মাদাম বিয়ার্দো অবশ্য মহাভারতের ধর্মরাজকে মিত্রের পুনরুজ্জীবন বলতে রাজি নন। তাঁর মতে ধর্ম একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট আইডিয়া মাত্র যাকে এক কথায় বলা যায় শুভ এবং তাই যদি হয় তবে ধর্ম-দেবকে বৈদিক মিত্রের পুনরুজ্জীবন না বলে বৈদিক ঝতের পুনরুজ্জীবন বলাই ভাল। মাদাম বিয়ার্দো অবশ্য লিখেছেন–And Dharma is the Hindu name for that God. If the god Dharma Yudhisthiras father were to be connected with any older concept, he could be considered as a rejuvination of the vedic rta. not of Mitra, But it is useless to recall a vedic model and it might prove misleading, since dharma does not retain much of sta.
তার মানে মাদাম বিয়ার্দো মিত্রের পক্ষেও নয়, ঝতের পক্ষেও নয়, ধর্মের কোনও বৈদিক পূর্বান্বয় খোঁজার পক্ষেই তিনি নন। তাঁর মতে–More important is the place of Dharma rather than a god or a function it appears here and elsewhere in classical hinduism as the all–enveloping and ultimate value of society.
মাদাম নিজের ধারণাটা মহাভারতের প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেননি বটে–এবং সে দায়িত্ব আমরা না নিলেও পারি–কিন্তু মহাভারতের মধ্যেই যেহেতু ধর্ম শব্দের এমন বিশদ এবং বিচিত্র অর্থ পাওয়া গেছে, যা সমাজের বৃহত্তর শৃঙ্খলা, সত্য, আইন, আচার এবং শুভৈষণাকেই বোঝাতে চায়, তাই ধর্ম বলতে সমাজের চরম মূল্যবোধকেই আমরাও বোঝাতে চাইব। কথাটা পাণ্ডুর নিজের জবানী থেকেই যথেষ্ট পরিষ্কার হয়ে যায়।
পাণ্ডু কুন্তীকে বলেছিলেন–ধর্মকে যদি আহ্বান করা যায় তবে আমাদের প্রজা-পালনের ধর্ম কোনওভাবেই আর অধর্মের সঙ্গে যুক্ত হবে না–অধর্মেনন নো ধর্মঃ সংযুজ্যেত কথঞ্চন। পাণ্ডু ধর্ম শব্দটি ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গে যেহেতু অধর্ম কথাটিরও উল্লেখ করেছেন, তাই অন্বয়-ব্যতিরেকের পদ্ধতিতে ধর্ম বলতে ভারতবর্ষের চিরন্তন রাজধর্মের অন্তর্গত শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয়দের অন্তর্জাত শৃঙ্খলার আধার সেই চরম শুভৈষণাকেই বোঝায়, যাতে মানুষের চরম হিতসাধন হয়, প্রজারা রঞ্জিত হয়। পাণ্ডু আরও বললেন–স্বয়ং ধর্ম যাঁকে তোমার গর্ভে উৎপন্ন করবেন, সে লোকের মন কখনও অধর্মে প্রবৃত্ত হতে পারে না–দত্তস্যাপি চ ধর্মের্ণ নধর্মে রংস্যতে মনঃ। পূর্বপংক্তিতে অধর্মের নিরাস ঘটিয়ে ধর্মের কথা বলেছিলেন, এবারে ধর্মের কথা আগে বলে অধর্মের নিরাস ঘটালেন। আমরা একেই অন্বয়-ব্যতিরেক বলেছি এবং এতে অধর্মের বিপরীত সেই অ্যাবস্ট্রাক্ট আইডিয়া টাই বোঝায়। পাণ্ডু সেই শুভৈষণার চরম অ্যাবস্ট্রাকশনকে রূপ দিতে চাইলেন নিজের সন্তান-পরম্পরার মধ্যে, একই সঙ্গে কুরুবংশের রাজপরম্পরায় তিনি এক চরম উদাহরণ তৈরি করতে চাইলেন। আমার সেই পূত্র হবে কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ ধার্মিক–ধার্মিকশ্চ কুরূণাং স ভবিষ্যতি ন সংশয়ঃ–এইরকম একটা স্বপ্ন দেখতে দেখতে পাণ্ডু কুন্তীকে বলেলন–তুমি সংযত চিত্তে তোমার ঋষির আদিষ্ট মন্ত্রের অভিচার কাজে লাগিয়ে ধর্মকে দেবপ্রধান মনে করে, তাকেই আহ্বান কর– উপচারাভিচারাভ্যাং ধর্মমাবাহয়স্ব বৈ।
পাণ্ডু বললেন–তুমি উপচার এবং অভিচার দুইই প্রয়োগ করো–উপচারাভিচারাভ্যাম্। মনে রাখতে হবে–অভিচার শব্দটার মধ্যে শক্তিমত্তার তাচ্ছিল্য আছে কিছু। অথর্ববেদের মধ্যে প্রথম সেই অভিচারের আরম্ভ। মন্ত্রের সিদ্ধি দিয়ে মারণ-উচাটন-বশীকরণের ক্ষমতা কীভাবে লাভ করা যায়, তার বিশেষ প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়েছে অথর্ববেদে। এই ক্ষমতা এবং প্রক্রিয়াকেই এক কথায় বলে অভিচার। অভিচার শব্দটির মধ্যে যেহেতু ব্যক্তিগত সিদ্ধির সাফল্য এবং সচেতনতা ধরা থাকে, তাই মন্ত্রশক্তির বলজনিত একতাচ্ছিল্যও ক্রিয়া করে মন্ত্রজ্ঞের অন্তরে। কুন্তী আগে পাণ্ডুকে বলেছিলেন–দুর্বাসা আমাকে বশীকরণ শক্তিসম্পন্ন এই উৎকৃষ্ট মন্ত্রটি আমাকে দিয়েছিলেন–স মেভিচার-সংযুক্তমাচষ্ট ভগবান্ বর। অভিচার শব্দটি কুন্তী নিজেই ব্যবহার করায় পাণ্ডু তাকে যেন সাবধান করে দিলেন। অর্থাৎ তোমার এই শক্তি আছে, অতএব তাচ্ছিল্য করে দেবতাকে ডাকবে–এমনটি যাতে না হয়। তুমি তোমার মন্ত্রের শক্তি প্রয়োগ করো, কিন্তু তার মধ্যে যেন দেবতার প্রতি সমাদর থাকে যত্ন থাকে–অভিচারের সঙ্গে যেন উপচারও থাকে, সংযমও থাকে, এবং সেই উপচার-সমাদর যেন অভিচারের পূর্বগামী হয়–উপচারাভিচারাভ্যাং..নিয়তা ত্বং শুচিস্মিতে।
কুন্তী পাণ্ডুর আদেশ মেনে নিয়ে তার অনুকূল কাজ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। বুঝিয়ে দিলেন–এ কাজে তার কোনও কর্তৃত্ব নেই, তিনি কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করছেন মাত্র অভিবাদ্যাভ্যনুজ্ঞাতা প্রদক্ষিণ অবর্তত।
কুন্তী যখন পাণ্ডুর কথা শুনে ধর্মদেবকে আহ্বান করতে প্রস্তুত হচ্ছেন, ঠিক তখনই মহাভারতের কবি একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর শোনালেন। বললেন–কুন্তী যখন গর্ভ ধারণের জন্য ধর্মকে আহ্বান জানালেন, তখন ধৃতরাষ্ট্র-পত্নী গান্ধারীর গর্ভকাল এক বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে –সংবৎসরভৃতে গর্ভে গান্ধাৰ্যা জনমেজয়। আমরা জানি–গান্ধারী শত পুত্র লাভের জন্য মহাদেবের কাছে বরলাভ করেছিলেন বিবাহের পূর্বেই। এখন সেই বরদান কার্যে পরিণত করার সময় আরও একটি মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন হল। তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস। মহামতি ব্যাস একদিন ক্ষুধায় এবং পথশ্রমে কাতর হয়ে ধৃতরাষ্ট্রের ভবনে পৌঁছলেন। গান্ধারী তখন ক্ষুধার্ত ব্যাসকে অনেক শুশ্রূষা করে তুষ্ট করলেন–তোষয়ামাস গান্ধারী ব্যাসস্তস্যৈ বরং দদৌ। সন্তুষ্ট ব্যাস বর দিতে চাইলে গান্ধারী বললেন–আমার স্বামীর মতো বলবান এবং গুণবান একশত পুত্র তোক আমার। ব্যাস তাঁকে সেই বর দিলে গান্ধারী ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র ধারণ করলেন নিজের গর্ভে–ততঃ কালেন সা গর্ভং ধৃতরাষ্ট্রাদথাগ্রহী।
