ধর্মদেব জগতের হিতের প্রতীক, সত্য এবং সামাজিক মূল্যবোধের প্রতীক। তিনি আজ কুন্তীর বশীকরণমন্ত্রে আপ্লুত হয়ে যোগের ঐশ্বর্যে মূর্তি ধারণ করেছেন। সেই যোগমূর্তিধর ধর্মের সঙ্গে সঙ্গত হয়ে–ধর্মেণ সহ সঙ্গম্য যোগমূর্তিধরেণ সা–যাঁকে পুত্র হিসেবে পেলেন কুন্তী, সেই তিনিই পাণ্ডুর প্রথম পুত্র। তার নাম হল যুধিষ্ঠিরযুধিষ্ঠির ইতি খ্যাতঃ পাণ্ডেঃ প্রথমজঃ সুতঃ।
সে সময়টা ছিল জ্যৈষ্ঠমাস, পূর্ণিমা লেগেছে। দিনের বেলায় সূর্য যখন একেবারে আকাশের মাঝখানে স্থির হয়ে তাপ বিকিরণ করছেন, সেই সময়ে যুধিষ্ঠির জন্মালেন। তার জন্মমাত্রেই আকাশ থেকে দৈববাণী হল–এ ছেলে তোমার ধার্মিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হবে। এমন মানুষও দ্বিতীয়টি দেখা যাবে না। এ ছেলে তোমার বিখ্যাত রাজা হবে–ভবিতা প্রথিতে রাজা ত্রিষু লোকে্যু বিশ্রুতঃ। তোমার এই ছেলের যশ যেমন হবে, তেমনই হবে তার তেজ, আর তেমনই নির্মল চরিত্র–যশসা তেজসা চৈব বৃত্তেন চ সমন্বিতঃ।
আচ্ছা, যুধিষ্ঠিরের নাম যুধিষ্ঠির হল কেন? এর কি কোনও কারণ আছে? হয়ত নেই, হয়ত আছে। মাতা-পিতা অনেক আশায় পুলকিত হয়ে পুত্রের নামকরণ করেন। কখনও সে নাম পুত্রের স্বভাব বা কর্মের সঙ্গে মেলে, কখনও বা তা মেলে না। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের নাম তার পিতা-মাতা রাখেননি। অন্তরীক্ষলোকের ভাষায় দৈববাণীতে তার নাম উচ্চারিত হয়েছে। যুধিষ্ঠির বলে। কাজেই এ নাম একেবারে অর্থহীন হবে বলে মনে হয় না।
.
৮২.
যুধিষ্ঠিরের পিতা ধর্মদেবের বৈদিক কল্প খুঁজতে গিয়ে প্রোফেসর ডুমেজিল যে কেন বৈদিক মিত্রকে খুঁজে বের করলেন, তার একটা কারণ বুঝতে পারি। এ কারণ তিনি নিজে বলেননি, তবে আমাদের ধারণা, এটা একটা কারণ হতে পারে। যুধিষ্ঠিরের নামও দেখুন, কাজও দেখুন। যুধিষ্ঠিরের মানে যুদ্ধেও যিনি স্থির থাকতে পারেন–যুধি স্থিরঃ। সামান্য তর্কাতর্কি করতে গেলেই যেখানে আমাদের মাথা ঠিক থাকে না, সেখানে যুদ্ধকালেও যুধিষ্ঠির মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন। যুদ্ধে তিনি হেরে গেলেন, তাতে বয়ে গেল, আবার জিতলেন, তাতেও কিছু বিকার হল না। অস্ত্রপরীক্ষার সময় কোনও অস্ত্ৰক্ষমতা প্রদর্শন করতে না পেরে আচার্য দ্রোণের কাছে বকুনি খেলেন, তাতে তার কোনও লজ্জাও হল না, মান-সম্মানও গেল না। আবার জ্ঞাতিশত্রুর উপদ্রবে বনে গেলেন, তাতেও তার কোনও দুঃখ নেই। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে শাস্ত্রচর্চা করে তার দিব্যি কেটে যাচ্ছিল। আবার যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ জিতে সিংহাসন এল তার হাতের মুঠোয়, তখন তিনি শত্রুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি দেখে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন।
অতএব এ এক আশ্চর্য স্থির, শীতল চরিত্র। বৈদিক দেবতা মিত্র হলেন সত্য, ধর্ম এবং সামাজিক শৃঙ্খলার অধিকর্তা। যে দেবতার সঙ্গে তার গাঁটছড়া বাঁধা আছে সেই বরুণের চরিত্র কিন্তু অন্য রকম। এমনকি দুজনের খাবার-দাবারের আহুতিও অন্যরকম। মিত্রাবরুণের বরুণ যদি গরম গরম খাবারের আহুতি পছন্দ করেন তো মিত্র পছন্দ করেন ঠান্ডা–শীতল আহুতি বরুণদেব পাপ-তাপ-খারাপ–সব গ্রহণ করেন, কিন্তু মিত্র গ্রহণ করেন সত-ঋত-ভালটা যুধিষ্ঠিরের পিতা ধর্মদেবের মধ্যে মিত্রদোবের এই স্থিরতা, শীতলতা এবং ধর্মবুদ্ধি বৈদিক অনুক্রমেই এসেছে এবং ধর্মদোবের এই সব দৈবগুণ সঞ্চারিত হয়েছে তার পুত্র যুধিষ্ঠিরের মধ্যে। বৈদিক মিত্রের মধ্যে পুরোহিত ব্রাহ্মণের স্বভাব–ব্রহ্মব মিত্রঃ। সত্যেই তাঁর প্রতিষ্টা!
ধর্মের পরম্পরায় যুধিষ্ঠিরও যতটা না ক্ষত্রিয়, তার চেয়ে বেশি ব্রাহ্মণ। এই স্থিরতা শীতলতার জন্যই তিনি যুদ্ধেও স্থির–অর্থাৎ যুধিষ্ঠির।
ক্ষত্রিয়ের বর্ণে জন্মগ্রহণ করেও যুধিষ্ঠিরের ব্রাহ্মণত্বের কথায় পরে সময়মতো আসব। আপাতত জানাই–পাণ্ডু বনবাসী হলেও তিনি হস্তিনাপুরের ন্যায়সঙ্গত রাজা এবং রাজা বলেই তার প্রথম পুত্রের জন্ম-সংবাদ খুব তাড়াতাড়িই হস্তিনাপুরে পৌঁছল। আর এদিকে ধর্মদেবের কাছ থেকে এক পরম ধার্মিক পুত্র লাভ করায় পাণ্ডু কুন্তীকে বললেন–লোকে বলে–শক্তিতে, ক্ষমতায় ক্ষত্রিয় জাতি হল সবার প্রধান। তাই বলছিলাম–আবার এমন একটি পুত্র তুমি দেবতাদের কাছে চাও যে পুত্র হবে অসীম শক্তিধর–আহুঃ ক্ষত্রং বলজ্যেষ্ঠং বলশ্রেষ্ঠং সুতং বৃণু। পাণ্ডুর কথা শুনে কুন্তী বায়ুকে আহ্বান করলেন–বায়ুমেবাজুহাব সা। লক্ষণীয় ধর্মদেবকে ডাকবার সময় পাণ্ডু নিজেই তার মনোনয়ন জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বায়ুর কথা বালেননি। কুন্তী নিজেই তাকে ডেকেছেন। এই ঘটনা থেকে–অন্তত যদি দৈব-সন্তান লাভের ঘটনায় বিশ্বাস করতে হয়, তবে এই ঘটনা থেকে বুঝতে হবে যে, বৈদিক দেবতার বলাবল সম্বন্ধে কুন্তী যথেষ্ট অবহিত ছিলেন। বেদে বায়ু হলেন সবচেয়ে দ্রুতগতির দেবতা–বায়ু র্বৈ ক্ষেপিষ্ঠা–এবং তাঁর তেজ, শক্তি এবং সোমপানের ক্ষমতা নিয়েও নানা মুখরোচক কাহিনী আছে বেদে। ক্ষেত্রবিশেষে তিনি দেবশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রের থেকেও বেশি শক্তিমান।
পাণ্ডু যেহেতু কুন্তীর কাছে শুধু মহাবলী এক পুত্র চয়েছেন, অতএব বায়ুকে মনোনীত করতে কুন্তীর দেরি হয়নি। আহ্বানমাত্রেই বায়ু তার বাহনে চড়ে কুন্তীর কাছে এসে উপস্থিত হলেন–ততস্তামাগত বায়ুগারূঢ়ো মহাবলঃ। বেদে, কিন্তু আমরা বায়ু-দেবতাকে অশ্বের বাহনে চড়ে আসতে দেখেছি এবং সেই অশ্বগুলির রঙ আবার কালচে লাল। মহাভারতেও বায়ুর মৃগবাহনটিকে হরিণ ভাবার কোনও কারণ নেই। মৃগ বলতে সংস্কৃতে যে কোনও পশুকেই বোঝায় এবং এখানে সেই পশুকে অশ্ব ভাবাই ভাল। বায়ু কুন্তীর কাছে এসে বললেন–তুমি কী চাও আমার কাছে? যা তোমার মন চায় খুলে বল–হি যত্তে হিদি স্থিত। কুন্তী সলজ্জে হেসে বললেন–পুত্র চাই দেব। সমস্ত বীরের দর্প খর্ব করে দিতে পারে এমন এক মহাকায় এবং মহাবীর পুত্র চাই তোমার কাছে–বলবন্তং মহাকায়ং সর্বদর্পপ্রভঞ্জনম।
