আরও একটা কারণ আছে এই না বলার পিছনে। যেটা উত্তরাধিকারের আইন সংক্রান্ত কথা। বার রকমের পুত্রের মধ্যে যে ছয় জন পিতার সম্পত্তিতে অধিকার লাভ করে তার মধ্যে কানীন পুত্রের স্থান নেই। মনু বলেছেন–পিতার ঘরে জন্মানো কন্যার পুত্র, মূল্যের দ্বারা লব্ধ পুত্র, অন্যের বিধবার পুত্র, গর্ভাবস্থায় বিবাহিতা রমণীর পুত্র এবং আরও এইরকম দুই ধরনের ছেলে পিতার সম্পত্তিতে অধিকার লাভ করে না।
কানীনশ্চ সহোঢ়শ্চ–ক্রীতঃ পৌনর্ভবস্ত থা।
স্বয়ংদত্তশ্চ শৌদ্রশ্চ ষডদায়াদবান্ধবাঃ।
সেকালের দিনে কুন্তীর মতো মনস্বিনী রমণীরা এই আইনের কথা জানতেন এবং হয়ত সেই কারণেই তিনি তার কানীন পুত্রটির কথা বলেননি। তিনি ভেবে থাকতে পারেন পুত্র লাভের সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডু তার রাজকীয় উত্তরাধিকারও তো সেই পুত্রের হাতে দিয়ে যেতে চান। নইলে বার কিসিমের পুত্র–কল্প বোঝানোর সময় কোন ধরনের পুত্রেরা রাজ্যের অধিকার পাবে এবংঙ্গারা পাবে না– ইমে বৈ বন্ধুদায়াদাঃ… যড়ে অবন্ধুদায়াদাঃ– এই বিভাজনটি প্রথমেই উল্লেখ করে নিতেন না পাণ্ডু। সমাজ-স্বীকৃত পুত্রের তালিকা দেবার আগেই ধনাধিকারীর বিভাজন উল্লেখ করার মধ্যেই যেন এক সতর্কবাণী আছে, যেটা কুন্তীর মতো পোড় খাওয়া মহিলার অবোধ্য থাকার কথা নয়। এই নিরিখে কুন্তী তার কানীন পুত্রের কথা উল্লেখ করেও যদি দেখতেন পাণ্ডু তাকে হস্তিনাপুরের, উত্তরাধিকারীর মর্যাদা দিতে পারছেন না, তবে কুন্তীর মানসিক অবস্থাটা আরও জটিল হয়ে উঠত–মানও যেত, কার্যসিদ্ধিও ঘটত না।
কুন্তী-মাদ্রী পাণ্ডুর কথার উত্তরে কিছু বলেননি বলেই পাণ্ডু কোনও মহান পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কুন্তীকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে চাইলেন। পাণ্ডু বললেন– তুমি শারদণ্ডায়নীর নাম শুনেছ? তার গর্ভে সন্তান আসে না দেখে তাঁর স্বামী নিজের দোষ বুঝলেন এবং স্ত্রীকে বললেন তুমি ক্ষেত্রজ সন্তান লাভের চেষ্টা করো। স্বামীর আদেশ নিয়ে শারদণ্ডায়নী গর্ভধারণের উপযোগী উর্বর সময়ে রাস্তার চৌমাথায় গিয়ে এক যোগসিদ্ধ ব্রাহ্মণের সন্ধান পেলেন। শারদণ্ডায়নী পুত্রার্থিনী হয়ে তাকে বরণ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই যোগী পুরুষ হোম সমাপ্ত করে তার সঙ্গে মিলিত হলেন– কর্মণ্যবসিতে তস্মিন্ সা তেনৈব সহাবসৎ। এইভাবে শারদণ্ডায়নীর তিনটি বীর পুত্র জন্মলাভ করেছিল।
উপাখ্যান শেষ করে পাণ্ডু ক্ষেত্রজ পুত্রলাভে নিজের স্বীকৃতি জানিয়ে বললেন–আমার আদেশে তুমিও একজন উৎকৃষ্ট ব্রাহ্মণ-সজ্জনের সঙ্গে মিলিত হয়ে পুত্র লাভের চেষ্টা করো–মন্নিয়োগা যত ক্ষিপ্রম্ অপত্যোৎপাদনং প্রতি। অর্থাৎ ক্ষেত্রজ পুত্র লাভ করার জন্য গুরুস্থানীয় ব্যক্তিদের যে সম্মতি লাগে, সেই সম্মতি দিয়ে দিলেন স্বয়ং স্বামী।
কথাটা শুনে কুন্তীর যে খুব ভাববিকার হল তা নয়। পাণ্ডু যে পুত্রোৎপাদনে সত্যি সত্যিই অসমর্থতা তিনি জানতেনও না এবং মৃগমুনির অভিশাপেও যে তিনি খুব বিশ্বাস করেছেন, তাও বোধহয় নয়। অন্তত তার কথা শুনে পরিষ্কার বোঝা যায় পাণ্ডুর অসামর্থ্য সম্বন্ধে তার কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কুন্তী শীতলভাবে পাণ্ডুকে বললেন– এমন করে বোলোনা, রাজা– ন মামহসি ধর্ম বমেবং কথঞ্চন। ধর্মের তত্ত্ব, তুমি ভালই জান এবং আমরাও তোমার ধর্মপত্নী। তোমাকে ভালবাসার ক্ষেত্রেও কোনও ঘাটতি নেই আমাদের। সেখানে আমার কাছে এমন একটা প্রস্তাব তুমি করলে কেমন করে–ধর্মপত্নীমভিরতাং ত্বয়ি রাজীব-লোচন।
কুন্তী নিজের বাল্য চপলতায় সূর্যের শয্যা-সঙ্গিনী হয়েছিলেন, সে কথা মনে রেখেও স্বামীর প্রতি চিরন্তন প্রত্যয়ে তাকে উৎসাহিত করে বললেন– মহারাজ! আমার গর্ভে তুমিই তোমার পুত্রের জন্ম দেবে– ত্বমেব তু মহারাজ ময্যপত্যানি ভারত। তোমার শক্তিতেই আমার গর্ভে তোমার বীর পুত্রের জন্ম হবে– বীরবীর্যোপপন্নানি ধর্মততা জনয়িষ্যসি।
স্পষ্ট বোঝা যায়– মৃগ-মুনির শাপের কোনও বিশ্বস্ততা নেই কুন্তীর কাছে। শক্তিহীন স্বামী যেমন করে পুত্র লাভের চেষ্টা করে পাণ্ডু সেইভাবেই এতকাল চেষ্টা করেছেন। সন্তান-জন্ম বিফল হয়ে যাওয়ায় এখন আর তিনি নিজেকে বিশ্বাস করছেন না। কিন্তু কুন্তী সাধ্বী স্ত্রীর মতো স্বামীর প্রতি অনন্ত মায়ায় তাকে পুনরায় পুত্রলাভে উদযুক্ত করে বলছেন– সন্তানের জন্য আবারও তুমি আমাতে উপগত হও–অপত্যায় চ মাং গচ্ছ ত্বমেব কুরুপুঙ্গব আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে মনে মনেও সংসর্গ করতে রাজি নই। আর তাছাড়া আমার স্বামীর চেয়ে বড় মানুষ আর কে আছে এই পৃথিবীতে ত্বত্তঃ প্রতিবিশিষ্ট কোনো স্তি ভুবি মানবঃ।
কোনও উত্তম উৎকৃষ্ট পুরুষের সংসর্গে পুত্র লাভ করার জন্য পাণ্ডু উপদেশ দিয়েছিলেন কুন্তীকে। কুন্তী পাণ্ডুর চেয়ে অন্য কোনও উৎকৃষ্ট পুরুষে বিশ্বাস করেন না। এই মুহূর্তে মৃগমুনির শাপের কোনও জ্ঞানই কুন্তীর বাক্যে উল্লেখিত না থাকায় এই অভিশাপ একান্তই ভিত্তিহীন মনে হচ্ছে। শুধু যেটা হতে পারে– পাণ্ডু পুত্রোৎপাদনে অসমর্থ– সেটাও কুন্তীর কাছে এখনও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি, পাণ্ডু বললেও হয়নি। পুত্র লাভের ব্যাপারে এখনও তিনি স্বামীর ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখেন।
০৮০. শারদণ্ডায়নীর উপাখ্যান
৮০.
