কুন্তী তাঁর প্রিয় স্বামীর কাছে আনুপূর্বিক দুর্বাসার বৃত্তান্ত নিবেদন করে বললেন–তিনি আমাকে যে মন্ত্র দিয়েছেন, সেই মন্ত্রবলে যে কোনও দেবতাকে আহ্বান করলে তিনি আমার গর্ভে দেবতার তুল্য পুত্র দান করবেন–তয়াহুতঃ সুরঃ পুত্রং প্রদাস্যতি সুরোপমুম্। তুমি যদি অনুমতি কর তবে আমি কোনও দেবতাকেও মন্ত্রবলে আহ্বান করতে পারি। আবার তুমি যদি বল–তবে কোনও ব্রাহ্মণকেও আমি আহ্বান করতে পারি। আসলে নিয়োগপ্রথার চিরন্তন নিয়মে পাণ্ডু কোনও উৎকৃষ্ট তপস্বী ব্রাহ্মণকেই আহ্বান করতে বলেছিলেন। কারণ সে কালের মানুষেরা ভাবতেন–ব্রাহ্মণই সমাজের সবচেয়ে শিক্ষিত এবং মহান বলে তাদের ঔরসে গুণবান পুত্রের জন্ম হবে। পাণ্ডুও সেই ভেবেই কথাটা কুন্তীকে বলেছেন। কিন্তু কুন্তী তার দেববশীকরণের ক্ষমতা আগেভাগে জানিয়ে পাণ্ডুর লোভ তৈরি করলেন প্রথমত। তারপর তার পূর্বের ইচ্ছা মান্য করে বললেন–ব্রাহ্মণকে আহ্বান করার ব্যাপারেও আমার কোনও অসুবিধে নেই। তুমি যেমনটি বলবে তাই করব–যং ত্বং বক্ষ্যসি ধর্মজ্ঞ দেবং ব্রাহ্মণমেব চ। অর্থাৎ এখানেও তিনি সম্পূর্ণ পতিনিষ্ঠ, স্বামীর ইচ্ছায় তিনি কার্যে প্রণোদিত হবেন, নিজের ইচ্ছায় নয়। কুন্তী অবশ্য দেব–ব্রাহ্মণের বিকল্পে কোনটা বেশি সুবিধেজনক, সেটাও বলতে ভুললেন না। বললেন–দেবপুরুষকে ডাকলে আমি অবশ্য সদ্যসদ্যই গর্ভবতী হব। কিন্তু ব্রাহ্মণ আহ্বানের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্রাহ্মণের নিযুক্তি, তার উৎকর্ষ বিচার এবং শেষ পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া–সব কিছু মিলে মিশে বেশ দেরি হয়ে যাবে–দেবাৎ পুত্রফলং সদ্যো বিপ্ৰাৎ কালান্তরে ভবেৎ।
কুন্তী জানেন–একটি পুত্র-লাভের জন্য তার স্বামী কতটা ব্যগ্র আছেন। তার মধ্যে মনুষ্যলোকের অদৃষ্টের অধিকার যাঁদের হাতে, ব্রাহ্মণরাও যাঁদের যজ্ঞাহুতি দিয়ে তৃপ্ত করেন, সেই দেবতার ঔরসে পুত্র লাভ করলে, সেই পুত্রের পিতৃপরিচয় দিতে পাণ্ডু অনেক বেশি সম্মানিত বোধ করবেন। পাণ্ডুর মনস্তত্ত্ব কুন্তী বোঝেন বলেই দেবতাত্মানের ক্ষমতা তিনি জানিয়ে রাখলেন পাণ্ডুকে। আর ব্রাহ্মণের কথাটা শুধু উল্লেখ করলেন পাণ্ডুর প্রতি সম্মান জানানোর জন্য এবং অবশ্যই তার পতিনিষ্ঠা জানানোর জন্য।
লক্ষণীয় বিষয় হল–পাণ্ডুকে দুর্বাসার সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেও কুন্তী কিন্তু তার মন্ত্রপরীক্ষার কৌতূহলের কথা নিবেদন করলেন না। জানালেন না তার পূর্বপ্রসূত দেবপুত্রটির কথাও। তাছাড়া দেবতা এবং ব্রাহ্মণের বিকল্পে দেব–পুরুষের প্রতি যে তার নিগূঢ় পক্ষপাত আছে–সে কথা তিনি ইঙ্গিত করেছেন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে। দেব-ব্রাহ্মণের একতমকে নির্বাচন করার ভার পাণ্ডুর ওপর দিয়ে কুন্তী তার পুরাতন এবং পরীক্ষিত মন্ত্রসাধনের দক্ষতা নিবেদন করেছেন দ্ব্যর্থহীনভাবে। প্রিয় স্বামীকে তিনি বলেছেন–কোন দেবতাকে ডাকব, কখনই বা ডাকব, সে সব কিন্তু তুমি সময়মতো বলে দিও। আমি কিন্তু শুধু তোমার আদেশের অপেক্ষা করছি–আবাহয়ামি কং দেবং কদা বা ভরতর্ভ।
কুন্তীর কথা শুনে পাণ্ডু যে কত খুশি হলেন, তা বলবার নয়। হৃদয়ের সমস্ত কৃতজ্ঞতা উজাড় করে দিয়ে পাণ্ডু কুন্তীর হাত ধরে বললেন–আমি ধন্য হলাম কুন্তী! তুমি আমাকে পুত্রলাভের ব্যাপারে রীতিমতো অনুগ্রহ করেছ। আমি নই, তুমিই এই প্রসিদ্ধ বংশের ধারক ধন্যোস্মি–অনুগৃহীতোস্মি ত্বং নো ধাত্রী কুলস্য হি। কুন্তীর সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডু কৃতজ্ঞ হলেন সেই মহামুনির কাছেও, যে মুনি কুন্তীকে পাণ্ডুর বিপত্তারণ মন্ত্র দিয়েছিলেন। বললেন–আমার প্রণাম সেই মুনিবরকে, যিনি এমন বর দিয়েছেন তোমায়।
পাণ্ডুর আর কোনও তর সইল না। কুন্তীকে ডেকে বললেন–আর দেরি নয়। আজই তুমি তোমার মোহন মন্ত্রে ডাক তোমার দেবতাকে–অদৈব ত্বং বরারোহে প্রযতম্ব যথাবিধি। তুমি আহ্বান কারো ধর্মরাজকে। কেননা দেবতাদের মধ্যে তিনিই তো সবচেয়ে বেশি পুণ্যবান অথবা পুণ্যজনক–ধর্ম আবাহয় শুভে স হি দেবেযু পুণ্যভা।
আমরা এর আগে জানিয়েছি যে, মহাভারতের সামাজিক ভাব এবং ভাবনার মধ্যে তার অব্যবহিত পূর্ব যুগের পরম্পরা অনেকটাই নেমে এসেছে। পুত্র লাভের জন্য পাণ্ডু পরে যাঁদের আহ্বান জানাবেন, যাঁদের ঔরসে ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেব জন্মাবেন, তাঁরা প্রত্যেকেই বৈদিক দেবতা। কাজেই সেখানে বৈদিক যুগের পরম্পরাটা ঠিকই আছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল–পাণ্ডু তার প্রথম সন্তান লাভের জন্য আহ্বান করতে বললেন ধর্মকে, যে ধর্মের সঙ্গে বৈদিক যুগের পূর্বান্বয় ঘটানো খুবই কঠিন। কঠিন এই জন্য যে, ইন্দ্র, বায়ু, যমের মতো ধর্মকে আমরা কোনও দেবতা হিসেবে বেদের মধ্যে পাইনি। অন্যদিকে পাণ্ডুর আহূত ধর্মদেব একেবারে বৈদিক পরম্পরা-বিরহিত কিছু হবেন–সেটা ভাবাও বেশ কঠিন।
এই সমস্যার সমাধান করার জন্য পণ্ডিতদের চেষ্টার অন্ত নেই। জর্জেস ডুমেজিল থেকে আরম্ভ করে মাদাম বিয়ার্দোর মতো চিন্তাশীল মহাভারতের সমালোচকেরা পাণ্ডুর মনোনীত দেব-পুরুষটিকে নিয়ে অনেক ভাবনা করেছেন। ডুমেজিল মনে করেন–সম্পূর্ণ মহাভারতেরই একটা বৈদিক পূর্ব–গঠন নির্ণয় করা যায়, যাকে, ইংরেজিতে বলা যায়– Re-Working of vedic material into a new narrative. এই পদ্ধতিতে বিচার করতে গিয়ে পাণ্ডু-পুত্রদের দৈব গঠনের কথাও এসেছে। ডুমেজিল বিশ্বাস করেন–পাণ্ডুর মনোনীত ধর্মদেব বৈদিক দেবতা মিত্রের পুনরুজ্জীবন মাত্র (rejuvenation), কারণ বৈদিকদের দেব–রাজ্যে মিত্রই হলেন সেই সার্বভৌম নায়ক যিনি সত্যের অধিপতি বলে খ্যাত–সত্যস্য পতিঃ। তাছাড়া বৈদিক দেবতাদের জাত-বিচারে মিত্র হলেন ব্রাহ্মণ এবং তাকে পুরোহিত বলেও সম্বোধন করা হয়েছে। মহাভারতের ধর্ম-দেবতার মধ্যে বৈদিক মিত্রের পুনরুজ্জীবন দেখতে পাওয়ার আরেকটা কারণ হল মিত্র-দেব হলেন ধর্মের রক্ষক এবং তিনি সম্রাটও বটেন। অবশ্য ধর্ম এবং সাম্রাজ্যের ব্যাপারে তার আরও একজন অংশীদার আছেন। তাঁর নাম বরুণ। তারই সঙ্গে সহাযযাগিতায় মিত্রদেব মানুষকে ঋতের পথ দেখান, সত্যের পথ দেখান।
