চিরকাল পিতৃ-মাতৃ পরম্পরায় আমরা এইভাবেই পরমা প্রকৃতির আবির্ভাবের কথা শুনে এসেছি। বৈষ্ণবদর্শনে এই ভগবতী যোগমায়া কৃষ্ণের প্রধানা লীলা-সহায়িকা হিসেবে কীর্তিত। ভাগবত পুরাণের অন্যতম রসিক টীকাকার বিশ্বনাথ চক্রবর্তী লিখেছেন–মহামায়া যেমন করে মানুষকে সংসারের মায়া দিয়ে ভুলিয়ে রাখেন যোগমায়াও তেমনই পরম ঈশ্বরকে ভুলিয়ে রাখেন। ঈশ্বর যে তার মনুষ্য-লীলার কালে নিজের ষড়ৈশ্বর্য স্মরণ করতে পারেন না, তিনি যে ঈশ্বরত্ব ভুলে কখনও পুত্র, কখনও সখা এবং কখনও প্রেমিকের মতো ব্যবহার করতে পারেন, তা নাকি ওই অঘটনঘটনপটীয়সী যোগমায়ার প্রভাব। লীলাপুরুষের আবির্ভাবের পূর্বেই তিনি জন্মান। লীলা–পুরুষের লীলা চলাকালীন সময়ে তিনি তাকে সাহায্য করেন এবং তার অন্তর্ধানকালে তিনিও অন্তৰ্হিতা হন।
তবে এসব হল দর্শনের কথা, আমরাও সেই দর্শনে বিশ্বাস করি। কিন্তু অবিশ্বাসী যাঁরা তাদের এসব কথা বিশ্বাস না করলেও চলে। হরিবংশে যেমনটি দেখেছি, তাতে নন্দগোপের বাড়ি থেকে আনা ওই শিশুকন্যাটিকে মৃতা ভাবতে কোনও অসুবিধে নেই। কংস তাকে শিলাপৃষ্ঠে আছড়ে মেরেছেন কি না অথবা তিনি যোগমায়ার স্বরূপ ধারণ করেছিলেন কি না, সে তর্কে না গেলেও চলে। ধরেই নিলাম তিনি মৃতা ছিলেন এবং পরবর্তী রূপান্তরগুলি কথক-ঠাকুরের দৈব-কল্পনা। এমনকি দেবী যে আকাশবাণী সৃষ্টি করেছিলেন–তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সেজাত সত্ত্বাং বধিষ্যতি–এ কথাটাও দৈববাণী হিসেবে না নিয়ে মথুরার জনগণের সমষ্টিগত বিশ্বাস হিসেবেই মেনে নেওয়া যায়।
বসুদেব রাতের অন্ধকারে তার পুত্রটিকে বৃন্দাবনে রেখে এলেও মথুরার জনগণ সে কথা জানত অথবা জেনে ফেলেছিল। মনে রাখতে হবে–বসুদেব কংস-বিরোধী গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা এবং তিনি নজরবন্দী ছিলেন। তাঁর ক্রিয়া-কলাপ কেউ টের পাননি–এ কথা তেমন আদরণীয় নয়। হরিবংশে দেখবেন–সন্তান পরিবর্তন করে এসে তিনি যখন বাড়ি ঢুকছেন, তখন কার্যসিদ্ধি ঘটা সত্ত্বেও তিনি ভীত হয়ে উঠেছেন–পরিবর্তে কৃতে তাভ্যাং গর্ভাভ্যাং ভয়বিক্লবঃ। এই ভয়টা কিছু অমূলক নয়। লোকে কিছু দেখেছে, বিশ্বাস করেছে এবং কংসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে একথা প্রচারও করেছে যে–ব্যাটা! তোকে যে মারবে সে জন্মেছে। অন্য জায়গায়–জাতো যন্ত্বাং বধিষ্যতি।
লক্ষণীয়, অলৌকিকী দেবী অন্তৰ্হিৰ্তা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কংস দেবকীর সঙ্গে ভীষণ নরম করে কথা বলছেন। অন্তত হরিবংশে তাই দেখছি। আমাদের বিশেষ ধারণা–জনরোষ বিপুলভাবে প্রচারিত হবার পর কংস কিছু ভয় পেয়েছেন এবং তার পরেই তিনি দেবকীর সঙ্গে সদয় ব্যবহার করেছেন। তবে এই সদয় ব্যবহারের মধ্যে অনেকটাই যে লোক-দেখানো সেটা আন্দাজ করতে দেরি হয় না। কারণ কংস অতিশয় কুটিল মানুষ, তার ওপরে রাজা। আকার-ইঙ্গিত চেষ্টা এবং ভাব গোপন করাটা তাঁর রাজধর্মের অন্তর্গত। অতএব দৈববাণী শুনেই হোক অথবা প্রভূত জনরোষ থেকে আপাতত মুক্তি পাবার জন্যই হোক, কংস সবার আড়ালে গিয়ে দেবকীর কাছে মাথা নত করলেন সলজ্জে–বিবিক্তে দেবকীং চৈব ব্রীড়িতঃ সমভাষত।
হরিবংশে যেভাবে কথোপকথন চলেছে, তাতে ধারণা হয় দেবকী কংসের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। কংস দেবকীর পাদস্পর্শ করেছেন মাথা দিয়ে এবং বলেছেন–আমি তোমার পুত্রের মতো তোমার চরণে মাথা নুইয়ে বলছি–এষ তে পিদয়োমঁধা পুত্রবত্তব দেবকি। এরপর দেবকীর দিক থেকেও যেরকম পুত্রবৎ সমাশ্বাস নেমে এসেছে, তাতেও মনে হয় দেবকী কংসের বয়োজ্যেষ্ঠা ছিলেন।
আপাতত কংস বেশ দার্শনিকের মতো কথা বলছেন। বলছেন–বোনটি আমার! আমি মরণ থেকে বাঁচবার জন্য তোমার সব কটি ছেলেকেই মেরেছি। কিন্তু এখন দেখছি আমার মৃত্যু আসবে অন্যরূপে অন্য জায়গা থেকে–অন্য এবান্যতো দেবি মম মৃত্যুরুপস্থিতঃ। তুমি জান–আমার মধ্যে একটা হতাশা, একটা নৈরাশ্য কাজ করছিল, যার জন্য আমি অতি আপন জনকেও মেরে ফেলেছি–নৈরাশ্যেন কৃতো যত্নঃ স্বজনে প্রহৃতং ময়া। লক্ষণীয়, যাঁরা মনস্তত্ত্বের বিচার করেন, তাঁরা ইংরেজিতে এটাকে বলেন–ফ্রাস্ট্রেশন। এই ফ্রাস্ট্রেশন থেকে যে এমন হত্যার প্রবৃত্তি জন্মাতে পারে, সেটা সেকালের লোকেরাও জানতেন–নৈরাশ্যেন কৃতো যত্নঃ।
কংস এখন আরও ফ্লাস্ট্রেটেড। সেইজন্য তিনি দার্শনিক হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেছেন–আমি আমার পুরুষকার দিয়ে দৈবের বিধানকে লঙ্ঘন করতে পারিনি। কিন্তু সে যাই হোক, বোন! তুমি তোমার পুত্রশোক ত্যাগ করো। মহাকালই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। মহাকালই মানুষকে সংসার থেকে সরিয়ে নেয়, আমি এখানে নিমিত্তমাত্র–কালো নয়তি সর্বং বৈ হেতুভূতস্তু মদ্বিধঃ। নিজের ভাগ্য বা কর্মানুসারে এসব উপদ্রব তো জীবনে আসেই, বোন! তবে দুঃখের কথা হল–মানুষ নিজেকে কর্তা বলে মনে করে–ইদস্তু কষ্টং যজন্তুঃ কর্তাহমিতি মন্যতে।
এসব জায়গায় ভগবদ্গীতার সেই উপদেশ–কালোস্মি, লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধঃ অথবা অহংকারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে–এই পংক্তিগুলির সঙ্গে কংসের মানসিক সাম্য আছে। বিশেষ করে পুত্রশোকের সান্ত্বনা বাক্য ভগবদ্গীতার বক্তব্যের সঙ্গে মিলে গেলে সেটা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হয়। কংস সেই কার্যকরী সান্ত্বনা দিয়ে দেবকীর চরণ স্পর্শ করেছেন পুত্রের মতো। বললেন–জানি আমি অপরাধ করেছি, তবু আমি তোমার পায়ে ধরছি, তুমি আর আমার ওপর রাগ করো নামদগত–স্ত্যজ্যতাং রোযো জানাম্যপকৃতিং ত্বয়ি।
