ধৃতরাষ্ট্রের এই কূটবুদ্ধি সভাসদ মন্ত্রীরা, বিশেষত ভীষ্ম এবং বিদুর অবশ্যই খুব ভাল বুঝেছেন। জন্মের তারিখ এবং বয়সের নিরিখে যুধিষ্ঠিরই যে রাজ্যলাভের ন্যায়সঙ্গত অধিকারী–সে কথা ভীষ্ম এবং বিদুরকেও আলাদা করে জানানো হয়েছিল–তদাখ্যাত ভীষ্ময় বিদুরায় চ ধামতে। অতএব ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্ন শুনে তারা কী বুদ্ধিকরলেন, সেটাও লক্ষ্য করার মতো। ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্ন শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই নাকি আবারও সেই শেয়াল-কুকুর শকুনের অমঙ্গলসূচক শব্দ শোনা গেল আর সেই অমঙ্গলের শব্দ শুনেই বিদুর বলে উঠলেন–আপনার বড় ছেলে জন্মাবার সঙ্গে-সঙ্গেই যখন এইসব অকল্যাণকর প্রাণীদের শব্দ শোনা যাচ্ছে, অতএব আপনার এই পুত্র এই বিখ্যাত কুরুবংশের সর্বনাশ ডেকে আনবে বলেই আমাদের মনে হচ্ছে। আপনি বরং আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্রটিকে পরিত্যাগ করুন। একশ ছেলের জায়গায় একটিকে বাদ দিয়ে যদি আপনার নিরানব্বইটি ছেলেও থাকে–শতমেকোনমপ্যস্ত –তাতেও এই কুলের শান্তি থাকবে–ত্যজৈনমেকং শান্তিঞ্চেৎ কুলস্যেচ্ছসি ভারত।
শান্তি। বিখ্যাত ভরতবংশের শান্তি নেমে আসবে। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে মহারাজ ভরতের নামে সম্বোধন করলেন, কারণ রাজ্যের স্বার্থে এবং বৃহত্তর প্রজাপালন-ধর্মের স্বার্থে মহারাজ ভরত তার অনুপযুক্ত পুত্রদের ত্যাগ করেছিলেন। বিদুর সেই দৃষ্টান্তের অনুবৃত্তি কামনা করলেন ভরতবংশের অধস্তন ধৃতরাষ্ট্রের কাছে। বস্তুত শেয়াল-শকুনের ডাক এবং অন্যান্য দুর্নিমিত্তের মহাকাব্যিক বর্ণনার মধ্যে সত্যই কোনও দুর্লক্ষণ ছিল কিনা আমাদের জানা নেই। কিন্তু স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের মধ্যেই কুরুবংশের অশান্তির লক্ষণ সুপ্ত ছিল। যুধিষ্ঠির যখন রাজা হবেনই এবং সেটা যখন নিয়তির মতো ধৃতরাষ্ট্রের ভাগ্যে নেমে এসেছে, সেখানে ধৃতরাষ্ট্রের ওই প্রশ্নের মধ্যেই অশান্তির দুর্লক্ষণ ছিল। সেটা বুঝেই মহামতি বিদুর এবং হস্তিনাপুরের রাজসভার অন্যান্য ব্রাহ্মণ-মন্ত্রীরা রাজধর্মের বিধান দিয়ে বললেন–বংশের শান্তির জন্য একজনকে পরিত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়–ত্যজেদেকং কুলার্থে। আর যদি একটি জনপদ বা গ্রাম রক্ষার জন্য আপন বংশকেও ত্যাগ করতে হয়, র্বে তাই করা উচিত–গ্রামস্যার্থে কুলং ত্যজেৎ।
ভারতবর্ষে রাজধর্মের আদর্শ এইরকমই ছিল। বৃহত্তরের স্বার্থে আত্মস্বার্থ বলি দেওয়ার কথাই এখানে বলা হয়েছে। বিদুর সেই বৃহত্তর স্বার্থগুলি কোনটার চেয়ে কোনটা বড়–এই অনুক্রমে দেখিয়েছেন। বংশজনের জন্য কুলের অশান্তিকারী মানুষকে, একটি গোটা গ্রামের জন্য নিজের বংশকে, এবং সম্পূর্ণ দেশের জন্য একটা গ্রামকেও ত্যাগ করাটা রাজধর্মের নীতি। সবার ওপরে আছে নিজের কথা। অর্থাৎ তুমি নিজে যদি বিপন্ন হও, মৃত্যু যদি তোমার শিয়রে এসে দাঁড়ায় তবে তুমি দেশকেও জলাঞ্জলি দিতে পার। কারণ তুমি নিজে না বাঁচলে কিসের বংশ, কিসের গ্রাম কিসের দেশ–অতএব আত্মার্থে পৃথিবীং ত্যজেৎ। মানুষের কল্যাণকামী শ্রুতিশাস্ত্রও তাই বলে নিজেকে সর্বদা রক্ষা করবে–আত্মানং সততং গোপায়ীত।
যাই হোক বিদুরের এই নীতি উপদেশে ধৃতরাষ্ট্রের কিছু হল না। মহাভারতের কবি মন্তব্য করলেন–পুত্রস্নেহে অন্ধ রাজা বিদুরের কথা শুনলেন নান চকার তথা রাজা পুত্রস্নেহ-সমন্বিতঃ। মহাকাব্যের বর্ণনা অনুযায়ী দুর্যোধনের পর ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্রের জন্ম হল এবং তার একটি কন্যাও হল, যার নাম দুঃশলা। গান্ধারী ছাড়াও একটি বৈশ্যা দাসী মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ভোগ্যা ছিলেন। তিনি ঠিক বিবাহিতা স্ত্রী নন, অতএব ভোগ্যাত্বই তার বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশ্যার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের আরও একটি পুত্র জন্মাল। তার নাম যুযুৎসু। ক্ষত্রিয়ের ঔরসে বৈশ্যার গর্ভজাত সন্তানের জাত হল করণ। যুযুৎসু এই করণজাতের সংকরজন্মা–জজ্ঞে ধীমাংস্ততস্তস্যাং যুযুৎসুঃ করণে নৃপ।
.
৮৩.
শতশৃঙ্গ পর্বতের রম্য বনভূমি ছেড়ে আমাদের আরও একবার যেতে হবে মথুরায়। নির্জন অরণ্যে বসে হস্তিনাপুরের রাজনৈতিক জটিলতা কিছুই টের পাচ্ছিলেন না পাণ্ডু। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র যুধিষ্ঠির জন্মানোর এক বছর পর ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুর্যোধন জন্মালেন। এই ঘটনায় হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতে যে আবর্ত তৈরি হল, তার কোনও সংবাদই শতশৃঙ্গ পর্বতে এসে পৌঁছল না। অন্যদিকে মথুরায় কংসের কারাগারে বন্দী হয়ে আছেন বসুদেব। তার ছয়টি পুত্র মারা গেছে। তার স্ত্রীর সপ্তম গর্ভটি অঘটনঘটনপটীয়সী যোগমায়ার শক্তিতে বসুদেবের পৌরবী গৃহিণী রোহিণীর গর্ভে প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং রোহিণীর গর্ভে বসুদেবের প্রথম পুত্র বলরাম জন্মেছেন বৃন্দাবনে।
আমরা যদি অলৌকিকতার মধ্যে না যাই, তবে এই মুহূর্তেই একটি কথা নিবেদন করতে। চাই। আমরা পূর্বে জানিয়েছি যে, বসুদেবের ছয়টি মৃত পুত্রকে সংখ্যাগতভাবে না দেখাই ভাল। আমরা পুরাণের প্রমাণ দিয়ে পূর্বে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, বসুদেবের ছয়টি পুত্রকে স্বচ্ছন্দে একটি একক ধরে নেওয়া যায়। অর্থাৎ পুরাণে উল্লিখিত ছয় বসুদেব-পুত্রের পূর্বজন্মের প্রমাণে যেহেতু এই একক ধরেই নেওয়া যায়, অতএব বলরামের জন্ম নিয়েও কোনও অলৌকিক ভাবনার মধ্যে আমাদের যেতে হয় না। কংস নিশ্চয়ই দেবকীর কোনও পুত্র-সন্তানকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু এই ঘটনার পুর্বেই এবং বসুদেবের কারাগার প্রবেশের পূর্বেই তার পৌরবী পত্নী রোহিণীর গর্ভাধান সম্পূর্ণ হয়। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস–কংসের অত্যাচারে ভীত হয়েই বসুদেব বৃন্দাবনে তার প্রিয় সখা নন্দগোপের বাড়িতে রোহিণীকে পূর্বেই রেখে আসেন। এদিকে কারাগারে আবদ্ধ হবার পর দেবকীর গর্ভজাত তার একটি পুত্রের মৃত্যু যেমন ঘটে, তেমনি অন্যদিকে বৃন্দাবনেই তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বলরাম জন্মগ্রহণ করেন। রোহিণীর গর্ভে দেবকীর গর্ভ প্রতিস্থাপনের অতিলৌকিক কাহিনী এইভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় বলে আমরা মনে করি।
