বেচারা পাণ্ডু! তিনি নিজের জগতে কোনও উদাহরণ না পেয়ে এখন তিনি পশু-জগতের উদাহরণ টানলেন। শ্বেতকেতুর দুটি নিয়ম শোনানোর পর আরও একটি নিয়ম তিনি কুন্তীকে শোনালেন। বললেন–শ্বেতকেতু আরও বলেছিলেন–যে স্ত্রী স্বামীর আদেশ পাওয়া সত্ত্বেও পুরুষান্তরের সংসর্গে ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদন করে না, তারও ভীষণ পাপ হবে। কারণ মহামতি শ্বেতকেতু তার তপস্যার সিদ্ধিতে এই নিয়ম তৈরি করেছিলেন–ইতি তেন পুরা ভীরু মর্যাদা স্থাপিতা বলাৎ।
আমাদের ব্যক্তিগত ধারণা– এই শেষোক্ত নিয়মটি শ্বেতকেতুর তৈরি করা নয়। পাণ্ডু নিজের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে সমাজের একটি ব্যতিক্রমিক রীতিকে সাধারণ নিয়ম বলে চালিয়েছেন। আর সত্যিই এতে সন্দেহ নেই যে, সমাজের সুশৃঙ্খল বৈবাহিক নীতি-নিয়মগুলি চালু হবার পর যখন দেখা গেল বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও পুত্র-কন্যালাভের সমস্যা ঘটতে পারে, তখন সমাজের প্রয়োজনেই এর একটি নিরীহ স্বামী-স্ত্রীর হৃদয়ে বাৎসল্য-সুখের আস্বাদ অনুস্যুত করার জন্যই ক্ষেত্রজ পুত্রের বিধান মেনে নেওয়া হয়। তবু এটা ব্যতিক্রমই এবং এই ব্যতিক্রমের কথাই পাণ্ডু সাড়ম্বরে কুন্তীকে বলতে লাগলেন সাধারণ নীতির মতো করে।
পাণ্ডু বড় বড় দু-চারজন রাজার উদাহরণ দিয়ে কুন্তীকে স্বকার্যে প্ররোচিত করতে চাইলেন। পাণ্ডু বললেন সৌদাস রাজার স্ত্রী ছিলেন ময়ন্তী। তাদের পুত্র-কন্যা ছিল না বলে মহারাজ সৌদাস নিজের স্ত্রী ময়ন্তীর গর্ভে পুত্র উৎপাদন করার জন্য মহর্ষি বশিষ্ঠকে নিযুক্ত করেন। সৌদাসেন চ বামোরু নিযুক্তা পুত্ৰজন্মনি। ময়ন্তী স্বামীর কথা শুনে বশিষ্ঠের সঙ্গে মিলিত হন এবং অম্মক নামে একটি পুত্র লাভ করেন।
অশ্বক একটি ইতিহাস-প্রসিদ্ধ নাম। তার নামে একটি রাজগোষ্ঠীও পুরাকালে তৈরি হয়েছিল। অন্যান্য রাজার উদাহরণ দিয়ে পাণ্ডু এবার নিজের জন্ম-প্রসঙ্গে আসলেন। এর থেকে বড় প্রমাণ তো আর কিছু হতে পারে না। পাণ্ডু বললেন– এই আমার কথাই ধর না। সে তো তোমার জানাও আছে– বিদিতং কমলেক্ষণে। শুধুমাত্র কুরুবংশের বৃদ্ধির জন্য মহর্ষি বেদব্যাস আমাদের তিন ভাইকে জন্ম দিয়েছিলেন কৃষ্ণদ্বৈপানাদভীরু কুরূণাং বংশবৃদ্ধয়ে। লক্ষণীয় বিষয় হল–পাণ্ডু কুন্তীর কাছে যত উদাহরণ প্রত্যুদাহরণ দিলেন, তার মধ্যে অন্তত বেশ কয়েকবার ভীরু বলে তিনি সম্বোধন করেছেন কুন্তীকে। তিনি ধারণা করছেন– পুরুষান্তরের সংসর্গে যে সাহসিকতা লাগে সে সাহসিকতা কুন্তীর নেই। অথবা এখানে সাহস কথাটা না ব্যবহার করাই ভাল। বলা উচিত অনীহা। কুন্তী বারংবার পাণ্ডুর কাছে এই অনীহা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই অনীহাকে সাহসের অভাব, দ্বিধা অথবা নিজের মায়ের উদাহরণে ঘৃণা বলেই মনে করেছেন পাণ্ডু, ফলত বারবার কুন্তীকে তিনি সম্বোধন করছেন ভীরু বলে–ভাবটা এই–ভীতু মেয়ে, কিচ্ছু ভয় নেই।
সমস্ত কথার অবসানে পাণ্ডু এবার তার শেষ সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন। পাণ্ডু বললেন– আমার সমস্ত কথা মাথায় রেখে আমার এই ন্যায়সঙ্গত কথাটা তুমি শোনো। পূর্ববর্তী নিয়ম অনুসারে তুমি তোমার ঋতুকালে আগের মতোই পতিনিষ্ঠ থেকো। তাতে আপত্তি কী? কিন্তু ঋতুভিন্ন সময়ে পুরুষান্তরের সংসর্গে তো দোষই নেই। তখন তো তুমি তোমার স্বেচ্ছানুসারে অন্য পুরুষের সঙ্গ করতে পার, তাতে তো ধর্মজ্ঞ পণ্ডিতেরা সায়ও দিয়েছেন–শেষেম্বন্যেষু কালেষু স্বাতন্ত্রং স্ত্রী কিলাতি। তাছাড়া স্বামী হিসেবে আমার কথাটাও তত তোমার শোনা উচিত–যদ ক্ৰয়াত্তত্তথা কার্য।
সবার শেযে পাণ্ডু আত্মনিবেদন করলেন কুন্তীর কাছে। বললেন–তুমি তো জান–একটি পুত্রলাভের জন্য আমি কীরকম ব্যগ্র আছি। কিন্তু মৃগমুনির অভিশাপে আজ আমার এই অসহায় অবস্থা। আমাকে পুত্রমুখ দর্শন করাও।
হয়ত, কুরুবংশের বৃদ্ধির জন্য, হয়ত আত্মপরম্পরায় হস্তিনাপুরের রাজ্য লাভ করার জন্য অথবা হয়ত চিরন্তন বাৎসল্যের আস্বাদ মেটানোর জন্য পাণ্ডু তার পদ্মপত্রসন্নিভ রক্তিম করতলদুটি অঞ্জলিবদ্ধ করে মাথায় তুলে নমস্কারের ভঙ্গিতে কুন্তীর চরণে সানুনয়ে ঈষৎ আনত হলেন পাণ্ডু
তথা রঙ্গাঙ্গুলিতলঃ পদ্মপত্রনিভঃ শুভে।
প্রসাদার্থং ময়া তেয়ং শিরস্যভদ্যতোঞ্জলিঃ।
.
৮১.
পাণ্ডু স্ত্রীর কাছে হাত জোড় করে সাননুয়ে বললেন–তুমি আমার আদেশ মেনে কোনও তপস্বী ব্রাহ্মণের সংসর্গে সর্বগুণান্বিত পুত্রের জন্ম দাও–পুত্ৰান্ গুণাসমাযুক্তান উৎপাদয়িতুমহসি। এরকমটি যদি হয় তবেই আমি জানব যে, পুত্রবান লোকেরা যে সুখ পায় আমিও তোমার জন্য সেই সুখ পেলাম–ত্বৎকৃতেহং পৃথুশ্রোণি গচ্ছেয়ং পুত্রিণাং গতিম্।
প্রিয় স্বামীর অপার অনুরোধে উপরোধে কুন্তী যে খুব অখুশি হলেন, তা মোটেই নয়। নিজের সামাজিক শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত মাধুর্য মিশিয়ে তিনি অঙুলিবদ্ধ পাণ্ডুর হাত দুখানি তাঁর মাথা থেকে নামিয়ে দিয়ে বললেন–এ বড় অপরাধ হয়ে যাচ্ছে, মহারাজ–অধর্ম সুমহানে। যেখানে স্বামী বলে আমারই উচিত তোমাকে প্রসন্ন করা, সেখানে তুমি হাত জোড় করে আমার প্রসাদ ভিক্ষা করছ–এ বড়ই অপরাধ হয়ে যাচ্ছে, মহারাজযৎ প্রসাদয়তে ভর্তা প্রসাদ্যঃ ক্ষত্রিয়ভ। সে যাইহোক, আমি ছোটবেলায় আমার পিতার ঘরে এক দৃঢ়ব্রত এবং কোপনস্বভাব অতিথির সেবায় নিযুক্ত হয়েছিলাম। সেই ধর্মজ্ঞ মহর্ষিকে লোকে দুর্বাসা বলে জানে। আমি আমার সমস্ত চেষ্টা–প্রযত্ব দিয়ে সেই মহর্ষিকে তুষ্ট করেছিলাম–তমহং শংসিতাত্মানং সর্বত্নৈ– রতোযয়ম্।
