উত্তরকুরু দেশের কথা আমরা বহু পূর্বেই বলেছি। এ দেশ আর্যদের পুরাতন বাসভূমি এবং হয়তো এই জায়গা থেকেই আর্যরা এক সময় এ দেশে আসেন। পুরাণ-ইতিহাস যখন লেখা হচ্ছে, তখন উত্তর-কুরু-দেশের কথাটা সব সময়ই এসেছে বিচিত্র বিষয়ের উদাহরণ হিসেবে, কখনও বা নস্টালজিয়ার মতো করেও। কিন্তু ব্রাহ্মণ-গ্রন্থগুলি রচনার সময়েই উত্তরকুরু দেশের অবস্থিতি অনেকটাই– ওই তো সেদিনের কথার মতো। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে উত্তর–কুরু হিমালয়ের ওপারে কিন্তু মহাভারতের সময়ে এসে বুঝতে পারি– এ দেশ কতটা দূরে। সুমেরুর কাছে যে দেশ, যাকে আধুনিকেরা পামির বলে ডাকেন, যে দেশকে গ্রিস দেশের প্রাচীনেরা পর্যন্ত প্রায় সমোচ্চারণে (ottorocorrae) পৃথিবীর স্বর্গ বলে মেনেছেন, সে দেশ মহাভারতের সময়েই ইতিহাসে পর্যবসিত। পাণ্ডুও সেই ইতিহাসের কথাই বলছেন কুন্তীকে। বলছেন সে দেশের মেয়েদের নির্বাধ মেলামেশার কথা, সামাজিক শৃঙ্খলের অনুপস্থিতির কথাও।
পাণ্ডু যা বলছেন, তাই যদি সামাজিক রীতি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে কেমন করে এই বিবাহের নিগড়ে আবদ্ধ হলেন স্ত্রীলোকেরা? পাণ্ডু সেই ইতিহাসও জানালেন কুন্তীকে। বললেন–বেশিদিন নয়, কুন্তী! এই বিবাহ অথবা স্বামী-স্ত্রীর এই মর্যাদার বন্ধন খুব বেশি দিনের নয়— অস্মিংস্তু লোকে ন চিরান্মর্যাদেয়ং শুচিস্মিতে। স্থাপিতা যেন…কে এই বিবাহের নিয়মটি বেঁধে দিলেন, তাও তোমাকে বলছি কুন্তী।
আবারও এক উপাখ্যান। এই উপাখ্যানও বলা হচ্ছে কুন্তীর মানসিক প্রস্তুতির জন্য! পাণ্ডু বললেন– উদ্দালক বলে এক মহর্ষি ছিলেন। তার ছেলের নাম ছিল শ্বেতকেতু। তিনি একদিন বসে আছেন। আরণ্যক ঋষির কুটির, হয়ত পিতা-পুত্রে বেদ-পাঠে নিরত ছিলেন। এমন সময় একটি লোক এসে মহর্ষি উদ্দালকের সামনেই শ্বেতকেতুর মায়ের হাতখানি জড়িয়ে ধরল– শ্বেতকেতঃ কিল পুরা সমক্ষং মাতরং পিতুঃ। শুধু হাত ধরাই নয়, সেই রমণীকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে প্রণয় নিবেদন করার জন্য পিতা-পুত্রের সামনেই শ্বেতকেতুর জননীকে অচেনা লোকটি বলল আর দেরি কেন? চল, আমরা যাই–জগ্রাহ ব্রাহ্মণঃ পাণৌ গচ্ছাব ইতি চাব্রবীৎ।
ছেলের সামনে সেই ব্রাহ্মণ মাকে নিয়ে যাচ্ছে দেখে তথাকথিত উদ্দালক-পত্নী সামান্য বাধা দিয়েছিলেন বোধহয়। শ্বেতকেতুর ক্রোধ উদ্দীপ্ত হয়েছিল সেইজন্যই। তিনি ভাবলেন– মাকে বুঝি জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে– নীয়মানাং বলাদিব। কিন্তু বস্তুত অচেনা ব্রাহ্মণটি যে কোনও জোর খাটাননি এবং রমণীর বাধা দেওয়াটাও যে রীতিমতো ছেলে–দেখানো একটা ব্যাপার ছিল, সেটা বোঝা যায় রমণীর তথাকথিত স্বামী উদ্দালকের কথায়। শ্বেতকেতুকে রাগে কাঁপতে দেখে ক্রুদ্ধন্তু তং পিতা দৃষ্টা বেপমানমুবাচ হ–পিতা শ্বেতকেতুকে বললেন– তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন, বাছা–এরকমটা তো হয়েই থাকে। সমাজের চিরকালের নীতিই তো এইরকম–মা তাত কোপং কার্যাস্তুমেষ ধর্মঃ সনাতনঃ।
মৈথুন-কামী কোনও রমণীকে প্রত্যাখ্যান করা খুব অন্যায়–এইরকম একটা কথা বেদে ব্রাহ্মণে আছে বটে– ন কাঞ্চন পরিহরে– কিন্তু বেদের এই বিধান একটি নির্দিষ্ট ব্রতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। টীকাকারেরা বলেছেন– কামদেব্য ব্রতে ওই বিধান। হয়ত বা এই ব্রতের মধ্যে প্রাচীন নির্বাধ সমাজের ছায়া পড়েছে। এই সুপ্রাচীন সমাজের প্রতিভূ উদ্দালক তাই অচেনা ব্রাহ্মণটির তথাকথিত অপব্যবহারে একটুও ব্যথিত হলেন না। ক্রুদ্ধ শ্বেতকেতুকে তিনি বললেন–রাগ কোরো না বাছা! আমাদের সমাজে স্ত্রীলোকেরা অনেকটা ছাড়া গোরুর মতো–যথা গাবঃ স্থিতা স্তাত। তাদের আটকে খার নিয়ম নেই কোনও। নিজের বর্ণ অতিক্রম না করলে একটি ব্রাহ্মণের সঙ্গে আমার স্ত্রীরও মিলনে বাধা নেই কোনও। তারা স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে–অনাবৃতা হি সর্বেষাং বর্ণানামঙ্গনা ভুবি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে লোকে এই রমণীটিকে উদ্দালকের স্ত্রী অথবা শ্বেতকেতুর জননী হিসেবেই বা চিনবে কী করে? উদ্দালক যা বলেছেন, তাতে তার সমসাময়িক সমাজে একজন স্ত্রী বাড়ির ঘরকন্না সামলাচ্ছে অথবা রান্নাবাড়ি করছে এবং অন্তত ঋতুকালের অব্যবহিত পরে স্বামী ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সংসর্গ করছে না–ঋতুকালে চ সংপ্রাপ্তে ভর্তারাং ন জহুস্তদা–শুধু এই চিহ্নগুলি দেখেই কোনও রমণীর স্ত্রীত্ব স্বীকার করা হত।
পিতা উদ্দালকের এই নির্বিকার টিপ্পনীতে শ্বেতকেতুর মন একটুও শান্ত হল না। শ্বেতকেতুন চক্ষমে। নিজের জননীকে এইভাবে এক পুরুষাত্তরের সঙ্গে মিলিত হতে দেখে তিনি ঠিক করলেন একটা নিয়ম করতে হবে, যাতে এমন উচ্ছুঙ্খলতা আর না ঘটে। শ্বেতকেতু বললেন–আজ থেকে আর এমনটি চলবে না। আজ থেকে যে রমনী নিজের স্বামী ছেড়ে অন্য পুরুষের সংসর্গ করবে তার নিদারুণ পাপ হবে– ব্যুচ্চরত্যাঃ পতিং নাৰ্য্যা অদ্যপ্রভৃতি পাতক। আবার যে পুরুষ পতিব্রতা রমণীকে ছেড়ে অন্য রমণীর সংসর্গ করবে, তারও পাপ হবে একই রকম।
শ্বেতকেতুর তৈরি করা বৈবাহিক নিয়মের কথা সাড়ম্বরে জানালেও পাণ্ডু কিন্তু নিজের ব্যাপারে একই রকম সচেতন রয়ে গেছেন। তিনি কুন্তীকে বলছেন–শ্বেতকেতুই প্রথম এইরকম একটা কড়া নিয়ম করেছিলেন বলে শুনেছি। তবে জান তো– এ নিয়ম শুধু মানুষের মধ্যেই চলে, ইতর প্রাণীজগতে এই নিয়ম চলে না–মানুষেষু মহাভাগে ন ত্বেবান্যে জন্তুষু।
