কুন্তী পূর্বোক্ত পদ্ধতিতেই মিলিত হলেন বায়ুদেবের সঙ্গে এবং তার ঔরসে কুন্তীর দ্বিতীয় পুত্র জন্ম গ্রহণ করলেন। তার নাম ভীম, শক্তিতেও তিনি ভীষণতম্মা জজ্ঞে মহাবাহু–ভীমো ভীমপরাক্রমঃ। ভীমের জন্মমাত্রেই আকাশ থেকে দৈববাণী হল–সমস্ত শক্তিমান লোকের মধ্যে তোমার এই ছেলে হবে সবচাইতে শক্তিমান–সর্বোং বলিনাং শ্রেষ্ঠো জাতোয়মিতি ভারত। ভীম জন্মাবার সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁর লোকোত্তর শারীরিক শক্তির পরিচয় পাওয়া গেল। সেদিন শিশু ভীমকে কোলে নিয়ে কুন্তী এমনিই বসে ছিলেন। শতশৃঙ্গ পর্বতের অরণ্যভূমি। বাঘ-সিংহের ভয় সেখানে যথেষ্ট। হঠাৎই চোখের সামনে একটা বাঘ দেখে কুন্তী হতচকিত হয়ে প্রাথমিক রিফ্লেকসে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তার কোলের মধ্যে যে শিশু ভীম ঘুমিয়ে আছেন, সেকথা তার খেয়ালই হল না–নাম্ববুধ্যত তং সুপ্তমুৎসঙ্গে স্বে বৃকোদর।
ভীম কুন্তীর কোল থেকে একটি পাথরের ওপর পড়ে গেলেন। মহাভারতের কবির মতে ভীম পড়ে যাবার ফলে তার নিজের কোনও শারীরিক ক্ষতি তো হলই না, বরঞ্চ যে পাথরটির ওপর তিনি পড়ে গিয়েছিলেন, সেটি তার শরীরের চাপে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল। ছেলের এই অতিমানুষিক শক্তি দেখে পিতা পাণ্ডুর বুক গর্বে ভরে উঠল। তিনি অবাক বিস্ময়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, হয়ত বা ভবিষ্যতের সুখস্বপ্নে তার অন্তরাত্মা পরিপূরিত হল।
বাস্তবে আমরা এই ঘটনাটা নাও বিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু মহাকাব্যের কবি যখন নিজের বর্ণনাকে অতিবাদে ভারাক্রান্ত করেন, তখন তার কথার ভাবটুকু গ্রহণ করতে হয়। অর্থাৎ ভীম পড়ে গেলেন এবং তার শরীরের আঘাতে পার্বত্য শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হল–পততা তেন শতধা শিলা গাত্রৈর্বিচূর্ণিত–এই ঘটনার মধ্যে শিলা বিচূর্ণনের অতিবাদে মহাকাব্যের কবি বুঝিয়ে দিলেন যে, ভীমের শরীরের গঠন ছিল অতিশয় শক্তপোক্ত। হয়ত তিনি কোনও সময় মায়ের কোল থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, তবু তার তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি। ব্যস, এ ঘটনার মধ্যে এইটুকুই ধরার। তার বেশি কিছু নেই।
পাণ্ডুর পুত্র জন্মের অন্তরে অন্তরে মহাভারতের কবি কিন্তু হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির জরুরী খবর শুনিয়ে যাচ্ছেন। একবার যুধিষ্ঠিরের জন্মের সময় তিনি বলেছেন যে, পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠ-পুত্রের জন্ম-সংবাদ হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছল। এখন তিনি খবর দিচ্ছেন–যে দিনে ভীম জন্মেছিলেন, দুর্যোধনও জন্মেছিলেন সেইদিনই–যস্মিন্নহনি ভীমস্তু জজ্ঞে ভরতসত্তম। দুর্যোধনোপি তত্রৈব প্রজজ্ঞে…। আসলে ভীম জন্মেছিলেন চৈত্রমাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে দিনের বেলায় আর দুর্যোধন জন্মেছিলেন ওইদিনই রাত্রিবেলায়। সময়ের এইটুকু হেরফেরে দুজনের ঠিকুজি-কোষ্ঠী একটু অন্যরকম হয়ে গেল। দুজনেরই সিংহরাশি কিন্তু ভীমের মিথুন লগ্ন আর দুর্যোধনের তুলা-লগ্ন। আর লগ্ন থেকেই যেহেতু জাতকের ভাল-মন্দ বিচার হয়, তাই দুর্যোধনের স্বভাব ভীমের থেকে আলাদা। অবশ্য ভীমের জন্ম যত সহজে হল, দুর্যোধনের জন্ম তত সহজে হয়নি।
ভূয়োদর্শিনী গান্ধারী যুধিষ্ঠির জন্মাবার আগেই গর্ভধারণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি প্রসূতা হননি। যে মুহূর্তে যুধিষ্ঠিরের জন্ম-সংবাদ অন্তঃপুরে এসে পৌঁছল–ত্ব কুন্তীসুতং জাতং– সঙ্গে সঙ্গে গান্ধারী ঈর্ষায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের গর্ভে আঘাত করলেন। এই মুহূর্তটির কথা ধৃতরাষ্ট্র নাকি জানতেন না। কিন্তু গান্ধারী ইচ্ছে করে নিজের গর্ভপাত করলেন–সোদরং পাতয়ামাস, গান্ধারী দুঃখমূচ্ছিা।
এখানে দুঃখমূচ্ছিতা মানে, দুঃখে কাতর হয়ে গান্ধারী তার গর্ভমোচন করলেন অকালে–এমনটিই হয়। কিন্তু এই দুঃখ যে ঈর্ষাজনিত, সেকথা গান্ধারী নিজেই পরে স্বীকার করেছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল–গান্ধারীকে আমরা একটু অন্যভাবে চিনি। গান্ধারীর ধৈর্য এবং ধর্মবোধ পরে প্রবাদে পরিণত হবে। সেই গান্ধারীর এমন অদ্ভুত অসহিষ্ণুতা দেখে মনে হয়–ধৃতরাষ্ট্রের জটিলতাই এখানে গান্ধারীর মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে থাকবে। যতই বলা হোক ধৃতরাষ্ট্র কিছু জানতেন না–অজ্ঞাতং ধৃতরাষ্ট্রস্য–আর গান্ধারী স্বেচ্ছায় এই কর্ম করে বসলেন–এ কথা ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। অন্ধত্বের কারণে ধৃতরাষ্ট্র রাজ্য পাননি–এই ক্ষোভ ধৃতরাষ্ট্রকে অহর্নিশি পীড়া দিত। পাণ্ডু বনে প্রব্রজিতা হবার পর থেকে তার মনে তীব্র আশা ছিল যে, জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজে রাজা হতে পারেননি বটে, কিন্তু তাঁর পুত্র যদি পাণ্ডুর পুত্রটির থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ হয়, তবে তাঁর পুত্রই রাজ্য লাভ করবে। অন্তত আত্মজ পুত্রের রাজসুখ দেখে তিনি নিজের মনে মনে রাজা হবার সুখ মেটাবেন।
আমাদের ধারণা—ধৃতরাষ্ট্রের এই মনোবৃত্তি কিংবা আশা আকাঙ্ক্ষার কথা মনস্বিনী গান্ধারী জানতেন এবং এই বিষয় নিয়ে গান্ধারীর সঙ্গে তাঁর বারংবার আলোচনাও হয়েছে নিশ্চয়। কাজেই আমাদের ধারণা, আপাতত এই গর্ভপাতের ঘটনাটা ধৃতরাষ্ট্রের অজান্তে ঘটলেও গান্ধারী তাঁর মনোগত ইচ্ছার দ্বারা এতটাই চালিত হয়েছিলেন যে, তার মতো ধর্মশীলা নারীর মধ্যেও ঈর্ষার বীজ উৎপন্ন হয়েছিল। কিন্তু দূরদৃষ্ট এমনই যে, গর্ভে আঘাত হানার পরেও তার অভীষ্ট পূরণ হল না। তার গর্ভ থেকে বহির্গত হল লোহার মতো শক্ত এক মাংসপিণ্ড–ততো জজ্ঞে মাংসপেশী লৌহষ্ঠীলেব সংহতা। গর্ভপাতের লক্ষণযুক্ত সেই মাংসপেশীটি ফেলে দেওয়ার কথাই ভাবলেন গান্ধারী।
