কিন্তু পণ্ডিত-গবেষকদের একথা বোঝানো যায়নি, তারা উপনিষদের মধ্যে দেবকীপুত্র কৃষ্ণ নামটি ঘোর আঙ্গিরসের সঙ্গে যুক্ত দেখা মাত্রই তাকে অন্য একটি কৃষ্ণ হিসেবে কল্পনা করেছেন। আরে! কৃষ্ণ না হয় তিন–চারটে পাওয়া গেল কিন্তু দেবকীপুত্র কৃষ্ণ কটা আছে? কিন্তু কষ্ট-কল্পনার লাগাম যখন ছেড়ে দেওয়াই হল, তখন আর-আর পণ্ডিতজনাই বা অল্প কল্পনা করবেন কেন! তারা যশোমতীর ছোট্ট ছেলেটিকে গোপাল কৃষ্ণ বললেন, শত গোপীর সরসতার নায়কটিকে আভীর-কৃষ্ণ বললেন এবং মহাকাব্যের কৃষ্ণকে আরেক কৃষ্ণ বলে গবেষণার তুফান তুলে দিলেন। তারপর একটি মহান পারিভাষিক শব্দের ওপর নির্ভর করে তারা বললেন–একে বলে Syncretism–অর্থাৎ ঘোর আঙ্গিরসের শিষ্য দেবকীপুত্র কৃষ্ণ, গোপাল-কৃষ্ণ, আভীর-কৃষ্ণ এবং মহাভারত-সূত্ৰধার মূলে আলাদা লোক হলেও কালের গতিতে জনমনে তারা একই কৃষ্ণের মায়া তৈরি করেছেন।
আমাদের বিনীত নিবেদন–পণ্ডিতেরা যেখানেই মেলাতে পারেননি, সেখানেই এই Syncretism সমাধান বাতলেছেন। স্বীকার করি–মৌলিকভাবে বিভিন্ন অনেক পৌরাণিক চরিত্রকে মানুষ এক করে দেখেছে, কিন্তু সেই সত্যটি কৃষ্ণের ওপর চাপানো মোটেই ঠিক হবে না। এই জন্য ঠিক হবে না যে, অন্যান্য পৌরাণিক চরিত্রের ক্ষেত্রে সময়ের একটা ব্যবধান আছে, কিন্তু গোপাল-কৃষ্ণ, আভীর-কৃষ্ণ এবং মহাভারতের কৃষ্ণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কল্পনা করা কঠিন। অন্তত পুরাণগুলি থেকে এই ব্যবধান কল্পনা করা খুবই কঠিন।
বরঞ্চ এ ব্যাপারে আমরা চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের অনেক বড় ঐতিহাসিক মনে করি। তারা মহাভারতের মহান-ঐশ্বর্যশালী কৃষ্ণকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন বটে, তাকে তারা আলাদা কোনও ব্যক্তিত্বও ভাবেন না বটে, কিন্তু ওই ঐশ্বর্যশালী কৃষ্ণ তাঁদের মনের মানুষ নন। যাঁকে নিয়ে তাদের ভাব-ভাবনা-ভক্তি, যাঁকে নিয়ে তাদের দর্শন এবং রসশাস্ত্র, এবং যিনি তাদের দেবতা এবং মনের মানুষ, তিনি হলেন গোপাল কৃষ্ণ, আভীর কৃষ্ণ। এমনই তাদের মুগ্ধবোধ যে, এই কৃষ্ণকে তারা দেবকীর পুত্র হিসেবে সংঙ্কিত করতে চান না, কেন না সেখানে ঈশ্বরত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তাদের কৃষ্ণ নন্দলালা-যশোদানন্দন কৃষ্ণ গোপাল গোবিন্দ।
যদি একটু তলিয়ে দেখা যায়, তবে দেখবেন দার্শনিক দিক দিয়েও কৃষ্ণ একটা রিলিফ এনে দিয়েছেন। বৈদিক যুগের স্বাহ-স্বধা-বকারের আড়ম্বর শেষ হতেই উপনিষদের গাম্ভীর্য আরম্ভ হল। ব্রহ্মতত্ত্বের ব্যাপারটা এতই বেশি গভীর এবং এতই সেটা সূক্ষ্ম যে, সাধারণ মানুষের বুদ্ধি সেখানে পৌঁছয় না। অতএব সাধারণ বুদ্ধিকে প্রশান্ত করবার জন্যই পরম-ঈশ্বরের অবতার-কল্প সৃষ্টি হল। কিন্তু মানুষ দেখল–অবতারেরাও সবাই তত সহজ নন–মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ–এঁরা দুষ্টের দমন করেন, শিষ্টের পালন করেন। এমনকি রাম–অবতারেও তাঁর মুখ্য উদ্দেশা রাবণ বধ। অর্থাৎ অবতারবাদের মুখ্য উদ্দেশ্য–দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন–এখানেও একই আছে।
কিন্তু কৃষ্ণের কল্পনাতে এসেই দেখা গেল যে, কংস-বধ বা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব-পক্ষের পরাজয় এমন কোনও বড় ঘটনা নয়। বরঞ্চ কৃষ্ণ-জীবনের বৈচিত্র্যে অবতারের মুখ্য উদ্দেশ্য–দুষ্ট দমন-শিষ্ট পালনের বিধি অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি যে এক সময় যশোমতীর আদরের দুলালটি হয়ে উঠলেন, তিনি যে গোপ রমণীদের প্রেমিকটি হয়ে উঠলেন, অথবা পাণ্ডব অর্জুনের সখা হয়ে উঠলেন অথবা দ্রৌপদীরও পরম সখা হয়ে উঠলেন–এই অতি রমণীয় মনুষ্য–সম্বন্ধগুলিই কিন্তু কৃষ্ণের জীবনে মুখ্য হয়ে দাঁড়াল। অববাদের মধ্যেও আর কোনও Intellectual Construction থাকল না। পরম ঈশ্বর অথবা পরং ব্রহ্ম আর শ্বেতকেতু-যাজ্ঞবল্ক্য-জনকের মতো ঋষিদেরই একমাত্র বোধ্য হয়ে রইলেন না–ভগবান হয়ে উঠলেন সাধারণের মনের মানুষ। সে আর তাকে ভয় পায় না, সে তাকে ভালবাসে–কথাটা মহামতি প্যাসকাল বলেছিলেন এইভাবে–God of Abraham. Isaac and Jacob, not of the philosophers and scholars, God who is found only in the ways taught by the Gospels.
এই Gospel কে যদি বিশ্বাস করতে হয়, তবে কৃষ্ণ-জীবনের বিচিত্র সঙ্গতি খুঁজতে গেলে মহাভারত ছাড়াও আমাদের হরিবংশ, এবং অন্যান্য পুরাণগুলিকে মান্য করতেই হবে। তা না হলে কৃষ্ণের বাল্য, কৈশোর এবং প্রথম যৌবন বাদ দিয়ে একেবারেই মহাভারতে প্রবেশ করতে হবে। আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে এমন কল্পনা সম্ভব নয় বলেই আমরা কৃষ্ণের শৈশবে ফিরে যাচ্ছি।
প্রথম কথাটা আগে মিথলজিস্টদের মতো বুদ্ধিদীপ্ত কায়দায় বলে নিই। মিথলজিস্টরা বলেন–সৌরকুলের দেবতা যাঁরা (Solar gods), তাঁদের জন্মটা সব সময়েই প্রায় অলৌকিক। সাধারণ মানুষের মতো তারা যোনি–সম্ভব নন। যিশুখ্রিস্ট, বুদ্ধ, রামচন্দ্র অথবা অ্যাপোলর মতো কৃষ্ণও দেবকীর কোলে এসেছেন অলৌকিকতার আবেশ ছড়িয়ে। হরিবংশ, বিষ্ণু অথবা ভাগবত পুরাণে এমনটিই আছে। আবার দেখুন জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সৌরদেবতাদের জীবন-সংশয় উপস্থিত হয় দেশের রাজার হাতে, যেমনটি হয়েছিল হেরডের হাতে যিশু খ্রিস্টের, ফারাও–এর হাতে মোজেসের এবং অবশ্যই কংসের হাতে কৃষ্ণের।
