বিষ্ণুপুরাণে দেখেছি–পূতনার প্রাণান্তক চিৎকার এবং ব্রজবাসীদের চিৎকারে জননী যশোমতী যখন সম্পূর্ণ বুঝলেন যে তার শিশুটি বেঁচে গেছে, তখন তিনি সাধারণ গ্রাম্য জননীর মতোই ছেলের সর্বাঙ্গে গোপুচ্ছের ঝাড়া দিয়ে অপদেবতার দোষ অপনোদন করলেন গোপুচ্ছং ভ্রাম্য হস্তেন বালদোষমপাকরো। স্নেহময় নন্দরাজ, যিনি প্রায় বুড়ো বয়সে পুত্রলাভ করেছেন, তিনি নির্দ্বিধায় গোময়-চূর্ণ হাতে নিয়ে শতেক দেবতার নাম উচ্চারণে ছেলের প্রত্যঙ্গ-রক্ষার মন্ত্র উচ্চারণ করলেন
গোঙ করীষমাদায় নন্দগোপোপি মস্তকে।
কৃষ্ণস্য প্রদদৌ রক্ষাং কুংশ্চৈত দুদীরয়।
পূতনা-বধের বিষয়ে ভাগবতপুরাণে যে শ্লোকটি আছে, সেটি নিয়ে পণ্ডিতজনের নানা বক্তব্য আছে। ভাগবত বলেছে–কৃষ্ণ যখন পূতনার স্তন্য পান করার সময় তার প্রাণও শোষণ করলেন, তখন তাকে যেন কিঞ্চিৎ ক্রোধাবিষ্ট দেখা গেছে–প্রাণৈঃ সমং রোষ সমন্বিততাপিবৎ। পণ্ডিতজনেরা তর্ক করেছেন যে, অতটুকু শিশুর মুখে যে ক্রোধাবেশ লক্ষ্য করা গেছে, তাতে বোঝা যায় মনুষ্য-রূপায়ণের মধ্যেও তাঁর ঈশ্বরত্বের বোধটুকু বোধহয় পুরোপুরি যায়নি। কেননা ক্রোধ হয়েছে মানেই তিনি স্ত্রীবেশী পূতনার রাক্ষসী-রূপটুকু বুঝতে পেরেছেন এবং সেইজন্যই তার ক্রোধাবেশ দেখা গেছে।
বৈষ্ণব টীকাকারেরা বলে উঠলেন–মনুষ্যলীলায় ঈশ্বরত্বের বোধ এক অসম্ভব ব্যাপার। হতেই পারে না। দেখুন না ভাগবত পুরাণেরই অন্য শ্লোকে তাকে নির্ভয়ে পূতনার কোলে খেলা করতে দেখছি–বালঞ্চ তস্যোরসি ক্ৰীড়ন্তম অকুতোভয়ম। যশোদা-রোহিণী ইত্যাদি ব্রজমাইদের দেখতে পাচ্ছি–তারা কৃষ্ণকে গোমূত্রে স্নান করিয়ে শিশু কৃষ্ণের মস্তক স্পর্শ করে অঙ্গ-রক্ষার মন্ত্র পড়ছেন। স্বয়ং ঈশ্বর হয়ে যদি তাকে গ্রাম্য-সংস্কারের কাছে মাথা নত করতে হয়, তবে সেটাই তো কৃষ্ণের ঐশ্বর্যবোধহীনতার যথেষ্ট পরিচয়। তবে হ্যাঁ, পূতনাবধের সময় তার মুখে যে রাগটুকু দেখা গেল, ওটা কৃষ্ণের রাগ নয়, ওটি তাঁর ঐশী-শক্তির অসচেতন প্রকাশ। পরম ঈশ্বর সম্পূর্ণ মনুষ্যের ভাব অঙ্গীকার করলে অবতারের অন্যতম দুষ্ট-সংহারিকা শক্তি তার অন্তরশায়িনী হয়ে থাকে। সেই শক্তিই পূতনার প্রাণ হরণ করে এবং সেই শক্তিরই ক্রোধময় অভিব্যক্তি ঘটেছে কৃষ্ণের মুখে, এটি কৃষ্ণ নন–রোষময়ী দুষ্ট-সংহারিকা শক্তিরেব অপবিত্রা প্রাণান্ স্তনঞ্চাপিবৎ অশোষয়ৎ, ন তু সঃ।
সনাতন গোস্বামী আবার এই শ্লোকটির মধ্যে অন্য এক গুঢ়ার্থ নির্ণয় করে বলেছেন–মনুষ্য-স্বরূপেও যখন ভগবানকে এই দুষ্ট-বিনাশের মতো কাজটি করতে হয়, তখন হত্যা-মারণের অভিনয় বা অনুকরণটুকু করতেই হয়–স্বয়ং তু তদনুকরণমাত্রং কৃতবান্। একটা গাছ কাটার ব্যাপারে একটি কুঠার যেমন অচেতন করণ-মাত্র, তেমনি কৃষ্ণও তার ঐশী শক্তির সম্বন্ধে অচেতন। কিন্তু বৃক্ষ-ছেদন প্রক্রিয়ায় কুঠার যেমন তার কাজটি করে, তেমনি অবতার-পুরুষের দুষ্টবিনাশিনী ঐশী শক্তি তার কাজটুকু করেই যায়। হয়তো সেইজন্যই পূতনা-বধের মতো একটা বড় ব্যাপার কী করে ঘটল, তা ব্রজবাসীরা বুঝতেই পারলেন না। আর তারাও যেহেতু কৃষ্ণের ঐশী শক্তি সম্বন্ধে অচেতন, তাই হরিবংশে দেখছি–নন্দ-গোপ এবং যশোমতী মাতা সকলেই ভয় পাচ্ছেন। তারা কংসের দুষ্ট-বুদ্ধি সম্বন্ধে ভীষণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন–কংসাদ্ভয়ং চকারোগ্ৰং বিস্ময়ঞ্চ জগাম চ।
আপনারা হয়তো এতক্ষণে বুঝেছেন যে, আমরা কেন পূতনা-বধের ব্যাপারটা যথাসম্ভব সবিস্তারে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। চেষ্টা করলাম এইজন্য যে, আমাদের প্রায় একই কথা বলতে হবে শকটাসুর-বধ, যমলাজুন-ভঙ্গ, অঘাসুর, বকাসুর, তৃণাবর্ত অথবা অরিষ্টাসুর-বধের সম্বন্ধেও। তবে হ্যাঁ, এইসব সবিস্তারে বলতে গেলে আমাকে ভক্তি গদগদ চিত্তে ভাগবত-পাঠ শুরু করতে হয়। তাই কোনও বিস্তারে যাচ্ছি না। শুধু জানাই–শকটাসুরকে বাংলা ভাষায় গাড়ি-রাক্ষস বলা যায়। নন্দগোপ গয়লাদের রাজা হলেও গয়লাদের বসতবাটিতেই বাস করেন। রাজপুত্র রক্ষার ভাবনা-চিন্তা তার নেই। যশোমতী একটি গোরুর গাড়ির পাশে বাচ্চা শুইয়ে রেখেছিলেন। লোকে দেখল–গোরুর গাড়ি ভেঙে গেছে। সহজবুদ্ধি গোপজনেরা তবু একবারের তরেও শিশু-কৃষ্ণের ভগবত্তায় বিশ্বাস করল না, তারা শুধু বিস্ময়ে হতবাক হল, শুধু ভয় পেলন চ তে শ্রদ্ধু–গোপাঃ সর্বে মানুষ বুদ্ধয়ঃ–শুধু ভাবল, কেমন করে একটা, গাড়ি এমনি এমনিই ভেঙে পড়ল কৃষ্ণের পাশেই–কথং স্বয়ং বৈ শকটং বিপর্যগাৎ।
শকট-ভঞ্জনের মধ্যে এমনিতে কিছুই নেই, শুধু চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের মাধুর্যের টিপ্পনীটুকু ছাড়া। শিশুকৃষ্ণ কাদল, বড় বড় মানুষের ভয় দেখে ভয় পেল, আর যশোমতীর জননী-হৃদয় মন্থন করা স্তন্য পান করে সে ক্রন্দন থেকে বিরতও হল। যাঁরা বলেন–কৃষ্ণের এসব মধুরতার টিপ্পনী এসেছে অনেক পরে, ভাগবত পুরাণের কালে, তাদের আমরা পঞ্চম খ্রিস্টাব্দে তৈরি দেওগড়ের প্রস্তরাকীর্ণ দশাবতার-মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে বলি। দেখবেন–ভাগবত পুরাণের শকটভঞ্জনের উপাখ্যানে যে মধুরতা জড়িত আছে, সেই মধুরতা পঞ্চম খ্রিস্টাব্দেও বিরাজমান।
তাই বলছিলাম কৃষ্ণজীবনে মধুরতার আমদানি শুধু বৈষ্ণবেরাই করেননি। করেছে মানুষ। করেছে ভাস্কর। তার আকুল শিল্পীজনোচিত বেদনার স্পর্শ দিয়ে শিশু কৃষ্ণের জীবনে মনুষ্যত্ব দিয়েছে ভাস্কর। আসল কথা হল–কৃষ্ণের জীবনে অনেক বীরত্ব, অনেক ক্ষমতা অনেক শক্তির প্রদর্শনী আছে বলেই হয়তো দার্শনিকের চোখ বেয়ে ভগবত্তা নেমে এসেছে তার সমস্ত ক্রিয়াকলাপে। কিন্তু পুরাণ-ইতিহাসের মানুষ তার মানব-স্বভাবটাও কখনও তোলেনি। আর ভোলেনি বলেই তার মধ্যে ভগবত্তার চরম রূপ দেখেও কৃষ্ণকে তারা জীবৎকালে কখনও ভগবান বলে মেনে নেয়নি।
