দেবকীর হৃদয় তখন পুত্রশোকে স্তব্ধ হয়ে ছিল। সেই অবস্থায় একটি বয়স্ক ভাই যখন তার পায়ে হাত দিয়ে নিজেকে পুত্র বলে প্রতিস্থাপন করল, তখন তার জননী-হৃদয় ডুকরে কেঁদে উঠল। একদিকে তিনি কংসের মাথায় হাত রাখলেন, অন্যদিকে তার পুত্র-শোকাতুর স্বামীর দিকে তাকিয়ে অশ্রুধারা মোচন করতে লাগলেন। কংসকে তিনি আস্তে আস্তে ওঠালেন মায়ের মতো করেই–উত্তিষ্ঠোত্তিষ্ঠ বৎসেতি কংসং মাতেব জল্পতী।
দেবকী কংসের তত্ত্ব মহাকালের কথা মেনে নিলেন, কারণ সেই তত্ত্ববোধ তাঁর আছে। বললেন–তুমি আমার ছেলেগুলিকে মেরে ফেলেছ, তাতে তুমি যে একমাত্র কারণ, তা নয়, মহাকালও নিশ্চয়ই তার কারণ। কিন্তু তুমি যে আমার পায়ে মাথা কুটে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছ, তাতেই হয়ত আমার গর্ভনাশের অসহ্য কষ্টও কোনও রকমে সহ্য করতে পারব–গর্ভকর্তনমেন্মে সহনীয়ং ত্বয়া কৃতম্। দেবকী মহাকালকৃত দুর্বিপাকের কথা সম্পূর্ণ মেনে নিয়ে কংসকে আশ্বাস দিলেন–যাও পুত্র! আমার পুত্রদের মৃত্যুর জন্য যে দুঃখ হচ্ছে, তার জন্য তুমি আর অন্যভাবে ভেবো না
–তদগচ্ছ পুত্র মা তে ভূগ্নদগতং মৃত্যুকারণম্। মৃত্যু প্রথমে মানুষকে প্রহার করে, তারপর আমরা তার হেতু বিচার করি অর্থাৎ দেবকী বলতে চাইলেন–তুমি যে আমার পুত্রগুলিকে মেরেছ–সেগুলি একেকটি প্রহারের মতো, এখন তার হেতু বিচার করলে অনেক কথাই আসবে–পূর্বকৃত কর্মদোষ, মহাকাল, বাস্তবে–ঘটা তাৎকালিক কারণ, মাতা-পিতার দোষ–আরও কত কী।
দেবকী এমন সুন্দর তির্যক ভঙ্গিতে কংসকে এই কথাগুলি বললেন যাতে বোঝা যায়–কংসকৃত অত্যাচার তার পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। কিন্তু মৃত্যুর এই ঘটনা যখন ঘটেই গেছে তখন মরণ প্রহারের পরেও হেতু বিচার করতে হয়, নিজেকে সান্ত্বনা দেবার জন্যেই–মৃত্যুনা প্রহৃতে পূর্বং শেষো হেতুঃ প্রবর্ততে।
কংস সব বুঝলেন। দেবকী যতই বলুন–তোমার কোনও দোষ নেই, মহাকালই এর কারণ–কারণং ত্বং ন বৈ পুত্র কৃতান্তোপ্যত্র কারণ–কংস নিজের অসাফল্যে–এত হত্যা করেও নিজের মৃত্যুর কারণ রোধ করতে পারলেন না–এই অসাফল্যে মনে মনে জ্বলতে জ্বলতে নিজের ঘরে ঢুকলেন–প্রবিবেশো সসংরক্কো দহ্যমানেন চেতসা।
০৮৫. কৃষ্ণের জন্ম
৮৫.
কৃষ্ণের জন্ম নিয়ে বিভিন্ন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক ঝগড়া আছে। এমনকি সাম্প্রদায়িক বিশ্বাসও আছে নানা রকম। সবচেয়ে বড় কথা হল–আমাদের চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণব-সজ্জনেরা কৃষ্ণকে আদপেই বসুদেব-দেবকীর ছেলে বলে মনে করেন না। তাদের কাছে কৃষ্ণ জন্ম থেকেই যশোদা-দুলাল, নদ-নন্দন। এ বিষয়ে দার্শনিকদের কচকচিতে যাবার আগে কৃষ্ণের সত্য স্বরূপটি কী এবং তাঁর লীলার উদ্দেশ্যটা কী সেটা বলে নেওয়া ভাল। দার্শনিক-কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ পদ্যময়ী ভাষায় কৃষ্ণের স্বরূপ যেমনটি বর্ণনা করেছেন, তা হল
কৃষ্ণের যতেক খেলা সর্বোত্তম নরলীলা
নরবপু তাহার স্বরূপ।
গোপবেশ বেণুকর নবকিশোর নটবর
নরলীলার হয় অনুরূপ।
চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের মতে কৃষ্ণলীলার বিশেষত্বই হল এই যে, তিনি স্বয়ং ভগবান হওয়া সত্ত্বেও তার সমস্ত ক্রিয়া–কর্মগুলিই মানুষের মতো এবং জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই তিনি এই মনুষ্যত্ব অতিক্রম করেননি। তার অবতার গ্রহণের মুখ্য উদ্দেশ্যও অসুর-রাক্ষস বধ করা নয়, যেমনটি অন্যান্য অবতারের হয়েছে। দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন–পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতা–এই সাধারণ বাক্যটি নাকি কৃষ্ণের ক্ষেত্রে খাটেই না। তাঁর লীলার প্রধান উদ্দেশ্য গোপীপ্রেম আস্বাদন করা এবং কংসবধ ইত্যাদি দুরূহ কর্ম সাধারণ্যে যতই চমৎকারী হোক না কেন এগুলি তার কাছে গৌণ কর্ম। আর এই অসুর–মারণাদি ক্র–কর্মও তিনি নিজে করেন না। এগুলি করেন তার অন্তঃশায়ী ঈশ্বর-স্বরূপ, যিনি অবতার গ্রহণের সময়েই কৃষ্ণের সঙ্গে এসে মেলেন।
লক্ষ্য করে দেখবেন–চৈতন্যপার্ষদ রূপ গোস্বামী তার তিনখানি বড়-সড় নাটকের মধ্যে কোথাও কৃষ্ণকে বসুদেব-দেবকীর ছেলে বলে একবারও উল্লেখ করেননি এবং রূপের তত্ত্বজ্ঞ ভাইপোটি, যাকে আমরা ধুরন্ধর দার্শনিক জীব গোস্বামী নামে চিনি, তিনি তো হরিবংশের প্রমাণ দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, জন্মকালেই কৃষ্ণ দ্বিভুজ, যশোদাদুলাল, সম্পূর্ণ মানুষ। ঈশ্বরত্বের কোনও স্পষ্ট চিহ্ন তাঁর শরীরে এবং কাজে আপাতদৃষ্টে পাওয়া যাবে না। পরবর্তীকালে এই ব্রজশিশুটির হাতে একটি মুরলী পাওয়া যাবে, কোমরে গোরু চরানোর পাঁচনী পাওয়া যাবে, আর তার মাথার বাঁদিক ঘেঁষে হেলানো থাকবে একটি ময়ূরের পুচ্ছ।
আমরা জানি, এই রকম একটি কৃষ্ণ-মূর্তির জন্য চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের ভাবাবেশ কতখানি! স্বয়ং মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের লেখক গুণরাজ খানের (মালাধর বসু) সম্বন্ধে কী বলেছিলেন মনে আছে তো? বলেছিলেন–এই গ্রন্থের মধ্যে শুধু একটিমাত্র পংক্তি আছে বলে তিনি কবির কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারেন এবং সেই পংক্তিটি হল–নন্দের নন্দন কৃষ্ণ মোর প্রাণনাথ। অতএব নন্দ-নন্দন কৃষ্ণই চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবদের কাছে পরম ঈশ্বরের মূল স্বরূপ।
আসলে এই বিশ্বাসের পিছনে দুটি শক্ত কথা আছে। এই কথা দুটি হল ঐশ্বর্য আর মাধুর্য। ঐশ্বর্য হল ঈশ্বরের ভাব। ভক্তের হৃদয়ে যদি সর্বদা ভগবানের ঈশ্বরভাব জাগরিত থাকে, তবে তিনি ভগবানকে কখনই খুব একটা প্রিয় ভাবতে পারেন না। সব সময়েই মনে হবে–ইনি তো আমার প্রভু, ইনি যা ইচ্ছে তাই তো করতে পারেন। এই প্রভুত্বের নিরিখেই ভক্তের হৃদয়ে ভয়-ভীতি-সন্ত্রস্ততা কাজ করতে থাকে। বৈষ্ণব দার্শনিকেরা বলেন–বসুদেবের মনে কৃষ্ণের সম্বন্ধে এই ঐশ্বর্য-জ্ঞান ছিল টনটনে। এর ফলে নিজপুত্র কৃষ্ণ-বলরামকেও তিনি পুত্র বলতে ভয় পান। তিনি বলেন–তোমরা আমার ছেলে মোটেই নও, বাবা! তোমরা হলে পরম পুরুষ ঈশ্বর–যুবাং ন নঃ সুতৌ সাক্ষাৎ/প্রধানপুরুষেশ্বরী।
