সোমশ্রবা এক সপীর পুত্র। জনমেজয় সোমশ্রকে হস্তিনাপুরে নিয়ে এসে ভাইদের বলেন। তার আজ্ঞাবহ হতে। আর ঠিক সোমশ্ৰবাকে নিযুক্ত করেই যে তিনি তক্ষশিলা জয় করতে বেরলেন তার পেছনে সোমশ্রবার পরামর্শ ছিল বলে আমরা অনুমান করি। হয়তো তিনিই বলেছিলেন যে, পরীক্ষিতের মৃত্যুর কারণ তক্ষককে সেইখানেই পাওয়া যাবে। তক্ষশিলা আর তক্ষক–এই তক্ষ’ নামের সাদৃশ্যটা খুব বড় কথা নয়, তক্ষক যে ওইখানেই থাকতেন, তার একটা বড় প্রমাণ মহাভারতের বনপর্বে। সেখানে দেখা যাবে পাণ্ডব মধ্যম অর্জুন অমোঘ অস্ত্র লাভ করার জন্য শিবের তপস্যা করতে গেছেন আর যুধিষ্ঠির দ্রৌপদী আর অন্য ভাইদের, নিয়ে বিমনা হয়ে বসে আছেন। এই অবস্থায় দেবর্ষি নারদের সঙ্গে তাঁর দেখা হল। নারদ তাকে নানা তীর্থে ঘুরে বেড়াবার উপদেশ দিলেন। বেড়ানোও হবে, পুণ্যও হবে, সময় ও কেটে যাবে স্বচ্ছন্দে। এই নানা তীর্থের নাম এবং তাঁর মাহাত্মের মধ্যে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের কথা এল। শোনা। গেল– কাশ্মীরে বিতস্তা নদীর জল-ধোয়া কোনও এক অঞ্চলে নাগরাজ তক্ষকের বাসভূমি -–কাশ্মীরেম্বেব নাগস্য ভবনং তক্ষকস্য চ। বিতস্তাখ্যমিতি খ্যাতং সর্বপাপ-প্রমোচন।
সেকালে এমন ছিল। শুধু আর্যগোষ্ঠীর আর ব্রাহ্মণ্যের কেন্দ্রগুলিই শুধু তীর্থ হিসেবে পরিগণিত হত না। কোনও স্থানকে আপন তপস্যায় এবং মাহাত্মে তীৰ্থীকরণের ক্ষমতা আর্যদের যেমন ছিল, আর্য-বিরুদ্ধ-গোষ্ঠীরও তেমন ছিল। বলতে পারেন এই কাশ্মীরদেশি নাগ ভবনের মালিক তক্ষক আর পরীক্ষিত-হস্তা তক্ষক একই ব্যক্তি কিনা? হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। এমন হতে পারে–খাণ্ডব দাহের সময় অর্জুনের তাড়া খেয়ে তক্ষক কাশ্মীরের প্রত্যন্ত দেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আবার এমনও হতে পারে–তক্ষক একটি বিখ্যাত নাগবংশের উপাধিমাত্র। কাশ্মীরে বিতস্তা নদীর তীরভূমিতে তক্ষক নাগবংশ এতটাই বিখ্যাত ছিল যে তাদের আবাসভূমি তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। যে কোনও কারণে এই বিখ্যাত বংশের সঙ্গে পাণ্ডবদের শত্রুতা হয় এবং মহারাজ পরীক্ষিত তার বলি হন।
জনমেজয় তক্ষশিলা, জয় করে ফিরে এলেন বটে, কিন্তু তক্ষককে তিনি সেখানে পাননি। মহাভারতে দেখবেন এই তক্ষশিলা জয়ের পর-পরই মহর্ষি বেদের শিষ্য উতঙ্ক উপস্থিত হন হস্তিনাপুরে জনমেজয়ের রাজসভায় এবং তিনি তক্ষকের সম্বন্ধে জনমেজয়কে উত্তেজিত করেন। ঠিক এইবার জনমেজয় পিতার মৃত্যু সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে প্রাচীন মন্ত্রীদের জিজ্ঞাসা করেন এবং মন্ত্রীরাও আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা জনমেজয়ের কাছে নিবেদন করেন। সে সব ঘটনা আমরা আগে বলেছি।
জনমেজয়ের রাজসভায় জরুরি বৈঠক বসল। মন্ত্রী এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের সবার মত চেয়ে জনমেজয় বললেন, উতষ্কের হেনস্থা এবং পিতার মৃত্যু- এই দুয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি তক্ষককেও পুড়িয়ে মারতে চাই। মন্ত্রী পুরোহিতেরা একযোগে সর্পযজ্ঞের আয়োজন করতে বললেন। যাজ্ঞিকেরা আভিচারিক বৃত্তির প্রতীক কালো কাপড় পরে ধূমাকুলিতনেত্রে আগুনে আহুতি দিতে থাকলেন আর সাপেরা যে যেখানে ছিল, সব এসে পড়তে লাগল যজ্ঞের আগুনে।
আসল কথা হল– জনমেজয় তক্ষকের ওপর রাগে সমস্ত নাগ-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সর্পযন্ত্র একটা রূপকমাত্র। আমি পরে মহাভারত থেকে দেখাব বিশাল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকেও বেশ কয়েকবার যন্ত্রের রূপকে বেঁধে দিয়েছেন কবি। জনমেজয়ের সৰ্পর্সত্রে সেই রূপকটুকু পরিষ্কার করা নেই, যাতে বোঝা যায় জনমেজয় সমগ্র নাগ-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই তাঁর জেহাদ ঘোষণা করলেন! পণ্ডিতের ভাষায় –janamejaya …..chalked out a plan for a wholesale massacre of their race.
লক্ষণীয় বিষয় হল– নাগ-গোষ্ঠীর মধ্যে সকলেই একরকমের লোক নন। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যাঁদের সঙ্গে আর্য-ব্রাহ্মণ্যের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। মহর্ষি কাশ্যপের দুই স্ত্রী ক এবং বিনতার কাহিনী আমি এখানে বিস্তারিতভাবে বলছি না। কিন্তু কশ্যপের এই দুই স্ত্রীর মধ্যে দাসিবৃত্তির শপথ নিয়ে একটা বাজি ধরার ব্যাপার ছিল। সম্পূর্ণ শ্বেতবর্ণ উচ্চৈঃশ্রবার ল্যাজটি কালো না সাদা, এই নিয়ে দুই সতীনে বাজি ধরলেন। কদ্রু বললেন- উচ্চৈঃশ্রবার ল্যাজটি কালো, বিনতা বললেন সাদা। বাজি জিতবার জন্য কদ্রু তার সর্প-পুত্রদের আদেশ দিলেন উচ্চৈঃশ্রবার ল্যাজে গিয়ে আটকে থাকার জন্য। সর্পপুত্রদের বেশিরভাগই এই শঠতায় রাজি হলেন, কিন্তু অনেকে আবার রাজি হলেনও না, তারা মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে বেরিয়ে এলেন।
মা কদ্রু এই সাপদের অভিশাপ দিলেন বটে, কিন্তু সেই অভিশাপ শুনেও নাগ-জাতির মধ্যে সব থেকে প্রভাবশালী শেষনাগ চলে গেলেন তপস্যা করতে। কঠিন নিয়ম আর ব্রত আচরণে তার শরীরের চামড়া শিরা-শুকিয়ে গেল এবং স্বয়ং ব্রহ্ম তাকে একজন খাঁটি মুনির মতোই সম্মান দিলেন-তপ্যমানং তপো ঘোরং…জটাচীরধরং মুনি। শেষনাগ ধার্মিক মুনির সম্মানে ভূষিত হয়ে ব্রহ্মার বর লাভ করলেন। এটাই বড় কথা নয়, ব্রহ্মার ইচ্ছায় তিনি সমস্ত পৃথিবীকে আপন ফণাগ্রে ধারণ করে রইলেন। অর্থাৎ নাগ হওয়া সত্ত্বেও আর্যগোষ্ঠীর নিয়ম আচার পালন করে তিনি আর্য-অনার্য সকলের মধ্যেই পূজা-পদবি লাভ করলেন। পৃথিবীর স্থিতিশীলতার জন্য সকলেই তার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে রইল।
