছেন আমাদের মতো। আর সত্যিই তো মানুষ না ভাবার কোনও কারণও নেই। এই মহাভারতেই দেখব–স্বর্গের ইন্দ্ৰসারথি মাতলি তার মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে এসে কোথাও তার উপযুক্ত পাত্র পেলেন না; শেষে নাগলোকের এক নাগ-বরের সঙ্গে মাতলির মেয়ের বিয়ে হল। এরকম বিবাহ-সম্বন্ধ আরও কত হয়েছে। অর্জুনপত্নী উলুপীর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, ভারতবর্ষে নাগ-জন-জাতির সঙ্গে সখ্যর উদাহরণ আছে কত। অবশ্য শত্রুতার উদাহরণও কম নেই।
এখানে এই মুহূর্তে যেটা দেখছি–তা হল নাগরাজ কালি গার্যভূখণ্ডের একটি স্থানের পূর্বাধিবাসী। জলের কাছে নদীর সামনে তার বাস। যে ঘোষের এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গায় আস্তানা গাড়ল তাদের মধ্যে পশুপালক গোপালক আর্য-জাতির চরৈবেতির মর্ম মেশানো আছে। কিন্তু তাদের এখন আরও জায়গা দরকার। জলের জন্য দরকার যমুনার তীরভূমির সেই অংশটি যেখানে পূর্বেই ঘাট বাঁধানো আছে। সবচেয়ে দরকার ঘোষপল্লীর কাছে যমুনা যাবার সবচেয়ে সহজ পথটি।
