বসুদেব যে শিশু কন্যাটিকে নিয়ে মথুরায় ফিরে এলেন সেটি সত্যই মৃত না জীবিত সে ব্যাপারে ঠিকঠাক বলার কোনও উপায় আমাদের নেই। শুধু বলি–পুরাণের কথক-ঠাকুরের যে অলৌকিকতায় বিশ্বাস, তাতে যদি আমাদের বিশ্বাস থাকে তবে এই শিশুকন্যাকে ভগবতী যোগমায়া ভাবাই ভাল এবং তাতে কন্যাটি মৃতা হয়ে জন্মালেও তার বেঁচে ওঠাটা অকল্পনীয় হয় না। অন্যদিকে যদি এই ঘটনাটা আধুনিকভাবেই বিশ্বাস করতে হয়, তবে এই কন্যাটিকে মৃতাই ধরে নিন। বসুদেব নন্দগোপের মৃত কন্যাটি নিয়ে গেছেন বলেই কংসের হাতে সে কন্যাকে তুলে দিতে তার দ্বিধা হয়নি এবং কংস তাকে খস্তরশিলায় আছড়ে ফেললেও সেই মৃতা কন্যার গতি মৃত্যুর চেয়ে বেশি কিছু হয়নি।
যাই হোক, বসুদেব মথুরার কারাগারে ফিরলেন প্রায় রজনী প্রভাতে। শিশুকন্যাটিকে শুইয়ে দিলেন দেবকীর পাশে–প্রগৃহ্য দারিকাঞ্চৈব দেবকী-শয়নে ন্যসৎ। এইবারে আমাদের হরিবংশের বিবরণটি অবহিত হয়ে বুঝতে হবে। কারণ কৃষ্ণের শৈশবকালের সবচেয়ে বিশ্বস্ত নথি হল হরিবংশ, মহাভারত নয়। দ্বিতীয়ত ভাসের বালচরিতের মূল ভিত্তি হল হরিবংশ। এই হরিবংশে দেখতে পাচ্ছি–আরও সকাল হতেই বসুদেব নিজে কংসের কাছে গিয়ে তার কন্যার জন্ম-সংবাদ জানাচ্ছেন–নিবেদয়ামাস তদা…কংসায়ানকদুন্দুভিঃ। এর থেকেও বুঝতে পারি— বসুদেবের গতায়াতে খুব একটা বাধা-নিষেধ ছিল না।
অন্যান্য পুরাণে অবশ্য সমস্ত ব্যাপারটা রোমাঞ্চকরভাবে পরিবেশন করার জন্যই সকাল হতে না হতেই কংসের কারাগার থেকে শিশুর ক্রন্দন-ধ্বনি শুনতে পাওয়া গেছে এবং কংসের রক্ষী-পুরুষেরা এই ক্রন্দনধ্বনি শুনেই কংসের কাছে দেবকীর সন্তান হবার খবর জানিয়েছে– ততো বালধ্বনিং ত্বা রক্ষিণঃ সহসোখিতাঃ। হরিবংশের বিবরণ এখানে অনেক বেশি লোকসম্মত, কেননা বসুদেব নিজেই কংসের কাছে তার কন্যার জন্ম-সংবাদ দিয়েছেন। এতে যেমন একদিকে বসুদেবের চরিত্রের দৃঢ়তা, সত্যরক্ষার চেষ্টা প্রমাণিত হয়, তেমনি অন্যদিকে কন্যাটির পূর্ব–মরণ সূচিত করে।
কংস বসুদেবের কাছে খবর পেয়ে তাঁর নিজের অঙ্গরক্ষক রক্ষী-পুরুষদের সঙ্গে নিয়ে বসুদেবের ঘরে এসে উপস্থিত হলেন–আজগাম গৃহদ্বারং বসুদেবস্য বীর্যবান্। লক্ষ্য করে দেখুন, হরিবংশ একবারও বসুদেবের আবাসটিকে কারাগার বলল না, আমরা আগেই বলেছিলাম–বসুদেব আপন গৃহে কংসের নজরবন্দী হয়েছিলেন। এই নজর এড়ানোর জন্যই তাকে রাত্রে মথুরা রওনা হতে হয়েছিল এবং তার ফিরতে দেরি হওয়ায় তিনি যথেষ্ট ভয়ও পেয়েছিলেন–পরিবর্তে কৃতে তাভ্যাং গর্ভাভ্যাং ভয়বিক্লবঃ।
কংস গৃহদ্বার থেকেই শুধোলেন–কোনও শিশু জন্মেছে? দাও, আমার হাতে দাও। বলেই তিনি হ্যান করেঙ্গা–ত্যান করেঙ্গা করে নানারকম তর্জন-গর্জন করতে লাগলেন–বাগভিঃ সমভিতর্জয়ৎ। বসুদেব-পত্নী দেবকী কংসের আচরণে বড় কষ্ট পেলেন। রাত্রির অন্ধকারে তার স্বামী কোথায় খুঁজে খুঁজে একটি মৃত শিশু-কন্যা কোলে করে নিয়ে এসেছেন। এখন সেই কন্যাটিকে আছড়ে ফেলে কত বীভৎস আচরণ করবেন কংস–এই আশঙ্কায় দেবকী বললেন–তুমি আমার ছয়-ছয়টি ছেলেকে মেরে ফেলেছ। এটি একটি মেয়ে, তাও সে হতভাগিনী মরা অবস্থাতেই জন্মেছে। বিশ্বাস না হয় হাতে নিয়ে দেখ–-দারিকেয়ং হতৈবৈষা পশ্যস্ব যদি মন্যসে।
কংস জানেন–দেবকীর পুত্রই হোক আর কন্যাই হোক সেটি তার প্রাপ্য, সে জীবিতই থাকুক অথবা মৃত–সেটি তার প্রাপ্য। কংস দেবকীর কথা যাচাই করার জন্য মৃতা কন্যাটিকে ভাল করে দেখলেন। মনে মনে বললেন–এ বেটি যখন মেয়ে হয়েই জন্মেছে তখন এটি নিয়ে আর মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই–হতৈবৈষা যদা কন্যা জাতেZক্কা বৃথামতিঃ। মেয়েটি এখনও যেন গর্ভশয়নের কষ্টে পীড়িত হয়ে আছে, এর চুলগুলো এখনও গর্ভের জলে আর্দ্রসা গর্ভশয়নে ক্লিষ্টা গর্ভান্নিমূর্ধজা। দেবকী আস্তে আস্তে তার জড় নিশ্চল নিশ্চেষ্ট কন্যাটিকে শুইয়ে রাখলেন কংসের সামনে।
হরিবংশের এই বিবরণ আমরা অতিশয় বিশ্বাসযোগ্য মনে করি। কন্যাটি মৃতা ছিল বলেই কংস কর্তৃক এই কন্যার হত্যার সূত্র ধরে ভগবতী যোগমায়ার আবির্ভাব ঘটানো আরও সুবিধেজনক হয়েছে। কংস তার স্বাভাবিক আক্রোশে অথবা অবিশ্বাসে মৃতা কন্যাটিকেও হয়ত শিলায় আছড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই শিলায় আক্ষিপ্ত শিশুকন্যা চূর্ণবিচূর্ণ হবার আগেই অলৌকিকভাবে আকাশে উড়ে গেলেন–সাবধূতা শিলাপৃষ্ঠে অনিষ্পিষ্টা দিবমুৎপতৎ।
সঙ্গে সঙ্গে তার গর্ভবাস-ক্লিন্ন তনু বিলীন হল আকাশে। সেখানে রূপান্তর গ্রহণ করলেন ভগবতী যোগমায়া। আলুলায়িত কেশরাশি। কোনও পুরাণে তিনি চতুর্ভুজা, কোনও পুরাণে অষ্টভুজা। দিব্য গন্ধ আর অনুলেপন তার দেহে। হারশোভিত-সর্বাঙ্গী মুকুটোজ্জ্বল-ভূষিতা। নীল এবং পীতবর্ণের বস্ত্র পরিধানে, গজকুম্ভোপমস্তনী, মনোরম চন্দ্রমুখ, অঙ্গকান্তিতে বিদ্যুতের ছটা, নয়ন দুটি ঊষার সূর্যের মতো মোহন লাল। চিরকালের সেই কন্যারূপিণী দেবী–কন্যৈব সাভবন্নিত্যং–কখনও নাচছেন, কখনও হাসছেন, কখনও বা বিপরীতভাবে উল্লম্ফন করছেন–নৃত্যতী হসতী চৈব বিপরীতেন ভাস্বতী।
হরিবংশে এরপরে যে বর্ণনা আছে তাতে দেবীর সঙ্গে মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীর কোনও তফাত নেই। মহিষাসুর বধের পূর্বাহ্নে তিনি যেমন মধু পান করেছিলেন, এখানেও তাই বিহায়সি গত রৌদ্রা পপৌ পানমনুত্তমম্। অট্টহাসি হেসে কংসকে তিনি বললেন–কংস! তুই নিজের বিনাশের জন্য আমাকে মারতে চেয়েছিলি। তোকে যিনি মারবেন, দেবতাদের সর্বস্বভূত সেই পুরুষ জন্ম নিয়েছেন–জাতত যত্ত্বাং বধিষ্যতি। কংসের মৃত্যুর নিদান জানিয়ে দেবী অন্তর্হিত হলেন।
