বনজাত পুষ্পের কর্ণভূষণ এই তরুণীদের কানে। মাথায় পয়োকুম্ভ। স্তনের অগ্রভাগ স্কুটাস্ফুট-ব্যঞ্জনায় বস্ত্রাঞ্চলে আবৃত–শিরোভি-ঘৃতকুম্ভাভি-বদ্ধৈরগ্রস্তনাম্বরৈঃ। যমুনার তীরগামী বিস্তীর্ণ পথ বেয়ে তারা জল নিয়ে আসে কাখের কলসী পুরে। আর ঠিক এই বর্ণনার পরেই–হরিবংশ ঠাকুরের সময়জ্ঞান কত প্রখর–ব্রজভূমির গোপরাজ নন্দ গোবর্ধন পর্বত ছেড়ে এসে প্রবেশ করেন ব্রজভূমিতে–যেখানে গোপবালকেরা তাদের ক্রীড়ামাতাল শব্দগুণে আকাশ মুখরিত করেছে–গোব্ৰজং গোপ-নাদিত। এই শব্দ-নিনাদের কারণ কি সেই যমুনায় জল আনতে যাওয়া জলহারিণী গোপরমণীরা–যমুনা-তীর-মার্গেন জলহারীভিরাবৃত?
হরিবংশ ঠাকুরের এই সামান্য এবং অসামান্য বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়–আর্যভূখণ্ডের সন্ত্রস্ত নাগরবৃত্তি এই অঞ্চলে তেমন প্রচলিত নয়। এই জনস্থানের তরুণ-তরুণীরা যথাসম্ভব মুক্ত মনে বিচরণ করে। তাদের অবাধ মেলামেশা, ঘোরা-ফেরার মধ্যে বৃদ্ধ-জনের তত কঠোর কটাক্ষ চোখে পড়ে না। অধ্যাপক ফ্রিলহেম হার্ডি বৃন্দাবনের এই সরল গ্রাম্য জীবনের মুগ্ধতা লক্ষ্য করেছেন নিপুণভাবে এবং তিনি দেখেছেন–হরিবংশের এই সহজ সরল গ্রাম্যতাই সম্পূর্ণ ধরা রয়েছে ভাসের বালচরিত নাটকে। এমনকি তার ধারণা–এখানকার যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা যে ভাষায় কথা বলে তাও তেমন কোনও পরিশীলিত ভাষা নয়। সেটা গয়লাদের ভাষা।
আমরা হরিবংশের এই বৃন্দাবনী বর্ণনা খানিকটা উল্লেখ করলাম এই জন্য যে, কৃষ্ণের শৈশব এবং বেড়ে ওঠাটা যদি ঠিক-ঠাক বুঝতে হয় তবে গ্রাম্য-জীবনের নানান সরলতা এবং মুগ্ধতাও আমাদের বুঝতে হবে। বৃন্দাবনের নন্দগ্রামে যে গোপরাজটি মথুরা-নগরের রাজশিশুর অধিকারী হলেন, তিনি প্রায় গয়লাদের মোড়ল গোছের; কিন্তু তাই বলে গোরু চরাতেও তার বাব না, গোরুর গাড়ি চালাতেও তার বাধে না। মাথুর বসুদেব যখন তার শিশুটিকে নন্দ-গোপের হাতে দিলেন, তখন তিনি দেখলেন শিশুটি বড় ভারী। তিনি বললেন–এই বালকটিকে হাতে ধরতে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে।
ভাস এখানে বড় অদ্ভুতভাবে নন্দ গোপের সরলতা এবং কৃষ্ণের ঈশ্বরত্বের সচেতনতাটুকু তুলে ধরতে চেয়েছেন। বসুদেব তাকে বললেন–তুমি তো যথেষ্টই শক্তিমান মানুষ। নন্দগোপ সঙ্গে সঙ্গে বসুদেবের সেই প্রশংসা স্বীকার করেন। কিন্তু ঈশ্বর বলেও হয়তো নয়, হয়তো শুধু মাথুর কুলের রাজপুত্র বলেই সরল নন্দরাজ বলে উঠছেন–দেখুন কত্তা। আমার শক্তি-ক্ষ্যাতা কিছু কম নয়–একটি ষাঁড় তেড়ে এলে আমি তার শিঙ দুটি ধরে নিজেকে বাঁচিয়েছিলাম–সন্দারয়মাণে বৃষভে শৃঙ্গং গৃহীত্বা মোচয়ামি। দুধের ভাড় সমেত গোরুর গাড়ি পাকে পড়ে গেলে আমি নিজেই পাঁক থেকে সেই গাড়ি তুলেছি–পঙ্কনিমগ্না ভাণ্ডশকটান্ আঘট্টয়ামি। আর সেই আমি এই শিশুটিকে ধরতে পারছি না?
শেষ পর্যন্ত এই গোপরাজ শিশুটিকে কক্ষপুটে নিয়েছেন, তাকে নিজগৃহের পরিচ্ছন্ন শয়নে শুইয়েও দিয়েছেন–সংবেশয়ামাস শিশুং শয়নীয়ং মহামতিঃ। কিন্তু মনে রাখতে হবে–এই ঘরে যদি কৃষ্ণকে বড় হতেই হয়, তবে মাঝে মাঝেই ব্রজভূমির গোরুর কথা আসবে, ষাঁড়-বলদের কথা আসবে। আর আসবে সরলমতি গোপবালকদের কথা, যারা যমুনা-পথবর্তিনী জলহারিণী গোপ কন্যাদের দেখে বৃন্দাবনের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে।
.
৮৭.
পৌরাণিক পণ্ডিতেরা বলেন সৌরকুলের দেবতাদের (solar gods) একটা বিরাট বৈশিষ্ট্য নাকি এই যে, তারা অল্প বয়সেই অনেক দৈত্য-দানব সংহার করে ফেলেন। এঁদের প্রত্যেকেরই একটা করে চরম শত্রু থাকেন এবং সেই চরম শত্রুকে বধের ব্যাপারটাই তাদের বীরত্বেরও চরম পরিণতি বয়ে আনে। ঠিক যেমন বৈদিক ইন্দ্র তার পূর্ব জীবনে বহু শত্রু বধ করেছেন, কিন্তু তার চরম পরিণতি হল বৃত্র-বধ–যা তাকে যশের চরম পদবীতে পৌঁছে দিয়েছে। তার পরিচয় হয়েছে বৃত্রয় (আবেস্তায় বেরিত্রগ্ন), বৃত্ৰহা বা বৃত্রহ নামে।
ইন্দ্রের চরম শাস্তিযোগ্য শত্রু যেমন বৃত্র, তেমনি ওদেশে অ্যাকিলিসের (Achilles) শেষ শত্রু হলেন হেকটর। পারস্যদেশীয় মিথ্র-দেবতার পরম শত্রু যেমন একটি বৃষ, তেমনি গেলগামেশ হত্যা করেছেন এনকিডুকে, মারদুক (marduk) বধ করেছেন টিয়ামকে (Tianat)। আবার দেখুন–যিশুখ্রিস্ট যেমন শয়তানের শেষ জয়টি লাভ করেছেন, তেমনি আমাদের বুদ্ধ–তিনিও সৌর দেবতা–তিনি শেষ কীর্তি লাভ করেছেন মার–বিজয়ের পরে। আর আমাদের পুরাণ চরিত্রে আসুন–রামচন্দ্রের শেষ মারণাস্ত্রের লক্ষ্য হলেন যেমন রাবণ, তেমনিই কৃষ্ণের প্রধান এবং শেষ লক্ষ্য হয়ে উঠবেন আপাতত কংস। কিন্তু এই রাবণ-বধ বা কংসবধের মতো যুগান্তকারী ঘটনা ঘটবার আগেই সৌর-দেবতা অনেক দৈত্য-রাক্ষস মেরে নিজের অসামান্য বীর্যবত্তার প্রমাণ দেন। ভবিষ্যতের মহানায়ক নিজেকে জানান দিতে থাকেন যে, তিনি এসে গেছেন–আর ভয় নেই।
জগৎত্ৰাতা সৌর দেবতাকুলের চরিত্রই নাকি এইরকম। পণ্ডিত মিথলজিস্টরা বিচিত্র বাক্য-বিভঙ্গে জগত্তারণ ঈশ্বরের (saviour God) সম্বন্ধে যা বলে থাকেন, ভারতবর্ষের অবতারবাদী ভক্তজনেরাও তাই বলে থাকেন। কাজেই সেই প্যাটার্নের কথা আমরা বলতে ভালবাসি না। কৃষ্ণ এক মহান ঐতিহাসিক চরিত্র বলেই সৌরদেবতা বা অবতারবাদের প্যাটার্ন তারও ভাগ্যে এসে জুটেছে; কাজেই বলতে ভাল না লাগলেও সেসব কথা একটু উল্লেখ করতে হবে বই কি! তাছাড়া কৃষ্ণের শৈশব-ক্রীড়ার সময়েই যেসব শত্রু-শাতনের কাহিনী তৈরি হয়েছে, তা ভারতবর্ষের আপামর জনসাধারণের মনে রীতিমতো গেঁথে বসে গেছে, কাজেই সামান্যভাবে হলেও আমাদের উল্লেখ করতে হবে।
