যাই হোক, এসব ইল সাম্প্রদায়িক কচকচি। কিন্তু কচকচির মধ্যে এমন একটা আধুনিকতা আছে যে, সেই আধুনিকতার কারণেই আমরা এই সাম্প্রদায়িক কথাগুলি উল্লেখ করলাম। আধুনিকতাটার কথা বলি এবার এবং জনান্তিকেই বলি। আমাদের দেশের এবং ওদেশের অনেক বাঘা-বাঘা পণ্ডিতেরা মনে করেন কি, যে, কৃষ্ণ মোটেই একটা নয়। বৃন্দাবনের কৃষ্ণ এক মানুষ আর মথুরা-দ্বারকাবাসী কৃষ্ণ আরেক মানুষ। মহাভারতের মধ্যে কৃষ্ণকে যেমন এক প্রখর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমরা পেয়েছি–যার বুদ্ধি ক্ষুরধার, যথেষ্ট কুটিল এবং যথেষ্টই শক্তিমান–সেই কৃষ্ণের সঙ্গে বৃন্দাবনের ননী-খাওয়া অথবা কিশোরীদের প্রেমে লুটোপুটি খাওয়া কৃষ্ণকে পণ্ডিতরা কিছুতেই মেলাতে পারেন না। বিশেষ করে দুই কৃষ্ণের ব্যক্তিত্বের মধ্যেই তারা সামঞ্জস্য খুঁজে পান না।
আমার মতে, নিতান্ত ব্যক্তিগতভাবেই আমার মতে–এগুলি পণ্ডিত মহোদয়দের বুদ্ধি-ব্যায়াম ছাড়া আর কিছু নয়। গবেষণা বস্তুটা সত্যই বড় মহান জিনিস, তবে গবেষণা করতে গিয়ে পূর্বাহ্নেই যদি কোনও সিদ্ধান্ত মনের মধ্যে আসন পেতে নেয়, তবে অতি বড় মহান গবেষকেরও বুদ্ধিভ্রংশ হয়। মহাভারতে কৃষ্ণাকে যখন থেকে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, তখন তিনি সম্পূর্ণ যুবক। মহাভারতে পাঞ্চালী দ্রৌপদীর বিবাহ-সভায় প্রথম তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে এবং তখন তার নিজের বিয়ে-থা হয়ে গেছে অথবা শিগগিরই হবে, এই রকম একটা অবস্থা। মহাভারতে যে মানুষটাকে একটি পক যুবক এবং পরিণত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রবেশ করতে দেখছি, সেই মানুষটার কোনও বিচিত্র-ক্রীড়ামোদিত বাল্যকাল থাকবে না, পণ্ডিতজনেরা এটা ভাবলেন কী করে?
আসলে গবেষক-পণ্ডিতেরা বড় কঠিন-হৃদয় ব্যক্তি। অনেক সহজ জিনিসও তারা কুটিল ব্যবহারজীবীর মতো কঠিন করে নিতে পারেন। কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। মহাভারতে যেখানে ভীম-অর্জুন সবার বাল্যকাল এবং শিক্ষাকাল বর্ণিত আছে, সেখানে কৃষ্ণের বাল্যকাল সম্বন্ধে কোনও কথা নেই বলে কি মানুষটা সোজাসুজি যৌবনে পদার্পণ করলেন? ওঁরা বলবেন–নিশ্চয়ই বাল্যকাল ছিল, তবে সেই বাল্যকালের চরিত্র মহাভারতীয় কৃষ্ণ-চরিত্রের সঙ্গে মেলে না।
এও এক জ্বালা। একজনের ছেলেবেলা এবং প্রথম যৌবন-সন্ধির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিণত যৌবনের দৃঢ়তার কি মিল থাকে সব সময়? অর্থাৎ আমিই যদি যৌবনের অনুকূল লগ্নে বহুতর রমণীর মন পেয়ে থাকি তবে সেই মানুষটি কি যৌবনের মধ্যলগ্নেও একেবারে একই রকম থাকবেন? তা ছাড়া বয়ঃসন্ধি এবং বয়ঃসন্ধির পরিণতির মধ্যে এতটাই পার্থক্য থাকে কখনও, যে সেই মানুষটাকে একেবারে বিপরীত বলেও মনে হতে পারে। অল্পবয়সে যিনি ভীষণ ভীষণ রোম্যান্টিক ছিলেন, তিনিই ভবিষ্যতে প্রখর বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন–এরকম উদাহরণ আমিই অনেক দেখেছি। কাজেই কৃষ্ণকে সাধারণ বুদ্ধিতেই এমন একটি উদাহরণ ভাবা যেতে পারে।
আরও একটি যুক্তিও তো আছে। এই ধরুন, আপনি আগে গ্রামে ছিলেন, গ্রামেই মানুষ হয়েছেন এবং স্বাভাবিক কারণে একটু গ্রাম্যও ছিলেন। কিন্তু যৌবনের আরম্ভে আপনি শহরে পড়তে এলেন, পড়া শেষ করলেন, চাকরি আরম্ভ করলেন। এখন আপনি দারুণ স্মার্ট যথেষ্ট উপস্থিতবুদ্ধিসম্পন্ন, ঝকঝকে এক শহুরে ব্যক্তিত্ব। কাজেই বৃন্দাবনের গ্রাম থেকে যে মানুষ মথুরায় এলেন এবং মথুরার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন, সেই মানুষ এক, আর বৃন্দাবনের কৃষ্ণ আরেক–এরকম যুক্তি অন্তত সাধারণ বুদ্ধিতে আসে না। কিন্তু গবেষককে তো গবেষণা অথবা গো-এষণা করতেই হবে। অতএব তিনি বহু সাধনা করা বহু যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন–কৃষ্ণ মোটেই একজন নন, কৃষ্ণ অনেক। এই গবেষকদের ফাঁদে আমাদের বঙ্কিমবাবুও পড়েছেন–সেই যা দুঃখ।
কৃষ্ণের কথা বলতে গেলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা এখানে এসে পড়বে। সেটা হল অবতার-তত্ত্ব। কৃষ্ণকে আমরা যেমন মানুষ ভাবি, আবার তেমনই অবতারও ভাবি। আমাদের ভারতবর্ষে অন্তত দশজন অবতার-পুরুষ আছেন–মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, বামন ইত্যাদি, কিন্তু তার মধ্যে আমাদের কৃষ্ণ ঠাকুরের নামই নেই। গীতগোবিন্দে দশাবতারের লিস্টি আছে, সেখানেও কৃষ্ণের নাম নেই। কিন্তু জয়দেব কবি বাংলার মানুষ। তিনি ভারি মিষ্টি করে বলেছেন–কৃষ্ণ মোটেই এত সাধারণ নন যে, দশজনের ভিড়ে তাকে জায়গা করে নিতে হবে। তিনি সাধারণ অবতার মাত্র নন, তিনি অবতারী-কেশবধৃত-দশবিধরূপ, জয় জগদীশ হরে। চৈতন্যপন্থী দার্শনিকেরাও তাই বলেন। তারা বলেন–সমস্ত অবতারের মূল নিদান হলেন কৃষ্ণ! রূপ গোস্বামীর ভাষায়-অবতার-লীলা-বীজ।
লক্ষণীয় বিষয় হল–অন্যান্য অবতারের ক্ষেত্রে প্রধান উদ্দেশ্য থাকে–ভূভারহরণ, জগদুদ্ধার। পরবর্তী পণ্ডিতেরা অবতারের গতি-প্রকৃতি চিন্তা করে বলেছেনএই ভূভারহরণ টরনের মতো ব্যাপার ওই প্রথম কয়েকটি অবতারের ক্ষেত্রেই খাটে। অর্থাৎ মৎস্য-কুর্ম-বরাহ ইত্যাদির ক্ষেত্রে। পণ্ডিতেরা অবশ্য এই তিন অবতারের মাধ্যমে জগৎ–সৃষ্টির একটা পরম্পরাও বার করে ফেলেছেন। প্রথমে মাছ, তারপর উভচর কূর্ম এবং তারপর প্রাণী-বরাহ। নৃসিংহ অবতারের মধ্যে প্রাণী এবং মনুষ্যের এক অদ্ভুত সমাহার ঘটিয়ে সৃষ্টির পরম্পরায় এক নতুন সংযোজন ঘটিয়েছেন। কারণ মনুষ্যরূপী অবতারগুলির শেষ পদক্ষেপ হল নৃসিংহ অবতার। তারপরেই সেই বেঁটেখাটো মানুষটি, যার মধ্যে চরম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটল। তিনি বলিকে ছলনা করে সাধুজনের প্রতি করুণা প্রকাশ করলেন।
