এইরকম ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিথলজিস্ট লেখেন–Perhaps the sun ris ing suddenly out of the dark night appears as an unaccountable and mysterious creation which in these myths has been translated into miracu lous births.
আবার দেখুন জন্মের পরেই সৌরকুলের দেবতারা অনেক সময়েই পিতা অথবা মাতার দ্বারা পরিত্যক্ত হন। ভারত-মহাকাব্যে ভীষ্ম এবং কর্ণ যেমন এই পরিত্যাগের উদাহরণ। তেমনই ওদেশে মোজেস পরিত্যক্ত হয়েছিলেন নল-খাগড়ার বনে। সৌর দেবতার অন্যতম কৃষ্ণও একইভাবে পরিত্যক্ত হয়েছিলেন বৃন্দাবনে গোপ-গৃহে। তবে এরও কারণ আছে। পিতা-মাতার দ্বারা এইভাবে পরিত্যক্ত হলে নাকি এই বীর-চরিত্রের ব্যাপারে মানুষের মায়া, ভীতি এবং বিস্ময় সবই হয়। অন্যদিকে তার সম্বন্ধে একটা heroic isolation তৈরি হয়। তারপরে এই পরিত্যক্ত শিশু যখন বড় হয়ে নানা বীরোচিত কর্ম করেন, তখন তার সম্বন্ধে মানুষের বিস্ময় গাঢ়তর হয়।
এতক্ষণ যা শুনলাম, যা বুঝলাম, তাতে মনে হয় যেন মিথলজিস্টরা একটা প্যাটার্ন তৈরি করেন এবং তুলনামূলক বিচার করলে সেটা বেশ বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয়। কিন্তু আমাদের মনে হয় কৃষ্ণকে এরকম একটা প্যাটার্নের মধ্যে ফেলে তাঁর জীবনের বিচার করলে খানিকটা ঐতিহাসিকতা নষ্ট হয় যেন। অন্যদিকে এটাও ঠিক যে, কৃষ্ণের মতো বিশাল ব্যক্তিত্ব যখন এইভাবে পরিত্যক্ত হবার পর এক সময় মহাভারতের নায়কে পরিণত হন, তখন তিনি অতি কৃষ্ণবর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সৌরকুলের দেবতা বলেও পরিগণিত হন, আবার তিনি প্যাটার্নের অন্তর্গত হয়ে মানুষ থেকে দেবতাতেও পরিণত হন।
কৃষ্ণ সম্বন্ধে মিথলজিস্টদের প্যাটার্ন যাই হোক, আমরা যখন তাকে বৃন্দাবনের পরিসরে মানুষ হতে দেখলাম, তখন তার মনুয্যোচিত ভাবটাই চোখে পড়ে বেশি, আর সেই সরল মনুষ্য-জীবন প্রদর্শন করার জন্য পৌরাণিকেরাও ভারি সুন্দর ব্যবস্থা নিয়েছেন। হরিবংশে দেখছি–কৃষ্ণের শৈশব-জীবনের প্রসঙ্গে যাবার আগেই যথাসম্ভব বৃন্দাবনের শোভা বর্ণনা করে নেওয়া হচ্ছে। বস্তুত শিশু কৃষ্ণ যেখানে থাকবেন, যেখানে বড় হবেন, সেই জায়গাটা যে মথুরা নগরের শহুরে পরিবেশের বাইরে এক সরল গ্রাম্য জীবন, সে ব্যাপারটা আগেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন হরিবংশের কথক-ঠাকুর।
প্রাকৃতিক দিক দিয়ে বৃন্দাবনের প্রধান আকর্ষণ হল যমুনা এবং গোবর্ধন পর্বত। নন্দগোপ বৃন্দাবনের নির্জন অরণ্যপথে ফিরে আসছিলেন। সেখানে যমুনার গভীর শীতল জলের স্নিগ্ধতা তাকে যেন আরও স্নিগ্ধ করে তুলল। নন্দগোপ গোবর্ধন পর্বতের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। সেখান থেকে সমস্ত ব্রজভূমি দেখা যায়–যমুনার তীরে ধীর সমীরে অনেকটা জায়গা জুড়ে এই ব্রজভূমি-যমুনাতীর–সম্বদ্ধং শীতমারুত সেবিত। লতা-বল্লীতে জড়ানো বড় বড় গাছ। তৃণভূমিতে চরতে আসা শত শত গোর–গোভিণবিলগ্নাভি স্যন্দীভি রক্তৃত। গোরুগুলি যেখানে ঘাস খাচ্ছে সে জায়গাটা মোটামুটি সমভূমি–সমপ্রচারঞ্চ গবা। মাঝে মাঝে পুকুর, তাতে কোথাও বা বাঁধানো ঘাট। বনপ্রান্তে গভীরতর অরণ্যভূমিতে হিংস্র শাপদের আবাস আছে বটে, তবে তারা লোকালয়ে উৎপাত সৃষ্টি করে না।
ভূমির উর্বরতায় বন যদি লোকালয় গ্রাস করে সে জন্য এখানকার মানুষেরা একটা অদ্ভুত ব্যবস্থা করেছে। পড়ে–যাওয়া বড় বড় গাছ দিয়ে তারা ব্রজভূমির সীমান্ত বানিয়েছে। গোর বাছুরের হাম্বা রব, বৃক্ষনিম্নভাগে অলস বৃদলের শৃঙ্গ-ঘর্ষণ ব্রজভূমিতে অদ্ভুত এক মন্দাক্রান্তা ছন্দের আবিলতা সৃষ্টি করেছে। ব্রজের গ্রাম্যতার যে শোভা আছে, সে শোভা নাগরিক-জনের বোধগম্য নয়। ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো শকটবাহী বলদ, এখানে-সেখানে পোঁতা বাছুরের খুঁটি আর ছড়ানো-ছিটনো দড়ি–এগুলিই ব্রজের শোভা–বৎসানাং রোপিতৈঃ কীলৈ-দামভিশ্চ বিভূষিত। এমনকি যেখানে-সেখানে স্তূপীকৃত করীষ (গোবর, ঘুঁটে) এবং শন-বিছানো কুটীর–এই অপরিচ্ছন্নতা এবং পরিচ্ছন্নতা দুটিই যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত–করীষাকীর্ণবসুধং কটচ্ছন্নকুটী-মঠম।
এখনকার মানুষগুলির চেহারা চাছা-ছোলা লম্বা ঢ্যাঙা নয়। সকলে বেশ নাদুস-নুদুস, ময়রাদের ঘরে যেমনটি হয়–হৃষ্টপুষ্ট জনাবৃত। কুটীরগুলির অন্তরাল থেকে দুগ্ধ মন্থনের গর্গর-ধ্বনি ভেসে আসে। ঘরে ঘরে তৈরি হয় দধি, ক্ষীর, তক্র আর এইসব ঘর থেকেই ধ্বনিত হয় ব্রজভূমির শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত–গোপরমণীদের হাতের কঙ্কনধ্বনি মিশ্রিত হয় গর্গরী চালনার শব্দভ্রমিতে। হরিবংশের কথক-ঠাকুর এরপরেই কতগুলি বালক-কিশোরের দিকে নজর করেছেন, তাঁর কাছে সবচেয়ে লক্ষণীয় হয়েছে এই কিশোর বালকদের জুলফিওয়ালা চুল–কাকপক্ষধরৈ বালৈ গোপাল–ক্রীড়নাকুল।
কোথায় কাকে ভোলাবার জন্য, অথবা কাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্য এই কাকপক্ষধর গোপবালকেরা ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে (গোপাল-ক্রীড়নাকুলম) তার দিকেও হরিবংশঠাকুরের সজাগ দৃষ্টি আছে। এখান-ওখান থেকে উনুনে চাপানো ঘিয়ের কড়াপাক গন্ধটাই যে শুধু ঠাকুরের নাকে এসে লেগেছে তাই নয়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নজর পড়েছে কতগুলি নীল শাড়ি আর হলুদ শাড়ির দিকে। ওদিকে কাকপক্ষধারী তরুণরা খেলা করছে, আর এ দিকে নীল পীতাম্বরা তরুণীরা–নীলপীতাম্বরাভিশ্চ তরুণীভিরলঙ্কৃত।
