পাণ্ডু কুন্তীর কাছে শারদণ্ডায়নীর উপাখ্যান বলে তাঁকে ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদন করার ব্যাপারে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেন। কুন্তী তাতে একটুও প্ররোচিত হন না এবং স্বামী ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সংসর্গে তিনি আপত্তি প্রকাশ করেন। শারদণ্ডায়নীর উপাখ্যান শুনে প্রত্যুত্তরে তিনিও একটি উপাখ্যান শোনান পাণ্ডুকে। এই উপাখ্যান আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডুর প্রতি কুন্তীর একান্ত নিষ্ঠার কথা জানতে পারি। পিতৃগৃহের প্রথম যৌবনে যে কলঙ্কের ঘটনা ঘটে গিয়েছিল, তারই প্রতিক্রিয়া লক্ষিত হবে এই ঐকান্তিকতার মধ্যে। কুন্তীর পূর্ব এবং ভবিষ্যৎ জীবনে যে সমস্ত দেবতা তার শরীর স্পর্শ করেছেন এবং করবেন, সেই স্পর্শের ইতিহাস লঘু হয়ে যাবে স্বামীর প্রতি কুন্তীর ঐকান্তিকতার নিরিখে।
কুন্তীর জীবনে সামাজিক অতিক্রম থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন পঞ্চসতীর মধ্যে অথবা নিত্য-স্মরণীয়া পঞ্চ-কন্যার মধ্যে অন্যতমা বলে মনে করা হয়, তার কারণ এই নিষ্ঠা। পূর্বজীবনে যা হয়ে গেছে, তা অতীতের বিভীষিকা মনে করে এখন তিনি আজীবন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চান। তাঁর সতীত্বের নিষ্ঠা এইখানেই।
কুন্তী প্রিয় স্বামী পাণ্ডুকে বললেন–মহারাজ! আমাদের এই পুরুবংশেই ব্যুষিতাশ্ব বলে এক পরম ধার্মিক রাজা ছিলেন–পুরা পরমধর্মিষ্ঠঃ পুরোবংশবিবর্ধনঃ। তিনি এমন বিরাট যজ্ঞ করেছিলেন যে, সেখানে দেবতা এবং ব্রহ্মর্ষিরাও যজ্ঞকার্যে নিযুক্ত হয়েছিলেন–দেবা ব্ৰহ্মাৰ্যয়শ্চৈব চকুঃ কর্ম স্বয়ং তদা। তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞ করে সমস্ত রাজাদের আপন পরাক্রমে পরাভূত করেছিলেন। এই ব্যুষিতাশ্ব রাজার প্রিয় পত্নী ছিলেন কাক্ষীবান রাজার মেয়ে কাক্ষীবতী ভদ্রা। তিনি পরমা সুন্দরী ছিলেন এবং তার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এবং কামনায় রাজা ব্যুষিতাশ্ব যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলেন। সূর্য অস্ত গেলে যেমন নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন, অতিরিক্ত সম্ভোগ-তাড়নায় রাজাও তেমনই নিষ্প্রভ হয়ে অল্পদিনের মধ্যে মারা গেলেন। প্রিয় স্বামীর মৃত্যুতে ভদ্রা চরম শোকগ্রস্ত হলেন এবং স্বামীর শবদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন।
মহাভারতে ভদ্রার এই বিলাপের অংশ অন্তত বারটি শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে, যা কুন্তীর বক্তব্যের মধ্যে ছিল। আমরা এই বিলাপোক্তির মধ্যে যাচ্ছি না। আসল কথা হল– কাক্ষীবতী ভদ্রার জীবন ছিল তাই অসম্পূর্ণ। অন্য পুরুষের সংসর্গে পুত্রোৎপাদন করতে তিনি রাজি নন। তিনি স্বামীর শবদেহ আঁকড়ে বসে রইলেন। ব্যুষিতাশ্বের মৃত আত্মার উদ্দেশে ভদ্রা বললেন– তোমাকে দেখা দিতেই হবে এবং এই অবস্থায় আমি কী করব, তাও তোমাকে বলে দিতে হবে– দর্শয়স্ব নরব্যাঘ্র শাধি মাম্ অসুখান্বিতাম্। ভদ্রা শব-শরীর আগলে রইলেন দৃঢ়ভাবে।
ভদ্রার আকুতি দেখে শেষ পর্যন্ত দৈববাণী নেমে এল মৃত ব্যষিতাশ্বের প্রেতলোক থেকে। তিনি বললেন তুমি ঘরে যাও, ভদ্রে। নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে যাও। মনে রেখো–আর কেউ নয়, আমিই তোমার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করব– জনয়িষ্যাম্যপত্যানি ত্বয্যহং চারুহাসিনি। ব্যুষিতা আরও বললেন–সুন্দরী আমার! তোমার ঋতুদর্শন ঘটুক, তারপর চতুর্দশী বা অষ্টমী তিথিতে তোমার শয্যাতেই তোমারই সঙ্গে মিলিত হব আমি আত্মকীয়ে বরারোহে শয়নীয়ে… ময়া সহ। মৃত স্বামীর কথা শুনে ভদ্রা ঘরে গেলেন এবং যথোক্ত দিনে স্বামীর সঙ্গে পুনর্মিলন হল তাঁর। সেই মৃত স্বামীর সংসর্গেই– সাভন সুষুবে দেবী শবেন ভরতভ তার অন্তত সাতটি পুত্র হল। এঁদের মধ্যে তিনজন শাশ্বদেশের অধিবাসী এবং চারজন মদ্রদেশের অধিবাসী।
ব্যুষিতাশ্ব এবং ভদ্রার কাহিনী পাণ্ডুকে শুনিয়ে শেষে তার সিদ্ধান্ত জানালেন কুন্তী। বললেন–মহারাজ! তুমি তো বুযিশ্বের মতো মৃত ব্যক্তি নও এবং তুমি যথেষ্ট তপোবল এবং যোগবলের অধিকারী। অতএব সেই তপস্যা এবং যোগের শক্তিতে আমার গর্ভে মানস পুত্র উৎপাদন কর তুমি– তথা ত্বমপি মায্যেবং মনসাপি নরর্ষ শক্তো জনয়িতুং পুত্রান…।
কুন্তীর এই কাহিনীর পর কথা–উপকথা আসবে। মহাকাব্য রচনার রীতিই তাই। পাণ্ডু শারীরিক সমস্যার মধ্যে পড়েছেন, কুন্তী সামাজিক সমস্যায় পড়েছেন। এই সমস্যার আশু সমাধান করে ক্ষণিকের মধ্যেই তার মূল কথাচক্রে ফিরে আসতে পারেন না মহাভারতের কবি। সামাজিক সমস্যা মেটানোর জন্য, তাকে যথাশক্তি যুক্তিযুক্ত করে তোলার জন্যই এই উপাখ্যান-পরম্পরা। এই উপাখ্যানগুলির মাধ্যমেই একদিকে যেমন মহাভারতীয় চরিত্রগুলির প্রকৃতি বুঝে নেওয়া যাবে, তেমনই অন্যদিকে আস্তে আস্তে যা ঘটতে যাচ্ছে, সেটাও সযৌক্তিক হয়ে উঠবে।
মৃত স্বামীর উদাহরণ দিয়ে কুন্তী বোঝাতে চাইলেন–প্রিয় স্বামীর সংসর্গজাত সন্তান ছাড়া, অন্য কোনওভাবেই তিনি সন্তান কামনা করেন না। আমরা জানি–ব্যুষিতা এবং ভদ্রার কাহিনীর মধ্যে অলৌকিকতাই বেশি। মৃত স্বামীর ঔরসে পুত্র লাভ করার মধ্যে এক মহান অতিবাদ আছে। কিন্তু সময় বিশেষে অতিবাদেরও কার্যকারিতা আছে। আমরা যখন বলি– মৃত পিতার শ্রাদ্ধ করলে পিতার আত্মার শান্তি হয়, তার ঔরসজাত সন্তানের মঙ্গল হয়, তখন কিন্তু আমরা এই শ্রাদ্ধকর্মের অদৃষ্ট ফল চোখে দেখতে পাই না। কিন্তু শ্রাদ্ধ-শান্তির মধ্য দিয়ে সন্তানদের মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি নেমে আসে, সেই তৃপ্তিটুকু তত মিথ্যে নয়। নানা কৃচ্ছসাধন করে শ্রাদ্ধ-কর্ম সম্পাদন করে, পিতার তুষ্টির জন্য আত্মীয়স্বজনকে খাইয়ে দাইয়ে দায়ভাগী পুত্রেরা যে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন, হয়ত সেই তৃপ্তিটুকুই উপাখ্যানধর্মী অতিবাদের ফল।
