এখানে ব্যুষিতাশ্ব এবং ভদ্রার উপাখ্যান বলে কুন্তীও এক ধরনের তৃপ্তি লাভ করলেন। মৃতপতিকার গর্ভে এই প্রক্রিয়ায় সন্তান হয়েছিল কিনা, তা কুন্তীর জানা নেই, কিন্তু এই উপাখ্যান বলে তিনি স্বামীর প্রতি যে নিষ্ঠাটুকু দেখালেন, এই নিষ্ঠাটুকুই তাঁর উপাখ্যানের ফল। আমরা দেখছি–কুন্তীর মুখে এই উপাখ্যান শুনে পাণ্ডু পরম তৃপ্তি লাভ করেছেন। প্রজনন-ক্ষমতা হারানোর ফলে যাঁর মন বিষণ্ণ হয়েছিল; সেই পাণ্ডুও তার নিজের প্রতি কুত্তীর নিষ্ঠা দেখে পরম তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বলে উঠেছেন– দেবী! তুমি যা বললে তা খুব খাঁটি কথা, খুব সত্যি কথা– এবমেতৎ পুরা কুন্তি ব্যুষিতাশ্চকার হ– সত্যিই তো ব্যুষিতা এইভাবেই পুরাকালে পুত্রলাভ করেছিলেন। কিন্তু এই কথাটুকু বলার সঙ্গে সঙ্গেই একদিকে যেমন কুন্তীর স্বামী-নিষ্ঠার স্বীকৃতি দিলেন পাণ্ডু, তেমনই এই ঘটনার অতিলৌকিকতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন– আসলে তিনি ছিলেন দেবতার তুল্য। তাঁর কত ক্ষমতা! সে ক্ষমতা কি আমার আছে, কুন্তী–যথা ত্বয়োক্তং কল্যাণি স হ্যাঁসীদমরোপমঃ। তুমি বরং আমার কাছে আরও কিছু কথা শোনো– যা ধর্মসঙ্গতও বটে এবং পুরাকালের ঋষি-মুনিরা আমার এই কথা সমর্থনও করেছেন।
উক্তির পর প্রত্যুক্তি। উপাখ্যানের পর প্রতি-উপাখ্যান। কুন্তীকে অন্য উপায়ে সন্তান লাভ করার জন্য রাজি করাতে হবে পাণ্ডুকে। অতএব দুনিয়ার সমাজ-সংস্কার, পুরাতন সংস্কার এবং তার পরম্পরাগুলি উল্লেখ করে পাণ্ডু আস্তে আস্তে ভঁর ইষ্টলাভের পরিমণ্ডল তৈরি করছেন। পাণ্ডু বললেন– জান কুন্তী! এই যে একটি পুরুষের সঙ্গে একটি স্ত্রীলোকের বিবাহ হচ্ছে, তাদের সন্তান জন্মাচ্ছে– এসব নিয়ম তো আগে কিছুই ছিল না। সেকালে এমন ছিল যে, মেয়েদের কোনও আচরণের ওপর কোনও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না–অনাবৃতাঃ কিল পুরা স্ক্রিয় আসন্বরাননে। মেয়েরা যেমন ইচ্ছে ঘুরে বেড়াতে পারত, তাদের স্বাধীনতায় কেউ বাধা দিত না–কামচারবিহারিণ্যঃ স্বতন্ত্রাশ্চারুহাসিনি।
আমরা পূর্বেই জানিয়েছি–অন্য কোনও উত্তম পুরুষের সংসর্গে কুন্তীর গর্ভে সমাজ-স্বীকৃত পুত্র লাভ করতে চান পাণ্ডু। কিন্তু বিবাহের সংস্কার অতিক্রম করে এই প্রস্তাবে রাজি হবার মতো মানসিক অবস্থা কুন্তীর না থাকায় পাণ্ডু এমনভাবেই তাঁকে সমাজের ইতিহাস শোনাতে বসেছেন যেন অন্য পুরুষের সংসর্গ ব্যাপারটা কিছুই নয়। ঠিক এই কারণেই পুরুষান্তর সংসর্গের কঠিন সামাজিক অতিক্রমটিকে ভয়ঙ্করভাবে লঘু করে দিয়ে পাণ্ডু বললেন– সেকালেও তোত বিয়ে হত। কিন্তু বিয়ের পরেও মেয়েরা স্বামীকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত তাসাং ব্যুচ্চরমাণানাং কৌমারাৎ সুভগে পতীন্। আর জান তো– এতে কোনও অধর্মও হত না, কেন না সেকালে ওটাই ধর্ম ছিল– স হি ধর্মঃ সনাতনঃ।
মনুষ্য সমাজের বাইরে পশু-পক্ষীদের মধ্যে এই রীতি এখনও চালু আছে– পাণ্ডু সেটারও উল্লেখ করলেন। কিন্তু পশু-পক্ষীর ইনস্টিটিভ আচার দিয়ে তো আর মানুষের আচার ব্যাখ্যা করা যায় না। অতএব স্ত্রীলোকের স্বাধীনতা কবে কোথায় কেমনটি ছিল সে সব প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন পাণ্ডু। পাণ্ডু বললেন– মেয়েরা যে স্বামী ছাড়াও অন্য পুরুষের সংসর্গ করতে পারে–স্ত্রীলোকের এই স্বাধীনতাটুকু মহা-মহা-ঋষিরাও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং এই ব্যবহার তারা অপছন্দ করেননি–প্রমাণদৃষ্টো ধর্মোয়ং পূজ্যতে চ মহর্ষিভিঃ! অপছন্দ যে করেননি, তার কারণও আছে। কারণ সমাজের স্ত্রীলোকেরাই শুধু এই সামাজিক বন্ধনের মধ্যে অবসন্ন হবেন কেন? পুরুষ মানুষেরা তো ইচ্ছে করলেই অন্য স্ত্রীর সংসর্গ করতে পারেন, সেখানে স্ত্রীলোকেরাই বা কেন শুধু একতম পুরুষের বাহুপাশে আবদ্ধ হবেন? তাদেরও তো মুক্তির প্রয়োজন আছে। এই প্রথায় যেহেতু স্ত্রীলোক তার পতি ছাড়াও অন্য পুরুষের ভজনা করতে পারেন, অতএব এই প্রথা স্ত্রীলোকের প্রতি এক ধরনের অনুগ্রহের মতো। ঋষিরা তাই এটাকে ধর্মসঙ্গতই মনে করেছেন স্ত্রীণামনুগ্রহকরঃ স হি ধর্মঃ সনাতনঃ।
অনুগ্রহ শব্দটার মধ্যে একটু দয়ার ভাব আছে বটে, তবে এই শ্লোকে দয়ার কোনও অর্থ নেই। আসলে পাণ্ডু বোঝাতে চাইছেন যে, স্ত্রীলোকের স্বাধীনতা বা লিবার্টির বিষয়টাও এখানে যথেষ্ট প্রণিধানযোগ্য। পাণ্ডু যে সময়ে এই কথা বলেছেন, তখনও স্ত্রীলোকের এত স্বাধীনতা ছিল না। এমনকি আধুনিক যুগেও এত স্বাধীনতা স্ত্রীলোকের কাম্য কিনা এবং এতটা স্বাধীনতা প্রগতিবাদী রমণীরাও মেনে নেবেন কিনা, তাতে আমাদের বিলক্ষণ সন্দেহ আছে। তবে এ বিষয়েও কোনও সন্দেহ নেই যে, পাণ্ডুর উচ্চারিত স্বাধীনতা সুশৃঙ্খল সমাজ–গঠনের পূর্বেকার স্বাধীনতা এবং পাণ্ডু এই স্বাধীনতার কথা বলছেন নিজের অসামর্থ্যের প্রতিক্রিয়ায়। এমনকি বেদে যেমনটি পাই সেইরকম স্বাধীনতাও এটা নয়। এ স্বাধীনতা প্রায় আদিম পর্যায়ের যখন সমাজ এবং সম্পত্তির বোধ তত প্রখর ছিল না। পাণ্ডু একটি দেশের নাম করে বলেছেন–উত্তরেষু চ রম্ভোরু কুরুঘদ্যাপি পূজ্যতে– এখনও উত্তরকুরু দেশে স্ত্রীলোকের এই স্বাধীনতা আছে। তারা স্বামী ছাড়াও অন্য পুরুষের সংসর্গে দ্বিধা বোধ করে না।
