মহাভারতের কবি লিখেছেন–গান্ধারীর এই ইচ্ছের কথা ধ্যানযোগে জানতে পারলেন ব্যাস। তিনি সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হলেন হস্তিনাপুরে। তিনি মাংসপিণ্ডটি দেখে গান্ধারীকে জিজ্ঞাসা করলেন–তুমি এই মাংসপেশীটি নিয়ে কী করতে চাও এখন–কিমিদং তে চিকীর্ষিত?
গান্ধারী তার হৃদয়ের সমস্ত সত্য নিবেদন করলেন শ্বশুর ব্যাসের কাছে। তিনি যে কুন্তীর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে আপন গর্ভে আঘাত হেনেছিলেন সেকথাও অকপটে জানালেন তাকে দুঃখেন পরমেণেদমুদরং পাতিতং ময়া। সামান্য একটু অভিমানও করলেন ব্যাসের প্রতি। বললেন–আপনি আমাকে শত পুত্র লাভ করার বর দিয়েছিলেন, কিন্তু শতপুত্র দূরে থাক আমার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে এই লোহার মতো এক মাংসপেশী।
ব্যাস বললেন–আমি বৃথা আলাপের সময়েও কখনও মিথ্যা কথা বলিনি, তাই আমার আশীর্বাদ মিথ্যা হবে না। তুমি খুব তাড়াতাড়ি একশটা কলসী নিয়ে এস এবং সেগুলিতে ঘি ভরে রেখে দাও। এইবার অতিশীতল জলে এই মাংসপিণ্ডটিকে ভিজিয়ে রাখ– শীতাভিরদ্ভিরষ্ঠীলামিমাঞ্চ পরিষেচয়। ব্যাসের কথা শুনে গান্ধারী শীতল জলে মাংসপিণ্ডটিকে বারবার সিঞ্চন করতে থাকলেন। আস্তে আস্তে মাংসপিণ্ডটি অনেকগুলি খণ্ডে বিভক্ত হল। ব্যাস প্রত্যেকটি খণ্ডকে তারপর রেখে দিলেন ঘৃতপূর্ণ কলসীতে। সুরক্ষিত স্থানে কলসীগুলি রেখে দেওয়া হল। ব্যাস বললেন–ঠিক এক বৎসর পরে কলসীগুলির মুখগুলি তুমি খুলবে–উদঘাটনীয়ান্যেতানি কুম্ভানীতি চ সৌবলীম্।
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস তার সুপরামর্শ দিয়ে হিমালয়ে প্রস্থান করলেন। লক্ষণীয়, এও কিন্তু এক কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় পুত্রোৎপাদনের ব্যাপার। আমরা একথা বলছি না যে, এখনকার দিনে যেভাবে টেস্টটিউব বেবি তৈরি হচ্ছে, যেভাবে মাতৃগর্ভে কৃত্রিম বীজ স্থাপন করা হচ্ছে–সেই পদ্ধতিতে তেমন কিছু এখানেও করা হয়েছে। সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায় যে, চিকিৎসাশাস্ত্রের এই আধুনিক উন্নত ভাবনাগুলি তাদের পক্ষে চিন্তা করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু উলটোদিকে একথা ঠিক যে, তাদের নিজের মতো করে প্রাচীনেরাও এই বিদ্যা কিছু কিছু জানতেন। সবচেয়ে বড় কথা–ব্যাসের এই গর্ভসংস্থাপনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত শীতল জল এবং ঘূতপূর্ণ কলসীগুলি আধুনিক চিকিৎসা–পদ্ধতির গন্ধবহ বটেই।
অথবা এমনও বলা যায় যে, দা ভিঞ্চি যেমন এয়ারোপ্লেনের যুগে জন্মগ্রহণ না করেও বহুপূর্বেই বায়ুযানের ছবি আঁকতে পেরেছিলেন, তেমনই টেস্টটিউব বেবির যুগে না জন্মেও ব্যাস মাতৃগর্ভ প্রতিস্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। দা ভিঞ্চি চিত্রকর, ব্যাসদেব কৰি। এই দুই &দর্শী শিল্পীর মনে যে স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নের ছায়া পাই এয়ারোপ্লেনের ছবিতে অথবা মাংসপেশীর প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়ায়।
যে যাই হোক, বাস যেহেতু গান্ধারীকে আরও এক বছর অপেক্ষা করতে বললেন, অতএব তার জ্যৈষ্ঠ পুত্রের জন্ম অন্তত এক বছর পিছিয়ে গেল এবং দুর্ভাগ্যক্রমে তা মিলে গেল কুন্তার পুত্র ভীমের জন্মতিথির সঙ্গে। দুর্যোধন ভীমের জন্মরাশিতে যেন পদার্পণ করেই জন্মালেন। দিন আর রাতের এই দুই জাতক দিন-রাত্রির মতোই বিপরীত আকর্ষণে শত্রু হয়ে থাকবেন চিরকাল।
মহাভারতের কবি ধৃতরাষ্ট্রের প্রথম পুত্র দুর্যোধন জন্মাবার সঙ্গে-সঙ্গেই নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকের মতো ঘোষণা করে দিলেন যে, জন্মের প্রমাণে যুধিষ্ঠিরই কৌরব-পাণ্ডবদের মধ্যে সবার চাইতে বড়-জন্মতস্তু প্রমাণেন জ্যেষ্ঠো রাজা যুধিষ্ঠিরঃ। ভবিষ্যতে হস্তিনাপুরের সিংহাসনের অধিকার নিয়ে যে লড়াই লাগবে, সেখানে তৎকালীন দিনের ভাবনা অনুযায়ী ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরই যে সিংহাসনের ন্যায়সঙ্গত দাবিদার–সে ব্যাপারে মহাভারতের কবি নিজের মতটি আগেই জানিয়ে রাখলেন।
ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারীর প্রথম পুত্র দুর্যোধন জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই নাকি গর্দভের মতো কর্কশ শব্দ করে কেঁদেছিলেন–রাসরাবসদৃশং ররাব চ ননাদ চ। দুর্যোধনের ওই শব্দের প্রতিধ্বনি করে ডেকে উঠেছিল শেয়াল, শকুন, কাকেরা। চারিদিকে নানা দুর্লক্ষণও দেখা দিল এবং তাতে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র চিন্তিত হলেন রীতিমতো। তিনি ভীষ্ম, বিদুর এবং অন্যান্য মন্ত্রী ব্রাহ্মণদের সভায় ডেকে এনে বললেন–আমাদের এই বিখ্যাত কুরুকুলের বৃদ্ধি ঘটিয়েছে যে ছেলেটি, সেই যুধিষ্ঠির তো রাজ্য পেয়েই গেছে, অতএব সেখানে আমার কিচ্ছুটি বলার নেই; কুমার যুধিষ্ঠিরের পর আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধন রাজা হতেরবে তো–অয়ন্তু অনন্তরস্তম্মাদপি রাজা ভবিষ্যতি?
ধৃতরাষ্ট্রের এই সামান্য কথা থেকেই বোঝা যায় রাজ্য পাবার জন্য তার কতটা আকূতি ছিল। নিজে নাই পেলাম, অন্তত–ছেলে রাজ্য পাক–এইরকম এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই ধৃতরাষ্ট্রের মানসিক জটিলতা তৈরি হতে থাকে। এরপরে তিনি যখন বুঝলেন যে, জন্মের প্রমাণে যুধিষ্ঠিরই সর্বজ্যেষ্ঠ এবং তিনি হস্তিনাপুরের অধিকার পাবেন, তখন তিনি সখেদে বলেছেন–যুধিষ্ঠির রাজ্য পাক–তাতে আমাদের কোনও বক্তব্য নেই–ন তস্মিন্ বাচ্যমস্তি নঃ–কিন্তু তার পরে আমার দুর্যো। রাজ্য পাবে তো?
প্রশ্নটা সভাসদগণের কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর ছিল। কে যুধিষ্ঠির, কোথায় যুধিষ্ঠির এখনও তাঁকে চোখে দেখা যায়নি। যদি বা ধরে নেওয়া যায়–পাণ্ডুপুত্র নিজের অধিকারে না হয় এসেই পড়লেন হস্তিনায়, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের চেয়ে একবছরের মাত্র ছোট হয়ে দুর্যোধন কতদিন তার অগ্রজের মৃত্যুর অপেক্ষা করবেন আর কবেই বা রাজা হবেন। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নটা মোটেই এত সরল নয়। তিনি ভাবছেন–বয়সে বড় ভাই হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাজ্য পাননি। তার পরবর্তী বংশেও তাঁর অনুজের পুত্র যুধিষ্ঠির রাজা হবেই। এরপর আবার বংশপরম্পরায় যুধিষ্ঠিরের পুত্রই রাজা হবে ভবিষ্যতে। ধৃতরাষ্ট্র এটা চলতে দিতে চান না। তার ইচ্ছে–যুধিষ্ঠিরের রাজত্বকাল পেরিয়ে যাবার পরেও যদি দুর্যোধন রাজা হয়, তবে সেই অভিষিক্ত রাজার পুত্রটি অন্তত হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসবে, অন্তত তাতে ধৃতরাষ্ট্রের বংশ-পরম্পরা সিংহাসনের অধিকারী হবে, পাণ্ডুরা নয়।
