সত্য কথা বলতে কি–যশোদা হয়ত একটি মৃত কন্যাই প্রসব করেছিলেন এবং এই ঘটনা স্নেহময়ী যশোমতীকে ভীষণ দুঃখ দিতে পারে ভেবেই নন্দগোপ হয়ত সেই কন্যার সদগতি করার জন্য বাইরে বেরিয়েছিলেন, কারণ বিষ্ণুপুরাণে দেখতে পাচ্ছি–সেই রাত্রে ভোরের দিকে নদ–ইত্যাদি গোপজনেরা কংসকে কর দেবার জন্য যমুনার ধারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বসুদেব তাঁদের দেখেওছিলেন।
কংসস্য করমাদায় তত্রৈবাভ্যাগতাংস্তটে।
নন্দাদীন গোপবৃন্দাংশ্চ যমুনায়া দদর্শ সঃ।
হরিবংশের মৃতা কন্যার সংবাদ এবং বিষ্ণুপুরাণে যমুনাতীরে উপস্থিত নন্দগোপের সংবাদ ব্যবহার করে ভাস যেভাবে তার নাটক রচনা করেছেন, তা যতখানি নাটকীয়, তার চেয়েও বেশি সত্যনিষ্ঠ মনে হয়। বসুদেব তখন বৃন্দাবনে ঘোষপল্লীর কাছাকাছি চলে এসেছেন এবং স্বগতোক্তি করছেন–কাছের এই ঘোযপল্লীতেই আমার বন্ধু নন্দগোপ বাস করে। কংসের আদেশে আমি তাকে শেকল দিয়ে বেঁধেছি, চাবুকও মেরেছি।
এই কথাটা শুনতে অস্বাভাবিক লাগছে যে, বসুদেব আবার নন্দগোপকে শেকল দিয়ে বাঁধতে যাবেন কেন আর কেনই বা তাকে চাবুক মারতে যাবেন। এই কথাটার যৌক্তিকতা বোঝবার জন্য একটা কথাই মনে রাখতে হবে যে, বসুদেব একজন রাজপুরুষ, কংসের মন্ত্রিসভায় তিনি একজন মন্ত্রী ছিলেন। ফলত বৃন্দাবনের এই ঘোষপল্লীর মানুষজনেরা যদি কংসের কর দিতে দেরি করতেন, তাহলে কংসের আদেশে বসুদেব এঁদের ওপর অত্যাচার করতে বাধ্য হতেন। বন্ধু নন্দগোপের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি, কিন্তু নন্দগোপ এবং বসুদেব দুজনেই জানতেন, তারা পরস্পরের বন্ধু। যাই হোক, ঘোষপল্লীর কাছাকাছি এসে নন্দগোপের কথা মনে পড়তেই বসুদেব মনে-মনেই বললেন–এই রাত্রিতে আমি এই ঘোষপল্লীতে প্রবেশ করেছি জানলে গোপজনেরা নানা আশঙ্কা করবে। তার চেয়ে রাতটুকু এই বটগাছের তলায় কাটিয়ে সকালের জন্য অপেক্ষা করি। রজনীর অন্ধকারে পুত্র কোলে নিয়ে বসে বারবার আকাঙ্ক্ষা করতে লাগলেন, যাতে নন্দগোপ একবার আসেন তাঁর কাছে। অদৃষ্টে এমন সমাপতনও ঘটে। শোকক্লিষ্ট অবস্থায় নন্দগোপকে আমরা যমুনার তীরে আসতে দেখছি এই মুহূর্তে।
নন্দগোপ বিলাপ করছেন নিজে নিজেই। তার কোলে একটি মৃত শিশু-কন্যা। নন্দ বলছেন–
হায়রে মেয়ে আমার! তুই আমার গৃহলক্ষ্মী হয়ে উঠলি না, এখন। আমাদেরও ছেড়ে চলেছিস। উঃ কী ভীষণ অন্ধকার, যেন একশটা। কালো মহিষ একসঙ্গে মাথার ওপর পড়ছে–সম্প্রতি হি মহিষ-শত সম্পাত-সদৃশোহো বলবানন্ধকারঃ। আজ মাঝরাতেই আমার গিন্নি যশোদা এই মেয়েটাকে প্রসব করেছে। হতভাগী জন্মেই মারা গিয়েছে–প্রসূতেয়ং চ দারী তপস্বিনী জাতমাত্রৈবাপগতপ্রাণা সংবৃত্তা। কাল আবার আমাদের ঘোষেদের পবিত্র ইন্দ্রযজ্ঞের অনুষ্ঠান। এদিকে আমার পায়ে শেকল বাঁধা। চলতেও কষ্ট হচ্ছে। তবু আমি এই মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছি যাতে গোপজনের আনন্দে ব্যাঘাত না ঘটে। হতভাগিনী যশোদাও মূৰ্ছা গেছে। সে জানেই না ছেলে হল না, মেয়ে হল–যশোদাপি তপস্বিনী নৈব জানাতি দারকো বা দারিকা বা প্রসূত ইতি মোহং গতা। হায় মেয়ে আমার।
প্রায় প্রত্যেক পুরাণেই আমরা দেখেছি–প্রসবের পর যশোদা অজ্ঞান হয়ে ছিলেন এবং সেই সুযোগে বসুদেব সন্তান পরিবর্তন করেছেন। আমাদের মনে হয়–কন্যাটিকে মৃত দেখেই যশোদা মূৰ্ছিত হয়েছেন। বসুদেবের পুত্রটির আগমন পর্যন্তও তার এ ঘোর কাটেনি। আরও একটা কথা ভেবে দেখা দরকার। সেটা হল, সে যুগের সামাজিক পরিস্থিতিতে একটি পুরুষ মানুষ মেয়েদের অন্দরমহলে ঢুকে সদ্যপ্রসূতা-রমণীর কোল থেকে মেয়ে নিয়ে চলে এল–এ ঘটনা তেমন আদরণীয় নয়। তার চেয়ে ভাসের বালচরিত অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
রাত্রি গম্ভীর হয়েছে। তখনও অন্ধকার মোটেই কাটেনি। গাছতলায় বসে বসুদেব নন্দগোপের কষ্টকর বিলাপ শুনতে পেলেন। বসুদেব বললেন–কে এই রাত্রে বিলাপ করে? আমারই মতো এও বুঝি এক হতভাগ্য।
নন্দ কেন তুই আমার ঘরের লক্ষ্মী হয়ে উঠলি না, এখন আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেলি তুই।
বসু কণ্ঠস্বরে আমার বন্ধু নন্দগোপ বলে মনে হচ্ছে। হাগো, কে তুমি, আমার বন্ধু নন্দগোপ নাকি, এদিকে এসো।
নন্দ (ভয় পেয়ে) কে আমাকে এখানে নন্দগোপ বলে ডাকে। গলাটা চেনা মনে হচ্ছে। ব্যাটা রাক্ষস না পিশাচ। একে এই ভয়ঙ্কর রাত, তাতে এই মরা মেয়ে আমার হাতে। কী যে করি–ঈদৃশ্যাং প্রতিভয়রজন্যাং মৃতা দারিকা মম হস্তে। কিং নু খলু করিষ্যামি।
বসু ভাই নন্দগোপ। ভয় নেই, এদিকে এসো।
নন্দ আরে গলার স্বর শুনে প্রভু বসুদেব বলে মনে হচ্ছে। যাই এগিয়ে যাই। অবশ্য গিয়েই বা কী করব? কংসের কথা শুনে ইনিই আমাকে চাবুক মেরেছেন, শেকল লাগিয়েছেন। পায়ে। অবশ্য উনি আমার অনেক উপকারও করেছেন। আমার দুঃখে দুঃখ পেয়েছেন, সুখে সুখী হয়েছেন। তবু মনে পড়ে–উনি রাজার আদেশে আমাকে শেকল দিয়ে বেঁধেছেন। যাই এগিয়েই যাই। হাতে আবার এই মরা মেয়েটা রয়েছে। কী যে করি?
নন্দগোপের মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব যত কাটল, রজনীর অন্ধকারও কেটে এল ততটাই। যমুনার তীরে দুই পুরনো বন্ধুর সাক্ষাৎ হল অদ্ভুত এক পরিবেশে। একজনের হাতে মৃত শিশুকন্যা, অন্যজন আরেক হতভাগ্য-ছেলেকে বাঁচানোর জন্য সদ্যপ্রসূত পুত্র জননীর কোল থেকে কেড়ে নিয়ে এখন বটচ্ছায়ায় বসে আছেন। অদূরে যমুনা কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে, সমস্ত ঘটনার সাক্ষী বয়ে নিয়েই যেন।
