মহাভারত জানিয়েছে–যে সমস্ত সাপের বিষ খুব বেশি ছিল, তারাই মারা পড়েছিল জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে দৰ্খাস্ত মহাসুট্রে…দীপ্তানল-বিষোণাঃ। আসল কথা-নাগ-গোষ্ঠীর যে সমস্ত ব্যক্তি তৎকালীন আর্য-ক্ষত্রির শক্তির বিরোধিতায় নেমেছিলেন, জনমেজয় তাদেরই মুলোৎপাটন করে ছেড়েছিলেন। বাকি যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে আগে থেকেই আর্যগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, বাদবাকি অন্যেরা আস্তীক-মুনির মধ্যস্থতায় আর্য-সংস্কৃতিতে আত্মীকৃত হলেন। এর ফলে প্রাচীনতর তথা সমসাময়িক নাগ-জনজাতির সঙ্গে জনমেজয়ের আর কোনও শত্রুতা রইল না। আস্তীকের ব্যক্তিত্ব এবং তর্কযুক্তি জনমেজয়ই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। জনমেজয়ের সভাস্থ অন্য ব্রাহ্মণ এবং পুরোহিতেরা সকলেই একসময় বুঝেছেন যে, সর্পবংশবিনাশী ওই প্ৰধ্বংসী যজ্ঞ আর চলা উচিত নয়। তারা সকলে মিলে পরামর্শ দিয়েছেন যজ্ঞ বন্ধ হোক, আস্তীক বর লাভ করুন–
ততো বেদবিদস্তাত সদস্যাঃ সর্ব এব তু।
রাজানমূঢুঃ সহিতা লভতাং ব্রাহ্মণো বর৷৷
রাজা জনমেজয় মেনে নিলেন মন্ত্রী পুরোহিতের কথা। বললেন, আপনারা যেমন চাইছেন, আস্তীক যেমন চাইছেন, তেমনটিই হোক। যজ্ঞ বন্ধ হোক, সর্পকুলের ওপর সমস্ত উপদ্রব বন্ধ হোক–সমাপ্যতামিদং কর্ম পন্নগাঃ সন্তু অনাময়াঃ। সভাস্থলে আনন্দের কোলাহল উঠল। ব্রাহ্মণ সজ্জন যাঁরা যজ্ঞে উপস্থিত হয়েছিলেন, অতিথি, শিল্পী, কর্মকার যারা উপস্থিত–তাঁরা সবাই জনমেজয়ের দান-মান পেয়ে জনমেজয়কে আশীর্বাদ শুভেচ্ছা জানালেন। এই দান মানের প্রাপকদের মধ্যে আমার কাছে একজন বড় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সূত-জাতীয় পুরাণবক্তা। তিনি গল্প বলেন। মহাভারতের কবি এই সূত জাতীয় ব্যক্তিটির নাম স্বকণ্ঠে বলেননি। তবে আমাদের অনুমান–তিনিই লোমহর্ষণ, আমাদের বর্তমান কথক ঠাকুর সৌতি উগ্রশ্রবার পিতা। মিলনের আনন্দে দান-মানের প্রগ্রহ যখন মুক্ত হয়েছিল, তখন এই সূত জাতীয় কথক-ঠাকুরটিও জনমেজয়ের পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হননি- তেভ্যৎ প্রদদৌ বিত্ত শতশোধ সহষণঃ। লোহিতাকায় সূতায়……। নাম না বললেও পণ্ডিতেরা অর্থ করেছেন সূতায় লোমহর্ষণীয়। সৌতি উগ্রশ্রবা যাঁর কাছে মহাভারতের পাঠ নিয়েছেন, সেই লোমহর্ষণ কিন্তু একটু পরেই জনমেজয়ের এই সভাতেই সুযোগ পাবেন মহাভারত শোনার।
.
০৯.
জনমেজয়ের রাজসভায় আস্তীক মুনির মধ্যস্থতায় যেভাবে নাগদের সঙ্গে শাসক ক্ষত্রিয়ের মিলন ঘটল, তাতে আমরা এখনই মহাভারতের মূল কাহিনীতে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু সেই পথে আমাদের বাধা হলেন স্বয়ং আমাদের কথক ঠাকুর সৌতি উগ্রশ্রবা। আমি আগে বলেছি–মহাভারতের তৃতীয় সম্পাদক হিসেবে উগ্রশ্রবাসৌতি আগে তাঁর নিজস্ব কালের হাওয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আমি বলেছি-নাগদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে –কীভাবে তারা শত্রু থেকে বন্ধু, এমনকি উপাস্যতার পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন সেটা দেখানো সৌতি উগ্রশ্রবার ভাবনার মধ্যে ছিল। এখন বলছি শুধু নাগ নয়, মানুষের মর্ত্যভূমিতে যাদের আমরা দেবতা বলি, রাক্ষস বলি অসুর বলি– তাদের প্রাথমিক পরিচয় উন্মোচন। করাটাও সৌতির ‘মেথডোলজি’র মধ্যে পড়ে।
মনে রাখতে হবে এর পরে মহাভারতে আমরা প্রধান প্রধান অনেক দেবতাকেই দেখতে পাব যাঁরা মনুষ্য রমণীর প্রেম-পাশে বদ্ধ হবেন। দেখতে পাব- শুধু প্রেম কেন মনুষ্য রমণীর গর্ভে দু-একটি পুত্র কন্যা লাভ করতেও তারা বেশ আগ্রহী। দেবতারা অলৌকিক শক্তি বশে মনুষ্য সমাজের ওপর এই অলৌকিক অধিকার বিস্তার করেছেন– ধর্মের যুক্তিতে একথা আদরণীয় মনে হলেও আমি যে সে পথে এতক্ষণ হাঁটিনি, তা বোধ করি বিলক্ষণ বুঝেছেন। আর আমাদের সৌতি উগ্রশ্রবার আধুনিক মননশীলতাও তো কিছু ভোলবার নয়। তিনি মূলত গল্প বলা কথক ঠাকুর হলেও তিনি মহাভারতের ইতিহাস শোনাতে বসেছেন, কাজেই গল্প বলা অথবা কথকতার অন্তরে তিনি তৎকালীন দিনের সামাজিক ইতিহাসটুকুও যে ইঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলবেন–সে কথা বলাই বাহুল্য।
কদ্রু বিনতা এবং অন্যান্য নাগদের পরিচয় দিতে দিতেই তিনি অমৃত মন্থনের প্রসঙ্গে চলে গেলেন। এর পিছনে অবশ্যই তার উদ্দেশ্য আছে। হঠাৎ করে এক গল্পের খেই হারিয়ে তিনি অন্যগয়ে যাননি। নাগদের প্রসঙ্গে দেবতা আর অসুরদের পারস্পরিক স্থিতি মহাভারতের আরম্ভেই তার জানানোর প্রয়োজন আছে এবং তা জানানোর সবচেয়ে সহজ এবং বড় উপায় হল সমুদ্রমন্থনের উপাখ্যান। সৌতি উগ্রশ্রবা স্বকণ্ঠে এই উপাখ্যানের তাৎপর্য বলবেন না, কারণ তিনি মোহময়ী কথকতায় আবিষ্ট। বিশেষত এই তাৎপর্য জানাতে হলে তাকে পুরাণ কথাও বলতে হত বিস্তর, তাতে আধুনিক প্রক্ষেপবাদীদের আরও পোয়া বারো হত। কিন্তু সৌতি বলেননি বলেই আমাদের দায় আসে তার কথা ঠিক ঠিক বুঝিয়ে বলার।
দেখুন সমুদ্রমন্থনের কাহিনী এতটাই পুরনো এবং এতটাই তা গভীর যে ভারতের পুরাণগুলির অধিকাংশের মধ্যেই এই কাহিনীর আলাপ এবং বিস্তার শোনা যাবে। আর পুরাণ গুলি যেহেতু আমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক ইতিহাস অতএব সৌতি উগ্রশ্রবার মহাভারতকে বুঝতে হলে পুরাণ কথা দিয়েই মহাভারতকে বুঝতে হবে, কারণ সেই প্রথমে আমরা উগ্রশ্রবার পরিচয় দিতে গিয়ে তার বিশেষণ দিয়েছি- ‘লোমহর্ষণ-পুত্র উগ্রশ্রবা সৌতিঃ পৌরাণিকঃ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই ‘পৌরাণিক যখন ভারত আখ্যান শোনাচ্ছেন তখন তো আর তিনি পুরাণের কথা বলবেন না, আখ্যানের অন্তরে তিনি শুধু ইঙ্গিত করবেন। সে ইঙ্গিত আমাদের বুঝতে হবে সমান হৃদয় দিয়ে পৌরাণিকের সমব্যথা নিয়ে।
