কৃষ্ণের জন্মকাল বর্ণনার সময় পুরাণগুলি বর্ষামুখর রাত্রির ঘোষণা করেছে বারবার। কিন্তু কৃষ্ণের জন্মকাল বলেই বর্ষার ধারাসার বর্ষণের পূর্বে বায়ু সেখানে সুখস্পর্শ, নদী প্রসন্নসলিলা, অগ্নি শান্ত। কিন্তু ভাসের নাটকের মধ্যে বর্ণনার এই অদ্ভুত দ্বিচারিতা নেই, বর্ষাকে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ইমেজারি হিসেবে। বর্ষার জলধারা এবং বিদ্যুৎকে বসুদেব-দেবকী এখানে মোটেই সুলক্ষণ মনে করছেন না। তাদের মতে এ পরম দুর্লক্ষণ, কিন্তু দুর্লক্ষণ যেন রান্না কংসের দুর্ভাগ্য সূচনা করছে। দেবকী বলছেন–ছেলের জন্মের সময় যে সব সাংঘাতিক লক্ষণ দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে আমার ছেলেটি বেশ বড় মানুষ কেউ হবে–পুত্ৰকস্য মে মহানুভাবত্বং সূচয়িষ্যস্তি। জন্মসময়–সমুদ্ভূতানি মহানিমিত্তানি। নিষ্ঠুর কংসের নৃশংসতার কথা চিন্তা করে আমি অবশ্য কিছুই ঠিক করতে পারছি না। আর ঠিক এই সময়ে কোথায় যে গেলেন উনি। আরে এই যে, উনি তো এই দিকেই আসছেন। আনন্দে আর বিস্ময়ে ওঁর চোখ দুটি একেবারে আপ্লুত হয়ে গেছে।
বসুদেব প্রবেশ করলেন সেই বর্ষণ-বিদ্যুতের ইমেজারি মুখে উচ্চারণ করে। আর নিজপত্নী দেবকীর ব্যাপারে তিনি ভীষণ রকমের বাস্তববাদী। তিনি বলছেন–ছটা ছেলে গেছে, কম কথা তো নয়। সেই দুঃখ ভুলতেই দেবকী তার সপ্তম সন্তানটিকে কেমন করে আগলে রেখেছে–অপচয়-গমনার্থং সপ্তমং রক্ষমানা। লক্ষণীয়, ভাস এই ছেলেটিকে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান না বলে সপ্তম বললেন। এতে আমাদের সিদ্ধান্ত ঠিক থাকল। বলরামের জন্ম তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রোহিণীর গর্ভে সম্পন্ন হয়েছে। দেবকীর গর্ভ-পুত্র বিনাশের পরই তার গর্ভে কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। হরিবংশে দেখেছি–রোহিণী পুত্র প্রসব করার আগেই বসুদেব তাকে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং মথুরার রাজধানীতে থেকেই তিনি শুনেছিলেন যে, রোহিণীর গর্ভে তার একটি পুত্র জন্মেছে–প্রাগেব বসুদেবস্তু ব্ৰজে শুশ্রাব। রোহিণীম্। প্রজাতাং পুত্রমেবাগ্রে চন্দ্রাৎ কাতরানন। বালচরিত নাটকের সংস্থানে দেখছি–এই পুত্রটিকে কোলে নিয়ে বসুদেব পত্নী দেবকী কংসের মৃত্যুর স্বপ্ন দেখছেন বিভোর হয়ে।
বসুদেব বাস্তব বোঝেন। অতএব দেবকীকে দেখামাত্রই তার প্রথম প্রতিক্রিয়া হল–দেখ, এখন একেবারে মাঝরাত। মথুরা নগরীতে সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে অতএব এই শিশুটিকে আমি এক্ষুনি নিয়ে চলে যাই, যাতে আর কেউ না দেখতে পায়–প্রসুপ্তো মধুরায়াং সর্বো জনঃ। তস্মাদ যাবন্ন কশ্চিৎ পশ্যতি তাবলং গৃহীত্ব অপক্রামামি।
দেবকী কিন্তু আর্যপুত্র। একে তুমি কোথায় নিয়ে যাবে?
বসুদেব সত্যি বলছি দেবকী। আমিও ঠিক জানি না–অহমপি ন জানে সমস্ত পৃথিবী দুরাত্মা কংসের আজ্ঞাধীন। তাই কোথায় যে এই বালককে নিয়ে সংগোপনে রাখব, তা আমিও
জানি না। তবে অদৃষ্ট যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানেই যাব আর কি।
দেবকী আমি এই শিশুটিকে একটু ভাল করে দেখতে চাই, আর্যপুত্র।
বসুদেব ভাল বলেছ। রাহু মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে গেলার জন্য। আর সেই হাঁ–মুখের মধ্যে তুমি চাঁদ দেখতে চাইছ–কিং দ্রষ্টব্যঃ শশাঙ্কোয়ং রাহোবদনমণ্ডলে? তুমি একে যত ভাল করেই দেখ, কংসের হাতে এর মৃত্যু হবে।
দেবকী না। কোনও মতেই হবে না।
বসুদেব তুমি যা বলছ, সমস্ত দেবতারাও তাই বলুন। সে যাক, তুমি ছেলে নিয়ে এসো।
দেবকী ছেলে এনে তুলে দিলেন বসুদেবের হাতে। বসুদেব শিশুপুত্র কোলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পৌরাণিকেরা নানা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা করেছেন। কারাগারে কংসের রক্ষীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হল। আপনা–আপনিই মুক্ত হয়ে গেল বন্দিশালার দরজা–দ্বারস্তুঃ সর্বাঃ পিহিতা দুরত্যয়া/বৃহৎ-কপাটায়সকীল-শৃঙ্খলৈঃ। আমরা আগেও বলেছি যে, বসুদেব দেবকীকে কংসের কারাগারে চেন টেনে দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলে আমরা মনে করি না। আমাদের বিশেষ ধারণা বসুদেব-দেবকী তাঁদের স্বগৃহেই কংসের নজরবন্দী ছিলেন। রক্ষী-পুরুষেরা অবশ্যই সেখানে ছিল। কিন্তু দিনের পর দিন পাহারা দিতে দিতে তাদের পাহারার ধার কমে গিয়েছিল। তাছাড়া রাজপুরুষ হিসেবে বসুদেবের সম্মান কিছু কম ছিল না এবং রক্ষী পুরুষেরা তাকে অবিশ্বাস করার কারণ কিছু খুঁজে পেত না।
আমরা বিশ্বাস করি, সেদিন অবিরাম বর্ষণের মধ্যে বসুদেবের দরজা খোলার শব্দ তারা। টের পায়নি এবং এমন বাদলা দিনে ঘুমটাও ছিল তাদের স্বাভাবিক। বসুদেবের ওপরে কংস কিংবা কারারক্ষীদের যে বিশ্বাস ছিল, সেই বিশ্বাসটা এক্সপ্লয়েট করেই বসুদেব সেই রাত্রে বাইরে যেতে পেরেছিলেন। সেদিন রাত্রে সত্যই বৃষ্টি হচ্ছিল–ববর্ষ পর্জন্য উপাংশুগর্জিতঃ সেই বৃষ্টির মধ্যে তিনি কী করে যমুনা পার হলেন, শেষ নাগ তাঁর মাথায় ছত্রধারণ করেছিলেন কি না, কোনও শৃগাল তাকে পথ দেখিয়েছিল কি না–সে সব তর্কে আমরা যাচ্ছি না। তবে সেই রাত্রে বৃন্দাবনের যশোমতী এবং মথুরার কারাগারে দেবকী–দুজনেই যে একসঙ্গে প্রসূতা হলেন এবং বসুদেব যেভাবে সন্তান পরিবর্তন করলেন, সেই তর্কটায় আমাদের যেতেই হবে।
ভাগবত-পুরাণ, হরিবংশ কিংবা বিষ্ণুপুরাণ সর্বত্রই এই কথাটি বলা আছে, যে যশোদার গর্ভে যিনি বৃন্দাবনে জন্মেছিলেন, সেই মেয়েটি ছিল যোগমায়া। ভাগবত এবং হরিবংশে দেখেছি–মাঝরাতে বৃন্দাবনে সকলে যখন ঘুমিয়ে আছে, তখন বসুদেব যশোদার অজ্ঞাতসারেই তার শিশু কন্যাটি পরিবর্তন করে নিজের ছেলেটিকে দিয়ে আসেন। হরিবংশের জবান থেকে পরে কিন্তু জানা যাচ্ছে যে, যশোদার কন্যাটি জন্ম থেকেই মৃতা ছিল, আধুনিকেরা এটা বলেছেন Still-born। ভাসের বালচরিত নাটকের বর্ণনাকে যারা নিরপেক্ষ ইতিহাসের মূল্য দিয়ে থাকেন, তারা কিন্তু বলেন যে, ভাস হরিবংশ এবং বিষ্ণুপুরাণের আখ্যানের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
