পাণ্ডব এবং কৌরবদের জন্মাবার আগেই পণ্ডিতদের আরও একটা টিপ্পনী এখানে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। পণ্ডিতেরা অনেকেই মনে করেন যে, মহাভারতের বিশাল যুদ্ধটি এক অর্থে সেই চিরন্তন দেবাসুরের যুদ্ধ। মহাভারতের আরম্ভেই একটা অংশাবতরণ অধ্যায় আছে। সেখানে কে কোন দেবতার অংশে জন্ম নিয়েছেন, কেই বা অসুর-দৈত্যদের অংশে জন্ম নিয়েছেন, তার একটা তালিকা আছে। সেখানে মহাভারতের উত্তম চরিত্রগুলির জন্ম দেবতাদের অংশে, আর দুষ্ট চরিত্রগুলির জন্ম সব সময়ই অসুর-দৈত্যদের অংশে। কুরুকুলের অন্যতম প্রধান পুরুষ দুর্যোধন কলির অংশে জন্মেছেন। কলি অর্থ কলহ, দুর্যোধন তার মূলভৃতকারণ।
দেবাসুরের এই অংশাবতরণ আমাদের মতে অবশ্যই মহাভারতের পরবর্তী সংযোজনগুলির অন্যতম এবং সেই অংশাবতরণের ভাবনা থেকে মহাভারতের ঐতিহাসিক যুদ্ধের মধ্যে অলৌকিকতার কোনও স্পন্দন অনুভব করাও খুব যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু পণ্ডিতেরা ভাবনা করেন এবং তাঁদের ভাবনাও নিরর্থক নয়, নির্বিষয়কও নয়। এই অংশাবতরণের ঘটনাকে বাদ দিয়েও মহাভারতের যুদ্ধটাকে যেহেতু স্বয়ং মহাভারতের কবিই এক যজ্ঞের ভাবনায় দেখেছেন, তাই পণ্ডিতেরা ভারত-যুদ্ধের মধ্যে পুরাতন দেবাসুর-যুদ্ধের ছায়া দেখতে–The war between the Bharata cousins is seen as auother battle in the eternal struggle between the gods and demons, this time faught on the earth.
প্রোফেসর এ. কে. রামানুজন দেবাসুর দ্বন্দ্বের এই তত্ত্বটাকে অনেকটা মনুষ্যত্বের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেছেন–মহাভারতের চরিত্রগুলির মধ্যে এক ধরনের পুনরুক্তির ঘটনা ঘটেছে। অন্তত তিনটি জেনারেশন ধরে মহাভারতের প্রধান চরিত্রগুলির প্রায় প্রত্যেকেই–ভীষ্ম থেকে আরম্ভ করে সহদেব পর্যন্ত প্রত্যেকেই যাঁদের পিতা বলে ডাকেন, তাদের একজনের সত্ত্বা অলৌকিক, অন্যজনের লৌকিক। কিন্তু এখানে একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন দুর্যোধন ইত্যাদি কৌরব ভাইয়েরা। তৃতীয় জেনারেশনে এসে দেখা যাচ্ছে আমরা দুই ধরনের জ্ঞাতি-সংঘ পাচ্ছি–যাদের একটি বর্গের পিতৃত্ব দেবলোকের হাতে, অন্য বর্গের পিতৃত্ব মনুষ্যলোইে সীমাবদ্ধ। পাণ্ডুপুত্রেরা প্রত্যেকেই জন্মেছেন নির্দিষ্ট দেবতার ঔরসে, অন্যদিকে আছেন ধৃতরাষ্ট্র যিনি সম্পূর্ণ মনুষ্যোচিতভাবে জন্ম দিয়েছেন তাঁর পুত্রদের ততঃ কালেন সা গর্ভং ধৃতরাষ্ট্ৰাথাগ্রহী।
লক্ষণীয় ব্যাপার হল, গান্ধারীর ওপর মহাদেবের যে বর ছিল অথবা পরবর্তীকালে ব্যাসের কাছ থেকেও যে বরলাভের কথা শুনলাম, তার মধ্যে কিছু অতিবাদ থাকতেই পারে; হয়ত গান্ধারী শতপুত্র না হলেও অনেকগুলি পুত্র লাভ করেছিলেন, হয়ত তার প্রসবের নির্দিষ্ট সময় অবশ্যই পেরিয়ে গিয়েছিল এবং হয়ত তার গর্ভমুক্তির পর অন্যতম কিছু শুক্রবারও পরামর্শ পেয়েছিলেন গান্ধারী। কিন্তু তার পুত্র জন্মের মধ্যে সাংঘাতিক কোনও অলৌকিকতা নেই। যা পাণ্ডুর ক্ষেত্রে আছে।
আমরা এ বিষয়ে আর বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। শুধু এইটুকু বলব যে, ভবিষ্যতে যে বিশাল ঐতিহাসিক যুদ্ধটি ঘটবে, অথবা হস্তিনাপুরের সিংহাসন নিয়ে ভবিষ্যতে যে বিশাল দ্বন্দ্ব আরম্ভ হবে, তারই যেন সামান্য মুখপাত করে দিলেন মহাভারতের কবি এবং তাও একটি মাত্র পংক্তিতে–গান্ধারীর গর্ভকাল যখন এক বৎসর হয়ে গেছে, কুন্তী তখন ধর্মদেবকে আহ্বান করার জন্য প্রস্তুত হলেন। লৌকিক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে গান্ধারী যে পুরো এক বৎসর কাল গর্ভধারণ করেছিলেন এবং কুন্তী যে তার পরে ধর্মদেবকে আহ্বান করেছেন–তা মনে হয় না। আমাদের ধারণা–গান্ধারীর গর্ভধারণের সংবাদ অরণ্যবাসী পাণ্ডুর কাছে পূর্বাহ্বে পৌঁছে গিয়েছিল বলেই পাণ্ডু পুত্রলাভের জন্য অত ব্যস্ত হয়েছিলেন। তারপরে পাণ্ডু যখন কুন্তীর কাছে শুনলেন যে, দেবতার ঔরসে পুত্রাকাক্ষা করলে সদ্যই পুত্র জন্মাবে, তখন তিনি আর দেরি করেননি। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ধর্মদেবের কাছ থেকে পুত্র লাভ করার জন্য কুন্তীকে অনুরোধ করেছেন।
পাণ্ডুর কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে কুন্তী সেই নিরাকার নির্বিশেষ ধর্মদেবের পূজা করলেন, পূজা করলেন বিশ্বজনের হিতের আধার সেই দেবতাকে। তারপরে দুর্বাসার সঙ্গম-সাধন সিদ্ধমন্ত্র জপ করে আহ্বান জানালেন ধর্মরাজকে–জজাপ মন্ত্রং বিধিবদ দত্তং দুর্বাস পুরা। মন্ত্রের বশীকরণ স্পর্শ করল ধর্মরাজের মর্মস্থানে। বশীকৃত দেবতা সূর্যসঙ্কাশ বিমানে আরোহণ করে অন্তরীক্ষ লোক থেকে নেমে এলেন ভূঁয়ে। তিনি সহাস্যে বললেন–কী চাও তুমি আমার কাছে, কী দিতে হবে আমায়। ধর্মরাজের হাসির উপহার হাসি দিয়েই ফিরিয়ে দিলেন কুন্তী। টীকাকারেরা বললেন–ঋষির মন্ত্রশক্তি কাজ করছে, তাই হাসির উপঢৌকন দিয়ে কুন্তী খানিকটা লঘু করে দিলেন সঙ্গম-সাধনের ব্যাপারটা। বললেন–কী আবার? একটি পুত্র চাই–সা তং বিহস্যমানাপি পুত্রং দেহব্রীদিদম্।
পাণ্ডু পুত্রার্থে এই দেবতার নিয়োগ অনুমোদন করেছেন বটে, কিন্তু তার সামনেই তার পত্নীর সঙ্গে উপস্থিত দেবতার শারীরিক সংসর্গ রুচিকর নয় বলেই মহাভারতের কবি একটু অরণ্য-পর্বতের বর্ণনা দিলেন। বললেন–শতশৃঙ্গ পর্বত বহু পশু-পাখী-সমাকীর্ণ এবং অরণ্যসঙ্কুল। সেই অরণ্যের ভিতর কুন্তী পাণ্ডুর জন্য–শুধু পাণ্ডুর জন্য–ধর্মদেবের সঙ্গে মিলিত হলেন–পাণ্ডারর্থে মহাভাগা কুন্তী ধর্মমুপাগমৎ। ঋতুস্নাতা কুন্তী পবিত্র শুক্লবাস পরিধান করে ধর্ম–দেবতার সঙ্গে শয্যা গ্রহণ করলেন–শয্যাং জগ্রাহ সুশ্রোণী সহ ধর্মের্ণ সুব্রতা। একই পংক্তিতে যুগপৎ সুশ্রোণী এবং সুব্রতা কথাটি সঙ্গম-সাধনে কুন্তীর আকর্ষণীয়ত্ব এবং যান্ত্রিকতা–দুইই সূচনা করে।
