বিনা বাতং বিনা বর্ষং বিদ্যুৎ–প্রপতনং বিনা।
বিনা হস্তিকৃতং দোয়ং কেনেমৌ পাতিতৌ মৌ।।
যে বৃক্ষ-দুটিতে ব্রজবাসীদের দেবতার প্রতিষ্ঠা, সেই বৃক্ষ-দুটিকে তারা যেমন ভালও বাসত, তেমনি ভয়ও পেত। তারা বলতে থাকল–হায়! আজ থেকে এই শিকড়-উপড়ে যাওয়া অর্জুন গাছ দুটি আর ব্রজের শোভাবর্ধন করাবে না! নন্দ-গোপকে ডেকে গোপ বৃদ্ধরা জানাল–ভাই নন্দ! এতকাল যদি এই গাছ দুটি এখানে আমাদের সকলের কল্যাণ বিধান করে থাকে–যদিমৌ ঘোষ–রচিতৌ ঘোষ-কল্যাণ-কারিণৌতবে এ দুটো উপড়ে পড়ার ওপরেও তোমার মঙ্গল করে গেছে। কেননা এত বড় গাছ হওয়া সত্ত্বেও গাছ-দুটি তোমার ছেলেকে ছেড়ে দিয়েছেনন্দলোপ প্রসন্নৌ তে দ্রুমাবেব গতাকপি।
বেশ বোঝা যায় ব্রজবাসীরা অর্জুন বৃক্ষ দুটির মধ্যে দেবতার প্রতিষ্ঠা করেছিল– ঘোষরচিতৌ–এবং দিব্য-জ্ঞানে এই বৃক্ষ দুটির পূজাও করত। আবার শকট-ভঞ্জনের পর আমরা বিষ্ণু পুরাণেও দেখেছি যে জননী যশোমতী সন্ত্রস্ত হৃদয়ে ফুল-ফল এবং দই-খই দিয়ে শকটপূজা করেছিলেন–শকটং চার্চয়ামাস দধি-পুষ্প-ফলাতৈঃ।
এই দুটি ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে, ব্রজবাসীরা এই ধরনের পূজায় অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণের জন্মের পর থেকেই প্রকৃতি-পূজার এই নিসর্গ প্রত্যয়গুলি আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ছে। শকট-ভঞ্জন অথবা বৃক্ষ-ভঞ্জন কৃষ্ণ-জীবনের ক্ষেত্রে যতখানি বাস্তব, তার থেকেও এর ধর্মীয় ইঙ্গিত বেশি। আগে যে পূজা-পর্ব, আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল, কৃষ্ণের ব্যক্তিত্ব সেই সব পূজা-পার্বণ আচারের ওপর নিজের প্রতিষ্ঠা ঘটাচ্ছে। সর্বত্র একটা পরিবর্তন আসছে। সে পরিবর্তন আসছে বিশ্বাসে, কথায়, সমাজে, রাজনীতিতে এবং এই সমস্ত পরিবর্তনেরই মাথায় চেপে বসে আছেন সেই অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব, যার নাম কৃষ্ণ, পূতনা-বধ, শকট-ভঞ্জন এবং অর্জুন-বৃক্ষ পাতিত হবার পর যার নতুন নামকরণ হল দামোদর। বালচরিত নাটকের বুড়ো গয়লা সোচ্ছ্বাসে তার ভাগনেকে জানিয়েছে যে, এইসব বড় বড় ঘটনার পর বোঝা গেছে যে এই বালক মহাপরাক্রমশালী, অতএব সবাই তাকে এখন প্রভু বলে মেনে নিয়েছে, এখন থেকে সেই আমাদের মোড়ল–ততে গোপজনৈরুক্ত–মহাবলপরাক্রমমোদ্য প্রভৃতি ভর্তৃদামোদর নাম ভবতু ইতি।
মাথুর বসুদেব যখন তাঁর পুত্রটিকে গোপ নন্দের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন–বালকটির গতি কী হবে। নন্দ অকপটে জানিয়েছিলেন–ও আমাদের ঘোষ পল্লীর মোড়ল হবে–অস্মাকং ঘোষস্য পতি ভবতি। নন্দের আশা বা স্বপ্ন এখন সার্থক, তার ছেলে এখন ভর্তা দামোদর। ব্রজবাসীদের সে ভরণ করে সবার সুখ-দুঃখে সেই এক সুসহায়।
.
৮৮.
আগেই জানিয়েছি, যারা তিন-চার রকমের কৃষ্ণ-তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, আমি তাদের দলে নেই। মথুরা-দ্বারকার পরম ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তিত্বকে যাঁরা বৃন্দাবনের মোহন কৃষ্ণের সঙ্গে মেলাতে পারেন না, তাদের কূট বুদ্ধিকে আমরা শ্রদ্ধা করি, কিন্তু তাদের সাধারণ বুদ্ধি নেই, হৃদয়ও নেই। বস্তুত বৃন্দাবনে নন্দ গোপের গৃহে মানুষ হওয়া কৃষ্ণকে এতটা নবনীত-কোমল ভাবার কোনও কারণ নেই, যাতে করে মথুরা-দ্বারকার কৃষ্ণের সঙ্গে তাকে বেমানান লাগে। বৃন্দাবনে যে সব ঘটনা ঘটেছে, তাতে অঘাসুর-বকাসুর অথবা পূতনা-তৃণাবর্তের চেহারায় আপনাদের বিশ্বাস নাই থাকতে পারে। কিন্তু মথুরারাজ কংসকেও এমন কোমল-স্বভাবের রাজা ভাবার কারণ নেই যিনি শত্ৰুপ্রতিম বসুদেবের সন্তানকে প্রোষিত জেনেও নিশ্চেষ্ট বসে থাকবেন। অর্থাৎ অসুরের সংখ্যাতত্ত্বে না গিয়ে এটাই বলা ভাল যে, কৃষ্ণ বিপদগ্রস্ত হচ্ছিলেন বারবার।
বস্তুত বৃন্দাবনে গোপগৃহের সমাদর-পুষ্ট বালকটির জীবনে ছোটবেলা থেকেই যে সব অসুর-রাক্ষসদের আমদানি হচ্ছে, তাতে খুব বিশ্বাস না করে কীভাবে তার ব্যক্তিত্বের পরিণতি ঘটছে, সেটাই ভাল করে বুঝে নেওয়া ভাল। বালচরিত নাটকে দেখেছি–যমলাৰ্জুন বৃক্ষ ভগ্ন হবার পর থেকেই বৃন্দাবনের মানুষরা কৃষ্ণকে ভর্তৃ-দামোদর বলতে আরম্ভ করেছে। এই ভর্তা বা ভরণ-পোষণ করার মতো একটা যোগ্য পদবি কৃষ্ণের ভাগ্যে একদিনে জোটেনি। তিনি কটি অঘাসুর-বকাসুর বধ করেছেন, সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু বৃন্দাবনে যারা অন্য জায়গা থেকে এসে উপদ্রব করত, তাদের তিনি প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে বৃন্দাবনের মানুষদের মনে চিরাচরিত বিশ্বাস–শকট-পূজা, বৃক্ষ-পূজা এগুলোর মূলে আঘাত করে কৃষ্ণ তাদের নিজস্ব ব্যবহারিক জীবনকে অনেক বড়, অনেক শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিণতি ঘটছিল এইভাবেই।
লক্ষণীয়, হরিবংশ এবং বিষ্ণুপুরাণের মতো প্রাচীন পুরাণেও কৃষ্ণের এখন একটা নতুন নাম হয়েছে। অর্থাৎ সেই দামোদরস চ তেনৈব নাম্না তু কৃষ্ণো বৈ দামবন্ধনাৎ। সকলেই তাকে এখন দামোদর বলে ডাকে। কিন্তু বালচরিত নাটকে তিনি এখন শুধু দামোদর নন, ভত্ত্ব দামোদর। যমলাৰ্জুন-ভঙ্গের পর কৃষ্ণের ব্যক্তিত্ব যতখানি মর্যাদায় আরোহণ করেছে, সেই মর্যাদা আস্তে আস্তে পরিণতি লাভ করেছে কালিয়-দমনের ঘটনায় এবং এরও পরে কৃষ্ণের ভর্তা বিশেষণটি চরমভাবে সার্থক হয়ে উঠেছে ইন্দ্র-যজ্ঞের নিষিদ্ধতায়।
কৃষ্ণের বাল্য-কৈশোরের নানা বীর-কাহিনীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনী হল কালিয়-দমন। কারণ কালিয় কংসের প্রেরিত কোনও অসুর-রাক্ষস নয়, সে নিজেই মূর্তিমতী বিপন্নতা। প্রবাহিনী যমুনার যে জল সমস্ত বৃন্দাবনবাসীর জীবনদায়িনী, সেই যমুনার জল বিষাক্ত করে তুলেছে কালিয়। কালিয়র পরিচয় হলসে নাগরাজ। ভয়ঙ্কর বিষ তার মুখে, শরীরে। যেখানে সে থাকে, সেখানে জনমানব তো আসেই না, এমনকি কোনও পশু-পক্ষীও তার ধারে কাছে আসে না–ন গোপৈ–গোধনৈর্বাপি তৃষ্ণার্তৈরুপযুজ্যতে।
