কৃষ্ণ-জীবনের এই কাহিনীগুলি কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, তার একটা বড় প্রমাণ কিন্তু সেই বালচরিত নাটক। সেই কাহিনীগুলি হয়তো জনসাধারণের মুখে মুখে চালু ছিল বলেই আমরা কৃষ্ণের শকট-ভঞ্জন, পূতনা-বধ বা আরও ছোট-খাটো ঘটনা এক বুড়ো গয়লার মুখে বসানো দেখছি। বুড়ো গয়লা তার ভাগনে দামকের কাছে শিশু কৃষ্ণের নানা অলৌকিক কাহিনী বলছে। কাজেই কৃষ্ণজীবনকে সম্পূর্ণ ধরতে হলে আমাদের পক্ষেও এই oral tradition বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
বস্তুত বালচরিত নাটকে বৃদ্ধ-গোপালকের মুখে যে ঘটনাগুলি সংবাদ দেবার ভঙ্গিতে ধরা আছে, সেগুলি সবিস্তারে বর্ণিত আছে আমাদের পুরাণগুলিতে। তবে হ্যাঁ পুরাণে যে কথা আগে আছে, সে কথা হয়তো বুড়ো গয়লার মুখে এসেছে পরে। এই যেমন হরিবংশে আগে শকটাসুর ভঞ্জনের কাহিনী, পরে পূতনা-বধ। কিন্তু বালচরিত নাটকে আগে পূতনা-বধ, পরে শকটাসুর-ভঞ্জনের কাহিনী। বিষ্ণুপুরাণেও তাই। ভাগবত পুরাণেও তাই। আর স্বাভাবিকতার দিক দিয়েও বিষ্ণু-ভাগবত পুরাণই ঠিক।
বালচরিত নাটকে বুড়ো গয়লা তার ভাগনেকে কৃষ্ণের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা বলছে–এই তো দেখ না। নন্দ-গোপের ছেলেটা জন্মানোর পর দশদিন মাত্র গেছে। তারই মধ্যে পূতনা নামে এক রাক্ষসী স্তনে বিষ মাখিয়ে যশোদার রূপ ধরে এল–দশরাত্র-প্রসূতে নন্দগোপপুত্রে পূতনা নামী দানবী বিষসম্পূরিত-স্তনা নন্দগোপ্যা রূপং গৃহীত্বাগতা। তারপর সে ছেলেটাকে নিয়ে তার মুখে স্তন পুরে দিল। তারপর সে ঘুমচ্ছে দেখে ছেলেটা তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সেও রাক্ষসীর রূপ ধারণ করে তক্ষুনি মরে গেল–সাপি দানবী ভূত্বা তত এব মৃতা।
বুড়ো গয়লা এরপর অন্য একটি কাহিনীতে চলে গেছে। বালচরিত নাটকে এই ঘটনাটা লোক-পরম্পরা প্রাপ্ত (oral tradition) সংবাদের মতো পরিবেশিত হওয়ায় কাহিনীর রসবত্তা খানিকটা ব্যাহত হয়েছে বই কী! কিন্তু নাট্যকার সম্ভবত যেখান থেকে তার কাহিনীর উপাদান সংগ্রহ করেছেন সেটা হরিবংশ বা বিষ্ণুপুরাণে পূতনার কাহিনী।
হরিবংশে পূতনা ভোজরাজ কংসের ধাত্রী ছিল এবং তার চেহারা ছিল পক্ষিণীর মতো–পূতনা নাম শকুনী ঘোরা প্রাণিভয়ঙ্করী। সে মাঝরাত্রিতে বৃন্দাবনে আসে এবং সবাই যখন নিদ্রায় আচ্ছন্ন তখন স্ত্রী–বেশ ধারণ করে সে তার বিষদিগ্ধ স্তন কৃষ্ণের মুখে পুরে দেয়। কৃয় তার স্তন্যপানের সঙ্গে প্রাণটিও বুঝি পান করে ফেলেন–তস্যাঃ স্তনং পপৌ কৃষ্ণঃ প্রাণৈঃ সহ বিনদ্য চ। পূতনা নিজের রূপ ধারণ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বিষ্ণু পুরাণেও পূতনা-বধের কাহিনী প্রায় অনুরূপ, তবে নর-রূপী কৃষ্ণের মধুর স্পর্শ যেন এখানে একটু বেশি এবং ভাগবত পুরাণে এই মধুরতা দার্শনিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। আসছি সে কথায়।
পূতনা সম্বন্ধে মিথলজিস্টদের ধারণাটা একটু বলে নিই। মিথলজিস্টরা সাধারণত কৃষ্ণের মধ্যে বৈদিক ইন্দ্রের প্রতিরূপ দেখতে পান। অতএব কুশাব বলে যে অদ্ভুত জীবটি ইন্দ্রকে বাল্যকালেই হত্যা করতে চেয়েছিল, তারই প্রতিরূপ লক্ষিত হয়েছে বালঘাতিনী পূতনার মধ্যে। তুলনামূলক ধর্মীয় বিচারে পূতনাকে আমরা অবশ্য আরও একটু অন্যভাবে পাই। গ্রিস দেশের পৌরাণিক কাহিনীতে ডেলফাই নগরে অ্যাপোলো যে সর্প-রাক্ষসটিকে হত্যা করেছিলেন তার নাম টাইফও (Typhaon), যার থেকে ইংরেজিতে পাইথন (Python)। লক্ষণীয় বিষয় হল ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দতন্ত্রে দুই ভগিনী-ভাষার দুটি শব্দ পূতনা এবং পাইথো (Pytho) কিন্তু একই ধাতু থেকে জন্মেছে। সেই ধাতুর সংস্কৃত রূপ থেকে পুতি (পচন) শব্দের উৎপত্তি আর গ্রিসীয় রূপ থেকে আসে পুথেয়ি (puthein) যার অর্থ putrefaction মানে সেই পচন। ওদেশের ভাবনায়–সূর্যের অলৌকিক শক্তিতে পাইথনের মৃতদেহ গলিত হয়েছিল এবং সেটা সম্পূর্ণ পচন ধরার পর (puthein) সেই পচনের জায়গাটার নামই হয়ে গিয়েছিল পাইথথা (Pytho)। মহামতি হেসিয়ড হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই পচনের ঘটনাটিকে টাইফাঁও অথবা পাইথনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখান। অপিচ এই গ্রিসীয় পচনের স্বরূপ তথা পূতনা শব্দের ধাতু-মূল পুতি (পচন) থেকেই পণ্ডিতেরা সিদ্ধান্ত করেছেন–The element of rot or poison is symbolised by the poisoned breast of Putana. উল্লেখ্য, পূতনার বিষয়ে মনস্বী বঙ্কিমচন্দ্র যে মত ব্যক্ত করেছেন, সেটাকে খুব নির্ভরযোগ্য মনে করা যায় না।
যাইহোক, হরিবংশ ছেড়ে বিষ্ণু-পুরাণে যে মধুর স্পর্শটুকু পেয়েছি, সেটা আগে বলে নিই। বিষ্ণুপুরাণে দেখছি–পূতনা মারা গেছে রাক্ষসীর রূপ ধারণ করে এবং আমরা যশোমতী-নন্দন কৃষ্ণকে কিন্তু কোনও অলৌকিক রূপ ধারণ করতে দেখছি না। তিনি যেমন শিশুটি ছিলেন, সেই স্তন্যপান–লুব্ধ শিশুটির মতোই তাকে দেখা গেল পূতনার ক্রোড়গত অবস্থায়–দদৃশ্যঃ পূতনোৎসঙ্গে কৃষ্ণং তাঞ্চ নিপাতিতা। সাহিত্যিকের ভাবনাকে আরও এক গুণ বেশি করে দিয়ে যে শিল্পীরা সেই গুপ্ত যুগে বসে পূতনা-বধের ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন, তাদের সেই খোদাই করা প্রস্তর-মূর্তিতে কৃষ্ণ যখন পূতনার বুকের ওপর স্তন্যপান-রত, তখনও তাঁর মাথায় ছোট্ট শিখিপুচ্ছটি আছে। আর তার মুখে আছে সেই শিশুর অনাবিল নির্বোধ বিশ্বাস–যা তার ভাগবত্তা বা ঈশ্বর-স্বরূপ সম্পূর্ণ ভুলিয়ে দিয়ে আমাদেরই ঘরের এক দেবশিশুর মতো করে তুলেছে তাকে।
