.
৮৪.
যমুনার তীরে বসুদেব যখন বন্ধু নন্দগোপকে চিনতে পারলেন, তখন তার কিছু লজ্জা হল, কিছুটা দ্বিধাও। কংসের আদেশে এই বন্ধুকে তিনি অপমান করেছেন, চাবুক মেরেছেন। কিন্তু পূর্বতন এই পরিবেশটার মধ্যে বসুদেবের দিক থেকে এমন এক অসহায়তা ছিল এবং এই মুহূর্তে দুজনেই বিপন্ন বলে বসুদেব এবং নন্দ দুজনেই পরস্পরের মুখোমুখি হলেন খুব তাড়াতাড়ি।
নন্দগোপ বৃন্দাবনের গয়লা শ্রেণীর মানুষ। গোচারণ তার বৃত্তি। অতএব বসুদেব নদগোপের সঙ্গে প্রথম কথাটাই যেটা বললেন, সেটা হল–তোমার গোরুগুলো সব ভাল আছে তো? নন্দগোপ একেবারে গ্রাম্য গয়লা ভাষায় জবাব দিলেন–আম ভর্তঃ কুশল–হা কর্তা! সব ভাল। বসুদেব এবার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু–বান্ধবদের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন এবং তারপরেই দেখলেন–নন্দগোপ কী যেন একটা লুকোতে চাইছেন তাঁর দৃষ্টি থেকে। বসুদেব কোনও ভণিতা না করেই বললেন–তুমি কী লুকনোর চেষ্টা করছ তখন থেকে–বয়স্য কিমিদানীং প্রচ্ছদ্যতে? নন্দগোপ সপ্রতিভভাবে বলার চেষ্টা করলেন–কই কিছু না তো?
বসু–আমার দিব্যি! সত্যি করে বলো, কী ওটা?
নন্দ–কী যে করি, শুনুন তাহলে। আজ মাঝরাত্রে আমার গিন্নি যশোদা এই মেয়েটাকে প্রসব করেছে। কিন্তু হতভাগী জন্মই মারা গেছে। এদিকে কাল আবার আমাদের ঘোযেদের ইন্দ্রযজ্ঞের উৎসব। তাই আমি একা এই মরা মেয়ে নিয়ে বেরিয়েছি, যাতে ঘোষেদের আনন্দের ব্যাঘাত না ঘটে। ওদিকে যশোদাও মূৰ্ছিত, সে হতভাগিনী জানতেও পারল না কিছু।
বসু– হায়! হায়! কী আর করা যাবে? যাকে তো কেউ আর বঞ্চনা করতে পারে না। তোমার এই মেয়ের শরীর যে কাঠ হয়ে গেছে, তা ফেলেই দাও, আর কী করবে? বয়স্য কাষ্ঠভূতং কলেবরং ত্যজ্যতাম্।
নন্দ–না কর্তা! আমি পারছি না, পারছি না; হায়রে মেয়ে আমার–ন শক্লোমি ভর্তঃ, ন শক্লোমি।
বসু–কী উপায়? এই তো লোকধৰ্ম। শব-শরীর তোমাকে ত্যাগ করতেই হবে।
বসুদেব আস্তে আস্তে কিসের যেন ইঙ্গিত করলেন। নন্দগোপ তার মৃত মেয়েটিকে রেখে বসুদেবের কাছে এলেন। বসুদেব বললেন–তুমি তো জান আমার ছটি ছেলেকে কংস মেরে ফেলেছে। এই সপ্তম পুত্রটি আমার দীর্ঘজীবী। তবে আমার কোনও পুত্ৰভাগ্য নেই। আমি চাই–পুত্রটি তোমার ভাগ্যে বেঁচে থাক। তুমি এই ছেলেটিকে নাও।
নন্দগোপ বসুদেবের ছেলেটি নিতে ভয় পেলেন। বললেন–কংস যদি একবার জানতে পারে যে, বসুদেবের ছেলেকে নন্দগোপের ঘরে গচ্ছিত রাখা হয়েছে, তাহলেই হয়ে গেল–আমার মাথাটা আর নেই–যদি কংসো রাজা শৃণোতি–বসুদেবস্য দারকো নন্দগোপস্য হস্তে ন্যাসো নিক্ষিপ্ত ইতি, কিং বহুনা, গতমেব মে শীষ।
ভাসের বালচরিত নাটকের পরবর্তী দৃশ্য আপাতত স্তব্ধ হয়ে থাক। শুধু জানাই–নন্দগোপ যখন বসুদেবের ছেলেটিকে কোলে তুলে নিলেন, তখন বসুদেব তাকে বলেছিলেন–যাদবদের অধিকাংশ বীজ পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট এই বীজটি রক্ষা করার জন্যই তোমার হাতে এই পুত্র তুলে দিলাম।
অস্মিন কালে দগ্ধভূয়িষ্ঠ–শেষং
ন্যস্তং বীজং রক্ষিতুং যাদবানা।
আমাদের ধারণা–বসুদেবের এই কথাটির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সত্য আছে। যাদবরা সর্বত্র কংসের ভয়ে সন্ত্রস্ত, কেউ লুক্কায়িত, কেউ পলায়িত। যাদবদের এই দুঃসময়ে বসুদেব তার শিশু পুত্রটিকে শুধু বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন। তিনি ভাবছেন–হয়ত এই শিশুই একদিন বড় হয়ে যাদবদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে, অত্যাচারী কংসের হাত থেকে সেই হয়ত একদিন ছিনিয়ে নেবে মথুরার রাজশাসন। বিপন্ন অবস্থাতেও এই শিশুটির দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-সুখ নিয়ে বসুদেবের চিন্তা আছে। হাজার হলেও এ ছেলে যাদবদের অন্যতম রাজগোষ্ঠীর ছেলে। সে এই গ্রাম্য আবাসে কেমন করে মানুষ হবে–তা নিয়ে বিলক্ষণ চিন্তা আছে বসুদেবের। এই বিপন্ন মুহূর্তেও নন্দগোপালকে তিনি একবার ডেকে শুধোলেন–তুমি এ ছেলেকে কেমন করে মানুষ করবে, বন্ধু?
নন্দলোপ গয়লাদের গ্রাম্য সরলতার জবাব দিলেন–ও এক বাড়িতে গিয়ে দুধ খাবে, আরেক বাড়িতে খাবে দই–একয়িং গেহে গচ্ছিঅ খীরং পিবই, অন্নষিং গেহে গচ্ছিঅ দধিং ভখই। এক বাড়িতে গিয়ে ননী খাবে আর এক বাড়িতে পায়েস। আবার কোনও বাড়িতে গিয়ে হয়ত ঘোলের হাঁড়ির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে। আরে এক কথায় বলি–ও হবে আমাদের ঘোষেদের মোড়ল।
বসুদেব বুঝলেন–বৃন্দাবনের প্রবাসে তার ছেলেটি রাজভোগ লাভ করবে না হয়ত। কিন্তু গ্রাম্যজনের সাধারণ স্বাভাবিক আন্তরিকতায় ব্রজবাসীর নয়নের মণি হয়ে উঠবে তাঁর পুত্রটি। এই আন্তরিকতার মূল্য রাজভোগের চাইতে হাজার গুণ বেশি। বসুদেব এবার নিশ্চিন্তে বললেন–যেমনটি তুমি বললে, তেমনটিই হোক। তুমি এবার ফিরে যাও। নন্দগোপ বসুদেবের পুত্রটি কোলে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে চললেন।
এরপর বালচরিত নাটকে নন্দগোপের পরিত্যক্ত কন্যাটি অলৌকিকভাবে হঠাৎই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং দুরাত্মা কংসকে বঞ্চনা করার জন্য বসুদেব সেই শিশু-কন্যাটিকে কোলে নিয়ে মথুরায় ফিরে এলেন। বালচরিত নাটকে বসুদেবের পুত্র এবং নন্দগোপের মৃত কন্যাটির মধ্যে অবতার–বাদের সমস্ত আবেশটুকুই ধরা আছে, কিন্তু সেই আবেশের ওপরেও এখানে ঘোষিত হয়েছে এই শিশুপুত্রটির মনুষ্যভাবের জয়কার–কোথাও কোনও ঘরে সে ননী খাবে, কোনও ঘরে খাবে পায়েস আর কোথাও বা লুব্ধ চোখে ঘোল–ভরা হাঁড়ির দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকবে–অপরষিং গেহে গচ্ছিঅ ণবনীদং গিলই, অনুষিং গেহে গচ্ছিঅ পায়সং ভুঞ্জই। ইদলষিং গেহে গচ্ছিত এঘটং পলোঅদি।
