ভাগবত পুরাণে দেবতারা দেবকীর গর্ভস্তুতি করেছেন এবং কৃষ্ণের জন্মকালে তার চতুর্ভুজ নারায়ণ-মূর্তিকে বসুদেব এবং দেবকী দুজনেই স্তব করেছেন। ভাসের বালচরিত নাটকেও বসুদেব কৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব সম্বন্ধে ভীষণ সচেতন। জন্মমাত্রেই দেবকীর কোলে শিশুটিকে দেখে তিনি স্বগতোক্তি করেছিলেন–আমার ছেলে বলে এই শিশুর একটি উপাধি জুটেছে বটে, তবে এই শিশুটি হল আসলে কংসরাজার যম–সুত ইতি কৃতসংজ্ঞং কংসমৃত্যুং বহষ্ঠী। এর পরে বসুদেব যখন শিশু-কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে বৃন্দাবনে এলেন, তখন নানাবিধ অলৌকিক চমৎকার দেখে তিনি নন্দগোপকেও অনুরোধ করেছেন–আরে এই বাচ্চাটাকে নমস্কার করো–বাল এব নমস্যতাম্।
নিজ পুত্রের ভগবা অথবা ঈশ্বরের ঈশ্বরত্বের এই জাগ্রত বোধ নিয়ে মাথুর বসুদেব যেখানে সদাই আপ্লুত হয়ে আছেন, সেখানে তাঁর বিপরীত কোটিতে দাঁড়িয়ে আছেন বৃন্দাবনের নন্দগোপ। এমনকি মহামতি চৈতন্য যখন জন্মের সম্ভাবনাতেও দাঁড়িয়ে নেই, সেই তখনই আমরা নদপোপর হৃদয়ে মাধুর্যের সত্তা দেখতে পাচ্ছি। নন্দগোপ শিশু-কৃষ্ণের ভগবত্ত বা ঐশ্বর্যে বিশ্বাস করেন না। তিনি গ্রাম সরল মানুষ, কৃষ্ণের ভগবত্তা সম্বন্ধে তাঁকে হাজার বোঝালেও তিনি বোঝেন না, এক ঐশ্বরিক বিভূতি দেখালেও তিনি হেঁ–হেঁ–আক্তে–তা–বটে–তা–বটে বলে এড়িয়ে যান!
এই তো বালচরিত নাটকে বসুদেব তাঁর পূত্রকে যেই নন্দের কোলে দিলেন, তখন শিশুটিকে তার বেশ ভারী লাগল এবং তার পরেই দেখা গেল–ভগবান বিষ্ণুর দিব্য অস্ত্র-সম্ভার–শঙ্খ, চক্র, কৌমোদকী গদা, শার্গ-ধন এবং তাঁর দিব্য বাহন গরুড়–সকলে এসে শিশু-কৃষ্ণের স্তব করছে। এসব দেখেই মাথুর বসুদেব নন্দগোপকে বালকের উদ্দেশে নমস্কার জানাতে বললেন। কিন্তু নন্দগোপ মোটেই ভগবত্তার ধারে-কাছে গেলেন না। তিনি হেঁ-হেঁ করে বললেন–তা তো বটেই, তা তো বটেই, তোমার ঘরের রাজপুত্র বলে কথা, নমস্কার তো করতেই হবে। তা নমস্কার তোমায় রাজপুত্তুর। আমাদের ঘরে বাপু তোমার নিজেকে নিজেই চালিয়ে নিতে হবে। আমরা মুখ-সুখ গোয়ালা মানুষ, তোমাকে মানুষ করার ক্ষমতা কি আমাদের আছে–হী, ভবতু! আত্মনৈবাত্মানং নির্বাহয়। অস্মাকং গোপজনস্য ত্বং গ্রহীতুং কো বল-পরাক্রমঃ।
অর্থাৎ মথুরাবাসী রাজবাড়ির ছেলে বসুদেবের পুত্রকে তিনি বড়জোর রাজপুত্র বলে যৎসামান্য সম্মান জানাতে পারেন। এবং তাও হয়ত বসুদেবের সামনে। এমনিতে তিনি তাও ভাবেন না। ভগবান-টগবান তো নয়ই, বরঞ্চ বসুদেবের আড়ালে কীভাবে তিনি এই ছেলেকে খাইয়ে দাইয়ে মানুষ করবেন, তারও একটা চিত্র তিনি দিয়েছেন এবং আমরা তা পূর্বে উল্লেখ করেছি।
বস্তুত বৃন্দাবন হল সেই জায়গা যেখানে কৃষ্ণের ঐশ্বরিক ক্ষমতার কোনও মূল্য নেই। ঈশ্বরের ক্ষমতা কী? না, তিনি ইচ্ছামাত্রেই কার্য সম্পাদন করতে পারেন, যেটা করার কথা বা আপনিই হওয়ার কথা, সেটা তিনি না করতেও পারেন এবং যেটা যেভাবে হওয়ার কথা সেটা তিনি অন্যরকমও করতে পারেন–ক অকর্তুম্ অন্যথা কর্তৃঞ্চ সমর্থঃ। কিন্তু এই বৃন্দাবন এমন জায়গা, যেখানে তার স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। এখানে মা খেতে না দিলে খাওয়া নেই, অথবা চুরি করে খাও। এখানে তার একটু বয়স হলেই রূপ গোস্বামী তার নাটুকে ভাষায় মা যশোমতীকে দিয়ে বলবেন–আচ্ছা কানাই? তোর কি বুদ্ধিশুদ্ধি জীবনে হবে না। দেখছিস তোর বাবা বুড়ো হচ্ছেন, বাড়িতে এতগুলো গোরু। এগুলিকে চরানো, দুধ দোয়া–কত কাজ? সবই কি এখনও তোর বাবা করবেন, আর তুই খেলে খেলে বেড়াবি?
অতএব কৃষ্ণকে গোষ্ঠে যেতে হয়, গোরু দুইতে হয়–এসব তার কাজ। কিন্তু এই কাজ তিনি ভালবেসে করার জন্যই পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। যশোমতীকে মা বলে ডাকবার জন্য, নন্দবাবাকে বাবা বলে ডাকবার জন্য সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের এই স্বেচ্ছাকৃত লঘুতা। বৈষ্ণবরা তাই বলেন। তারা বলেন–পরম শক্তিমত্তা কখনও কাউকে সুখ দেয় না। শক্তিমানকে লোকে ভয় পায়। অতএব ভয় নয়, মা-বাবার স্নেহ, বন্ধুদের সৌহার্দ এবং কিশোরীর প্রেম এত সব মধুর সম্বন্ধ কেমন লাগে–সেটা নিজে পরখ করার জন্যই তার কৃষ্ণ-লীলা–বিহার এবং এই লীলা আস্বাদনের সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হল বৃন্দাবন।
চৈতন্যপন্থী দার্শনিক জীব গোস্বামী তাই বিশ্বাসই করেন না যে, কৃষ্ণ বসুদেব-দেবকীর ছেলে। কারণ বসুদেব-দেবকীর প্রসঙ্গ মানেই ঈশ্বরত্বের বোধ আর কৃষ্ণের বৃন্দাবন-লীলায় এই ঐশ্বর্যের স্থান নেই। জীব গোস্বামী তার গোপালচ গ্রন্থে জানিয়েছেন যে, কৃষ্ণ আসলে নন্দ যশোমতীর ছেলে। হরিবংশে যে জায়গার কথা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি–অর্থাৎ যেখানে ভগবান বিষ্ণু এবং তন্নিষ্ঠা যোগমায়া একই সঙ্গে দেবকী এবং যশোদার গর্ভে জন্ম নিলেন বলে বলা হয়েছে, সেখানে টীকাকার নীলকণ্ঠ টিপ্পনী দিয়েছেন–অর্ধরাত্রে অভিজিৎ নক্ষত্র যখন বিমূর্ত হয়েছে তখন নবমী তিথিতে ভগবতী যোগমায়া জন্মালেন এবং অষ্টমী তিথিতে জন্মালেন দ্বিভুজ কৃষ্ণ। দেবকী-বসুদেবের ঘরে সেই মুহূর্তেই শখ-চক্র-গদা-পদ্মধারী চতুর্ভুজ নারায়ণ আবির্ভূত হয়েছেন এবং তিনি তাদের জানিয়েছেন–আমি তোমার ঘরে জন্ম নেব। ভাগবত পুরাণেও তাই আছে।
আমরা জানি–দেবকী-বসুদেব ভগবান বিষ্ণুর স্তুতি করে তাঁকে তাঁর অলৌকিক রূপ সম্বরণ করতে বলেছেন। চৈতন্যপন্থী জীব গোস্বামীর ধারণা–এই অলৌকিক রূপ সম্বৃত হবার মুহূর্তেই অঘটনঘটনপটীয়সী যোগমায়া যশোদার ঘরে জন্ম-নেওয়া দ্বিভুজ কৃষ্ণকে প্রতিস্থাপন করেন দেবকীর কোলে। তারপর যেমন যা ঘটবার তাই ঘটেছে–অর্থাৎ বসুদেব কংসের কারাগার থেকে ছেলে নিয়ে বৃন্দাবনে এসেছেন এবং যশোদার মেয়েটিকে নিয়ে গেছেন নিজের ঘরে। আরও লক্ষণীয় হল কৃষ্ণ শব্দটি। ভেবে দেখুন–দেবকীর সপ্তম গর্ভ আকর্ষণ করে রোহিণীর গর্ভে প্রতিস্থাপন করার জন্য কৃষ্ণ-জ্যেষ্ঠ বলরামের এক নাম সঙ্কর্ষণ। কিন্তু যে কৃ ধাতু (কর্ষণ, বা আকর্ষণ করা) থেকে সন্ধর্ষণ (সম্–কৃ+অনট) শব্দের উৎপত্তি, কৃষ্ণ শব্দের মধ্যেও কিন্তু সেই কৃ ধাতুই আছে। কাজেই যোগমায়া যেমন সঙ্কর্ষর্ণকে রোহিণীর গর্ভে আকর্ষণ করেছেন। তেমনই তিনি যশোদাকে মূৰ্ছিত রেখে তাঁরই পুত্রটিকে আকর্ষণ করে দেবকীর কোলে দিয়েছেন। অতএব মূলে তিনি নন্দ-যশোদার ছেলে–দ্বিভুজ মনুষ্যরূপ।
