শেষ বা অনন্ত নাগের মতোই আরেক পুণ্যবান ধার্মিক হলেন নাগরাজ বাকি। সমুদ্র মন্থনের সময় দেবাসুর দুই পক্ষের মর্যাদা লাভ করে তিনি মন্থন-রজুর ভূমিকা গ্রহণ করে অমৃত-লাভে সহায়তা করেছিলেন। প্রধানত তারই করুণায় এবং পরামর্শে সমস্ত নাগগোষ্ঠী জনমেজয়ের ক্রোধ থেকে মুক্তি পায়। বাসুকির বোন হলেন জরৎকারু। তপস্বী মুনি জরৎকারুর সঙ্গে নাগিনী জরৎকারুর মিলনে মহামুনি আস্তীকের জন্ম হয় এবং এই আস্তীকের হস্তক্ষেপেই জনমেজয়ের সর্পসত্র বা wholesale massacre বন্ধ হয়ে যায়।
আগে যেমন ব্রাহ্মণী পুলোমা এবং রাক্ষস পুলোমার কথা বলেছি, তেমনই ব্রাহ্মণ ঋষি জরৎকারুর সঙ্গে নাগ-বংশীয় জরৎকারুর মিলন হল। এঁদের নাম-সাম্যেই বোঝা যায় যে, একদিকে আর্য এবং নাগ গোষ্ঠীর শ্রেণীগত মিলন এবং সংমিশ্রণ যেমন ঘটেছিল, তেমনই এঁদের পারস্পরিক কৃষ্টির সংমিশ্রণও ঘটেছিল। বাসুকি নাগ যে ব্রাহ্মণ জরৎকারুর সঙ্গে তার ভগিনী জরৎকারুর বিয়ে দিলেন তার পেছনে তার গোষ্ঠীস্বার্থের ব্যাপার ছিল পুরোপুরি। মহাভারতে এই স্বার্থের কথাটা বলা আছে ভবিষ্যদবাণীর মতো করে। বাসুকি-ভগিনী জরৎকারু যখন গর্ভবতী হয়ে বাসুকির কাছে ফিরে এলেন, তখন বাসুকি বলেছিলেন, তোমার গর্ভে যে পুত্র হবে, সেই নাগকুলের মঙ্গল বয়ে আনবে, জনমেজয়ের সর্পসত্র থেকে সেই আমাদের আমাদের বাঁচাবে —
পন্নগানাং হিতাথায় পুত্রস্তে স্যাৎ ততো যদি।
স সপসত্ৰাৎ কিল নো মোক্ষয়িষ্যতি বীর্যবান।।
বাসুকি-ভগিনী দাদাকে স্বামীর আশ্বাস শুনিয়ে বলেছেন–নাগদের উদ্দেশ্যসিদ্ধি নিয়ে তুমি চিন্তা কোর না। সে আমার গর্ভে এসে গেছে।
বলা বাহুল্য–এটা ভবিষ্যদ্বাণী নয়। নাগদের মঙ্গল ঘটেছিল নাগিনীর মুনিপুত্র আস্তীকের মাধ্যমে। নাগিনীর গর্ভজাত হলেও ব্রাহ্মণের জাতি পেতে তার অসুবিধা হয়নি, কারণ মহর্ষি জরৎকারু তাকে স্বেচ্ছায় বিবাহ করেছিলেন। আস্তীকও নাগভবনে থেকেই তার ব্রাহ্মণ্যের তপশ্চর্যা চালিয়ে গেছেন- গৃহে পন্নগরাজস্য প্রযত্না পরিরক্ষিতঃ। জনমেজয় যখন তক্ষকের কারণে সর্পকুলের ওপর তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রতিজ্ঞা নিলেন, তখন মাতুল বাকির পরামর্শে এগিয়ে এলেন সেই আস্তীক, যাঁর পিতার ঔরস সংস্কার ব্রাহ্মণ্য আর মাতার শোণিত–সংস্কার নাগজাতীয়। ব্রাহ্মণ্য এবং আর্য-সংস্কৃতির সঙ্গে এই নাগিনীপুত্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলেই দেশের রাজার ওপরে তিনি সেই ব্যক্তিত্ব আরোপ করতে পেরেছিলেন, যাতে জনমেজয় সর্পযজ্ঞ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
অন্যদিকে তক্ষককে দেখুন। জনমেজয় তাকে তক্ষশিলায় পাননি। পাবেন কী করে? পরীক্ষিতকে হত্যা করার পর জনমেজয়ের হাত থেকে বাঁচবার জন্য তাকে পালাতেই হয়নি শুধু, তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এমন এক দেবতার কাছে যিনি আর্য-সংস্কৃতি এবং ধর্মের প্রধান প্রতিভূ। তিনি ইন্দ্র। দেবরাজ ইন্দ্র অন্তরীক্ষে অথবা স্বর্গে, যেখানেই তিনি থাকুন, তক্ষককে আশ্রয় দিতে তার বাধেনি। এতটাই তাঁকে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তার মুখ। দিয়ে বরদানের মতো এই শব্দগুলি বেরিয়েছিল –তুমি আমার ঘরে চুপটি করে বসে থাক তে দেখি। আমি দেখব–কোন সর্পত্রের আগুন তোমায় কী করে বসেহ ত্বং মসকাশে সুগুপ্তো/ ন পাবকত্ত্বাং প্রদহিষ্যতীতি।
মুনি-ঋষি, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রা আর্য সংস্কৃতির দ্বিতীয় স্তর। কেন না প্রথম স্তরে আছেন দেবতারা। আর ইনিও যে সে দেবতা নন। ঋকবেদে সর্বাপেক্ষা অধিক স্তব-স্ততি যাঁর উদ্দেশ্যে, নিবেদিত, সেই ইন্দ্র হলেন তক্ষকের বন্ধু-প্রতিম। তার মানে তক্ষক ছোড় টা ছেড়ে বড়-ডারে ধরেছেন। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উপাস্য বর্গের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব আছে। তিনি ইন্দ্রের আশ্রয়ে নিশ্চিন্ত আছেন। কিন্তু মজা হল, উপাস্য যিনি, তার সমস্ত শক্তিমত্তা এবং জনপ্রিয়তাই উপাসক-নির্ভর। তক্ষক যখন কিছুতেই আসছেন না, তখন মুনিরা মন্ত্রের জোরে ইন্দ্রের সিংহাসন ধরেই টান দিলেন। যাতে কান টানলে মাথা আসে, ইন্দ্রের সঙ্গে তক্ষকও আসেন। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের মনস্তত্ত্ব এই–যাঁকে এতকাল ধরে এত মন্ত্র পড়ে, এত ঘি পুড়িয়ে তুষ্ট করলাম, তিনি কিনা আমাদের রাজহস্তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। আশ্রয় দিতে চাও দাও, কিন্তু মনে রেখ– তুমি আমাদের উপাস্য হলেও আমাদের স্বার্থবিরোধী জনকে আশ্রয় দিয়েছ বলে, তোমাকেও আমরা ছাড়ব না, তোমাকেও একসঙ্গে আগুনে পোড়াব- তমিন্দ্রেণৈব সহিতং পাতয়ধ্বং বিভাবসৗ।
ইষ্ট অনুগত ভক্তের আস্থা হারালে দেবতা যে আর উপাস্য থাকবেন না, তা দেবতারাও জানেন। মহাভারত বলেছে- ঋষিদের যজ্ঞের ক্ষমতা দেখে ইন্দ্রও ভয় পেয়ে তক্ষককেও ছেড়ে পালালেন- হিত্বা তু তক্ষকং ত্রস্তঃ স্বমেব ভবনং যযৌ। এ হল এখনকার দিনের রাজমন্ত্রীর ব্যবহার। কুখ্যাত মাস্তানকে রাজনৈতিক বুদ্ধিতে আশ্রয় দিয়েছেন হয়তো, কিন্তু যখন দেখা গেল জনগণ বেঁকে বসল, পাটি ভাল চোখে দেখছে না, তখনই আর নেতা তাকে চিনতে পারেন না– জনগণ চায় না, অতএব আমি তোমায় চিনি কী করে? ইন্দ্র তক্ষককে ত্যাগ করে নিজের ঘরে ঢুকলেন। তক্ষক মারা পড়েন আর কী!
ঠিক এই অবস্থায় এসেছে আস্তীক-মুনির মধ্যস্থতা। পিতৃকুলের লোকের সঙ্গে মাকুলের গোলমাল। তিনি জনমেজয়ের সভায় দাঁড়িয়ে দিব্য ভাষায় জনমেজয়ের যজ্ঞ-প্রশংসা করে জনমেজয়ের মন ভিজিয়ে দিলেন এবং নিজের ব্যক্তিত্বে সামরিক-শক্তিহীন নাগকুলের সুরক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তক্ষক তো বাঁচলেনই জনমেজয়ের রাজরোষ থেকে বাঁচল সমস্ত সর্পকুল। নিশ্চিন্ত হলেন বাসুকি, যিনি পূর্বাহ্নেই আর্য-সংস্কৃতির অঙ্গীভূত তথা নিজগোষ্ঠীর হঠকারিতায় সাময়িকভাবে বিব্রত, চিন্তিত।
