কোনও সন্দেহ নেই, হরিবংশ, বিষ্ণুপুরাণ কী ব্ৰহ্মপুরাণের তুলনায় ভাগবত পুরাণই বোধহয় সবচেয়ে বেশি করে তাকে মানুষ করে রেখেছে এবং সেই মনুষ্যত্বের অভিব্যক্তি চরম সরসতায় পরিবেশিত হয়েছে যমলাৰ্জুন-ভঙ্গে। যমল-অর্জুন মানে দুটি একসঙ্গে বেড়ে ওঠা অর্জুন গাছ, যেগুলির অধিষ্ঠান ছিল যশোমতীর কুটীর প্রাঙ্গণে। বালচরিত নাটক অনুযায়ী তখন কৃষ্ণের বয়স খুবই কম। সে এক গয়লা-বাড়িতে ননী খায়, ননী না দিলে ননী নষ্ট করে। এক বাড়িতে দুধ খায়, অন্য বাড়িতে ঘোলের হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে লুব্ধ দৃষ্টিতে।
ব্রজমাইরা বিরক্ত হয়ে যশোদার কাছে নালিশ করেন। যশোদা রাগে লজ্জায় একটি চাল-ডাল ভাঙার জাঁতাকল বা উলুখলের সঙ্গে কৃষ্ণকে বেঁধে রাখেন। কৃষ্ণ গোঁয়ার্তুমি করতে থাকেন এবং এক সময় উলুখল উলটে পড়ে। কৃষ্ণও গিয়ে পড়েন যমজ অর্জুন গাছের ওপর। বালচরিতের নট-নায়ক বুড়ো গয়লা মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ওই গাছ দুটি ছিল বৃক্ষরূপী দানব–যমলাৰ্জুনোর্নাম দানবয়ো–নিক্ষিপ্তম্। কৃষ্ণ এদের ওপর এসে পড়তেই তারা দানবের রূপ ধারণ করে এবং মারা যায়– তাবপি দানবৌ ভূত্বা তত এব মৃতৌ।
যমলার্জুনের এই দানব-রূপই বোধহয় এই কাহিনীর সবচেয়ে পুরনো চেহারা। প্রাচীন পুরাণগুলির মধ্যে হরিবংশ এবং বিষ্ণুপুরাণ ছাড়া আর সব পুরাণেই–যেমন ভাগবত বা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে–যমজ অর্জুন হল কুবেরের দুই ছেলের অভিশপ্ত রূপ। ভাগবত পুরাণ অর্জুন বৃক্ষ-দুটির জন্য নতুন একটি অধ্যায় যোজনা করেছে এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে কুবেরের লম্পট-প্রায় দুটি পুত্র নারদের অভিশাপে অর্জুন-বৃক্ষতা প্রাপ্ত হয়েছে–পুরা নারদশাপেন বৃক্ষতাং প্রাপিতৌ মদাৎ।
ভাগবত পুরাণের বর্ণনা এবং কবিকৃতি অপূর্ব, মধুর। কিন্তু এখানে পরম ঈশ্বরের করুণাগুণ যতখানি রসতা প্রাপ্ত হয়েছে, স্বাভাবিকতা ঠিক ততখানিই কম। প্রতি তুলনায় হরিবংশ কিংবা বিষ্ণুপুরাণের দিকে তাকিয়ে দেখুন। কত সহজ, সংক্ষিপ্ত এবং অনাড়ম্বর সেই বর্ণনা। ঠিক যেমন সহজভাবে পূতনা, শকটাসুরেরা কৃষ্ণকে মারতে এসেছিল, তেমনি সহজভাবেই এই বৃক্ষরূপী দানবরা দাঁড়িয়ে ছিল যশোমতীর প্রাঙ্গণে। বালচরিত নাটক, হরিবংশ অথবা বিষ্ণুপুরাণ–তিনজনেই যমলাৰ্জুনের কাহিনী আরম্ভ করেছে কৃষ্ণের বাল্য-চাপল্য এবং দুষ্টুমির সূত্র ধরে। অর্থাৎ কিনা কৃষ্ণের দুষ্ট-ক্রীড়ার কথা বলতে গেলেই অর্জুন-বৃক্ষের কথাটি আপনিই এসে পড়ে।
বিষ্ণুপুরাণে দেখছি–সেই দুষ্ট বালক সর্বাঙ্গে গোময় মেখে, ভস্ম আর ধূলি মেখে–করীষ ভস্ম-দিগ্ধাঙ্গৌ–এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় এবং রোহিণী অথবা যশোদার ক্ষমতা হয় না যে তারা কৃষ্ণকে আটকাবেন–ন নিবারয়িতুং শেকে যশোদা ন চ রোহিণী। এই এখনই সে গোয়ালঘরে যাচ্ছে, এই একটা সদ্য-জন্মানো বাছুরের ল্যাজ ধরে টানছে–তদহজাত-গোবৎস-পুচ্ছাকর্ষণ-তৎপরৌ-এই রকম সব স্বেচ্ছাকৃত ছেলেমানুষি। যশোদা সইতে না পেরে কৃষ্ণকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখলেন উদুখলের কাহিনীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মায়ের দড়ির (দাম) বাঁধন যেই কৃষ্ণের পেটে পড়ল সেই থেকে তাকে ভালবাসার একটি নামই হয়ে গেল দামোদর। ইতিমধ্যে উদুখল উলটে পড়ল, যমলাৰ্জুন বৃক্ষ ভেঙে পড়ল মড়মড় করে।
কিন্তু এ অতি সামান্য কথা যে, গাছ-রাক্ষস মারা গেল। সবচেয়ে সাংঘাতিক কথাটা হল–তিন ভুবনের ঈশ্বরের পেটে মায়ের নিজে হাতে সাজা দেওয়া দড়ির বাঁধন পড়ল। ভাগবতের কবি আর থাকতে পারেননি। অসামান্য কাব্যবন্ধ তৈরি করে তিনি বললেন–যাঁর আদি-অন্ত নেই, যাঁর পূর্ব-উত্তর সীমারেখা নেই সেই সর্বব্যাপ্ত বিভু ঈশ্বরকে জননী যশোমতী প্রাকৃত শিশুর মতো বেঁধে ফেললেন–গোপিকোখলে দাম্ন ববন্ধ প্রাকৃতং যথা। আর ঈশ্বরের কী অবস্থা? রবীন্দ্রনাথ কোথাও বলেছিলেন–যিনি মুক্ত, তিনি আসতে চান বন্ধনের মধ্যে। মর্ত জননীর পরিশ্রম দেখে তিনি নিজে ধরা দিলেন মায়ের স্নেহবন্ধনের রজ্জুতে দৃষ্টা পরিশ্রমং কৃষ্ণঃ কৃপয়াসীৎ স্ববন্ধনে। চৈতন্যপন্থীরা তৃপ্ত হলেন এই ভেবে যে, পরম ঈশ্বর–তত্ত্ব বাৎসল্য–রসের বশীভূত হলেন। তিনি ঈশ্বর থাকলেন না, তিনি মানুষ হয়ে আনন্দ পেলেন। ভাগবত পুরাণে দেখছি–পাণ্ডব-জননী কুন্তীর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছে কৃষ্ণের। তিনি যুবক কৃষ্ণকে দেখে মন্তব্য করছেন–আমার ভাবতে ভারি মজা লাগে যে, যাকে ভয়ও নাকি ভয় পায়, সেই তুমি যখন মায়ের-বন্ধন রঞ্জুতে আবদ্ধ হয়ে মাথা নীচু করে কাঁদছিলে আর ক্রোধাবিষ্ট মাকে দেখে ভয় পাচ্ছিলে–সেই দৃশ্যটা ভাবতে আমার ভারি মজা লাগে।
হয়তো কৃষ্ণজীবনের এই কাহিনীগুলির পিছনে অন্য কোনও গূঢ় তত্ত্বও আছে। হয়তো এই গাছ-গাড়ি আর পূতনার কাহিনী রূপকথার কল্পমাত্র। কিন্তু ছিটে-ফোঁটা পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করতে চাইলে এর মধ্যেই রিলিজিয়নের মোবিলিটি লক্ষ্য করা যেতে পারে। বলা যেতে পারে–কৃষ্ণের জন্মকালে প্রকৃতির নানা স্বরূপকে মানুষ যেভাবে পুজো করত, সেই প্রকৃতি পূজার ভাঙন শুরু হয়েছে শকট-ভঞ্জন, যমলাৰ্জুনভঙ্গের মধ্য দিয়ে। বাস্তবিকই আমরা হরিবংশের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি যে, যমলাৰ্জুন ভগ্ন হবার পর গোপবৃদ্ধরা এই অদ্ভুত ভগ্নবৃক্ষ দেখার জন্য সবাই এসে জমায়েত হল। তারা মন্তব্য করল–জল্পতুস্তে যথাকামং–কী আশ্চর্য ঘটনা! এই বৃক্ষ দুটি আমাদের গয়লা-লোকেদের কাছে মন্দিরের মতো ছিল, সেই গাছ দুটিকে ভাঙল কে–কেনেমৌ পাতিতৌ বৃক্ষৌ ঘোস্যায়তনোপমৌ। কোথাও ঝড় হয়নি, বৃষ্টি হয়নি এমনকি বিদ্যুৎপ্রপাত–একটা বাজও পড়েনি। এমনও বলতে পারি না যে, বন থেকে হাতি এসে এই গাছ দুটো ভেঙে দিয়েছে। তাহলে কে এই গাছ দুটি ভাঙল–
