একজন ফরাসি পণ্ডিত নানা গবেষণা করে জানিয়েছেন যে, দশ অবতারে প্রথম তিনটিতেই ভূভারহরণের মতো মোটা দাগের একটা উদ্দেশ্য আছে বটে, কিন্তু পরম ঈশ্বর যখন থেকে এই মনুষ্যজগতের নানান সুখ-দুঃখে অংশীদার হতে আরম্ভ করলেন, তার প্রথম কল্পারম্ভ নৃসিংহ অবতার থেকে।
.
৮৬.
অবতারবাদের দিক দিয়ে দেখতে গেলে নৃসিংহ-বামন ইত্যাদি অবতারে ঈশ্বরের জগদ্ধার প্রবৃত্তির সঙ্গে করুণা মিশে থাকায় ভক্ত-জনের ভক্তির পথও প্রশস্ত হয়েছে কিন্তু ঈশ্বর যখন সম্পূর্ণ সলীল হয়ে জীবন এবং জগতের স্নেহ-মায়া-মমতায় অংশ নিলেন, তখন ভক্তের ভক্তি রসে পরিণত হল। ঈশ্বর এবং ভক্তের সরসতার প্রথম মাধ্যম যিনি, তিনি হলেন রামচন্দ্র। পারিন্দার সাহেব রাম সম্বন্ধে গবেষণা করতে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন–In the story of Rama, the youth, marriage, renunciation, sufferings and triuamph all make up a human picture, the details of which are cherished by millions.
পারিন্দার সাহেবের রাম-লীলায় খুব মুগ্ধতা আছে বুঝি, কিন্তু কৃষ্ণ-জীবনের অসামান্য বৈচিত্র্য এবং জটিলতা সম্বন্ধে তার ধারণা এত দৃঢ় হয়নি বলেই তিনি হঠকারিতা করে লিখে ফেলেছেন যে, মহাভারতের মধ্যে কৃষ্ণের বহুধা বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম লক্ষ্য করা গেলেও তার ভূমিকা নাকি hardly dominating কেমন করে, কী ভেবে এবং কী পড়ে যে, গবেষকরা এমন কথা লেখেন বুঝি না। মহাভারত যিনি ভাল করে পড়েছেন, তিনিই খুব ভাল করে জানেন যে, মহাভারতের সমস্ত বিপন্ন সময়ে তিনি উপস্থিত আছেন; কখনও সামনে কখনও আড়ালে। কৃষ্ণের অসামান্য বুদ্ধি বলেই শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় সম্পন্ন হয়। উপরন্তু যুদ্ধজয়ের পথে পাণ্ডবদের যে অন্যায় এবং দোষ কল্পনা করা হয়েছে তারও দায় বর্তেছে কৃষ্ণেরই ওপর।
এর পরেও কী করে এই মানুষটিকে লঘু করি, হয়তো বা এই অসামান্য মহাভারতীয় চক্রের কারণেই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ অবতারে পরিণত। জগতের পাপ-মুক্তিই শুধু নয়, দুষ্টের দমন মাত্রই শুধু নয় মানুষের জীবন-বৈচিত্র্যে তিনি ভীষণ ভীষণভাবে জড়িত হয়ে গেছেন। মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হিসেবে যেমন তিনি মহাভারতে উপস্থিত, তেমনই সজীবভাবে উপস্থিত তিনি পুরাণগুলিতে। মহাভারতে তার পরিণত যৌবনের সফলতা আর পুরাণগুলিতে তার কৈশোরগন্ধি যৌবনের উচ্ছ্বাস। আমরা তার পরিণতিতে বিশ্বাস করব, আর তার কৃষ্ণ হয়ে ওঠার ক্রমিকতায় বিশ্বাস করব না, এমন তো হতে পারে না।
আমাদের দেশীয় রাজা ভোজবর্মা একটি তাম্রশাসনের মধ্যে কৃষ্ণকে সম্পূর্ণরূপে ধরে রাখার জন্য যে বিশেষণ দুটি প্রয়োগ করেছেন, সত্যি কথা বলতে কি, তার চাইতে ভাল বিশেষণে কৃষ্ণের সম্পূর্ণতা প্রকাশ করা যায় না। ভোজবর্মা বলেছেন–সোপীহ গোপী–শতকেলিকারঃ কৃষ্ণো মহাভারত-সূত্ৰধারঃ। অর্থাৎ সেই কৃষ্ণ, যিনি শত-গোপীর কেলি-কলা-রসজ্ঞ এবং যিনি মহাভারতের সমস্ত ঘটনার সূত্রধার।
শত গোপীর সাহচর্য যিনি উপভোগ করেছেন, তিনি মহাভারতের অন্তরাল–নায়ক হতে পারেন না–এ কথা যেমন ভোজবৰ্মা বিশ্বাস করেন না, তেমনি এ কথা আমরাও বিশ্বাস করি না। আমাদের ধারণা–দুটি, তিনটি বা চার রকমের কৃষ্ণ আছেন–এ রকম একটা সন্দেহ প্রধানত দানা বেঁধেছে ছান্দোগ্য উপনিষদের একটি পঙক্তি থেকে। ছান্দোগ্য বলেছে–ঘোর নামক অঙ্গিরার পুত্র দেবকীর পুত্র কৃষ্ণকে এই যজ্ঞ-দর্শন উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই দেবকীপুত্র উক্ত উপদেশ শুনে (অন্য বিদ্যা বিষয়ে] নিস্পৃহ হয়েছিলেন–তদ্ধৈতদূঘোর আঙ্গিরসঃ কৃষ্ণায় দেবকীপুত্রায় উক্ত্বা চ অপিপাস এব স বভূব।
মনে রাখা দরকার, কৃষ্ণ দেবকীপুত্রের সম্বন্ধে এই ছান্দোগ্যের উক্তিই হল প্রাচীনতম উল্লেখ এবং উল্লেখই সমস্ত পণ্ডিতদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। কী সন্দেহ? প্রথম সন্দেহ–কৃষ্ণকে এখানে ঘোর আঙ্গিরসের শিষ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরাণগুলিতে যেহেতু কৃষ্ণকে সান্দীপনি মুনির শিষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং যাদবদের কুলগুরুর নাম যেহেতু গর্গ, তাহলে তো ঘোর আঙ্গিরসের শিষ্য এই দেবকীপুত্র কৃষ্ণ নিশ্চয়ই অন্য ব্যক্তি হবেন।
শ্রদ্ধেয় বিমান বিহারী মজুমদার এই সংশয়ের নিরসন করেছেন। তিনি বলেছেন পণ্ডিতদের এই মত অজ্ঞতাপ্রসূত। মহামতি শঙ্করাচার্যের ছান্দোগ্য–টীকা থেকেই পণ্ডিতদের ধারণা হয়েছে যে, কৃষ্ণ ঘোর আঙ্গিরসের শিষ্য। মূল উপনিষদে কোথাও কৃষ্ণকে ঘোর আঙ্গিরসের শিয্য বলা হয়নি। ঘোর আঙ্গিরস তাকে বিদ্যা উপদেশ করেছেন মাত্র। উপনিষদে বহু জায়গায় কোনও সুযোগ্য অধিকারী শিষ্য না হওয়া সত্ত্বেও ব্রহ্মর্ষি ব্যক্তির কাছ থেকে উপদেশ লাভ করছেন–এমন অনেক দেখা গেছে। আমাদের ধারণা শঙ্করাচার্যও এখানে শিষ্য কথাটা অত আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেননি। যাঁকে উপদেশ করা যায় তিনি তো শিষ্য বটেই। তাছাড়া কৃষ্ণের মত মহাবুদ্ধি ব্যক্তি তার বৈচিত্র্যময় জীবনে নানা জনের কাছ থেকে উপদেশ লাভ করেছেন। ঘোর আঙ্গিরস তাদেরই একজন। পুরাণগুলির মধ্যে যদি এই একান্ত উপদেশের কথা উল্লিখিত নাই হয়ে থাকে, তাহলেই এত পরিষ্কার দ্ব্যর্থহীন দেবকীপুত্র কৃষ্ণের নামটি কি অন্যভাবে ব্যাখ্যাত হওয়া উচিত?
