সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য একথাও জানাতে হবে যে, সে কালের প্রাচীনেরা আধুনিকের থেকেও বেশ খানিকটা আধুনিক ছিলেন। বিবাহিতা স্ত্রীর গর্ভে জাত ঔরস পুত্র ছাড়াও অন্য যে পুত্রেরা পিতার ধনের অধিকারী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয় হলেন ক্ষেত্রজ। অর্থাৎ নিজের স্ত্রীর গর্ভে অন্য কোনও উত্তম পুরুষের দ্বারা উৎপাদিত নিয়োগজাত পুত্র। অন্য মাতা-পিতার কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য দিয়ে পুত্রহীন পিতা-মাতা যদি পুত্র ক্রয় করেন, তবে সেই পরিক্রীত শিশুটিও পিতার পুত্র বলে পরিচিত হবে। পতি-পরিত্যক্ত বা অন্যের বিধবার গর্ভে যদি কেউ পুত্রলাভ করেন, তবে সেই পুত্রের বিশেষণ হল পৌনৰ্ভব পুত্র। পিতার ঘরে কন্যা-অবস্থায় যে মাতা পুত্র লাভ করেছিলেন, সেই কানীন পুত্রও শাস্ত্রের নিয়মে বিবাহিত পতির পুত্র বলে পরিচিত হবেন। এই তালিকার শেষে আছেন–গৃঢ়েৎপন্ন পুত্র। যিনি বিবাহ করেছেন সেই পুরুষের স্ত্রী যদি স্বৈরিণী হয়ে যান এবং আপন স্বেচ্ছাচারিতায় অন্য পুরুষের পুত্র গর্ভে ধারণ করেন তবে সেই পুত্রের ব্যাপারে বিবাহিত পুরুষটির কোনও জ্ঞান না থাকলেও সে যেহেতু তারই ঘরে জন্মেছে, অতএব তাকে পুত্র বলেই মেনে নিতে হবে এবং সেও পিতৃ ধনের অধিকারী হবে।
সমাজ-স্বীকৃত পুত্রেরা কিন্তু মাত্র ছ-রকমের নয়, বার রকমের। অবশিষ্টরা হল– দত্তক পুত্র, অপবিদ্ধ, কৃত্রিম (যাকে পুত্রের মতো মানুষ করা হয়) স্বয়ংদত্ত, সহোঢ় ও শৌদ্র (পারশব)। এদের মধ্যে সবাই যে পিতার সম্পত্তি পাবে তা নয়। তবে ঔরস পুত্র ছাড়াও ক্ষেত্রজ, দত্তক, কৃত্রিম, অপবিদ্ধ (যাকে মূল্য দিয়ে ক্রয় করা হয়েছে। এমনকি গূঢ়েৎপন্ন স্বৈরিণী-পুত্রও পিতার ধনে অধিকারী– যদিও সেই অধিকার প্রথম প্রকার পুত্রের অভাবে পর পর জনের–
ঔরসঃ ক্ষেত্ৰজশ্চৈব দত্তঃ কৃত্রিম এব চ।
গূঢ়োৎপন্নোপবিদ্ধশ্চ দায়দা বান্ধবাশ্চ ষট্।
পাণ্ডু কুন্তীকে সমাজ-সম্মত পুত্রের তালিকা শোনালেন এবং সবার শেষে জানালেন আপৎকালে একটি স্ত্রীলোক অন্য কোনও বড় মানুষের কাছ থেকেও তো পুত্র লাভ করতে পারে, এমনকি এই সময়ে দেবরের কাছ থেকেও পুত্র লাভ করে–উত্তমা দেবরাৎ পুংসঃ কাক্ষন্তে পুত্রমাপদি। আপন বংশের ধারাটা তো তাতে বজায় থাকল। মুখ ফুটে আর বলা গেল না যে, সম্পত্তিটাও তো তাতে নিজের ঘরেই থাকল। এতক্ষণ তত্ত্ব নীতি, সামাজিক প্রচলনের কথা বলে পরিশেষে পাণ্ডু কুন্তীকে অনুরোধের সুরে বললেন– তুমি তোমার মর্যাদার অনুরূপ অথবা তোমার চেয়েও মর্যাদায় বড় মানুষের ঔরসেই না হয় পুত্র লাভ করার চেষ্টা। করো–সদৃশাচ্ছেয়সঃ বা ত্বং বিন্দাপত্যং যশস্বিনি।
পাণ্ডুর মুখে সমাজ-স্বীকৃত বার রকমের পুত্রের কথা শুনে এবং পাণ্ডুর মনোগত ইচ্ছা বুঝে এই মুহূর্তে কুন্তী কিন্তু হাত তুলে বলতে পারতেন–তোমার কোনও চিন্তা নেই। আমার কন্যাবস্থায় পিতৃগৃহে যে কানীন পুত্রের জন্ম দিয়েছিলাম, তাকেই তুমি নিজ পুত্রের মর্যাদায় প্রতিপালন করো। পাণ্ডু যখন সমাজ-স্বীকৃত পুত্রের তালিকায় কানীন শব্দটি উচ্চারণ করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে মহাভারতের টীকাকারেরা কিন্তু বলেছেন–কানীন পুত্র পরিণয় সম্বন্ধযুক্ত পুরুষটির পুত্র বলেই স্বীকার করতে হবে এবং সেই সম্বন্ধে ভবিষ্যতের কর্ণও পাণ্ডুরই পুত্র, তিনিও পাণ্ডব– কানীন–স্তকন্যা–পরিণেতুরেব পুত্রঃ। এবঞ্চ কর্ণঃ পাণ্ডোরেব পুত্র আসীদিতি বোধ্য।
এই মুহূর্তে পাণ্ডুর মনের অবস্থা যা ছিল, তাতে কুন্তী যদি তার কন্যাবস্থার চপলতাটুকু বর্ণনা করে পাণ্ডুর কাছে ক্ষমা চেয়ে বলতেন– কোনও উত্তম পুরুষ নয়, এক উত্তম দেবতা এই পুত্রের জনক, তাহলে কোনও সন্দেহ নেই পাণ্ডু সাগ্রহে কুন্তীর প্রস্তাব মেনে নিয়ে রাজরানীর প্রথম সন্তানটিকে খুঁজতে পাঠাতেন। কিন্তু কুন্তী তার কানীন পুত্রের সংবাদ তার প্রিয় স্বামীর কাছে নিবেদন করলেন না। সেটা আমাদের সৌভাগ্যও বটে, দুর্ভাগ্যও বটে।
সৌভাগ্য এইজন্য যে, তাতে ভবিষ্যতে কর্ণকে নিয়ে মহাকাব্যের অনন্ত রস সৃষ্টি হত না। এই সামান্য এক অস্বীকৃতির ফলে কুন্তী এবং কর্ণের মধ্যে যে জটিল মনস্তত্ত্বের অবসর রয়ে গেল, বাৎসল্য, বীর এবং করুণ রসের যে বৈচিত্র্য ভবিষ্যতের উপকরণ হিসেবে ভোলা থাকল, তা মহাকাব্যের কবি হিসেবে দ্বৈপায়ন ব্যাস এখনই তরল করে দেন কী করে। কুন্তী যদি কর্ণের কথা বলতেন, তা হলে মহাকাব্যের বিষয় হত সোজা, সরল, বর্ণহীন। কর্ণ রাজা হতেন আর হস্তিনাপুরের রাজনীতি বয়ে চলত আর পাঁচটা রাজ্যের মতো সরল গড্ডলিকায়। ভবিষ্যতে মহামতি কর্ণের পরিণতিতে নিশ্চয়ই আমরা দুঃখ পাব, কিন্তু এই দুঃখটুকু না পেলে মহাকাব্যের অভীষ্ট থেকেই আমরা বঞ্চিত হতাম। সেটা কি ভাল হত?
অবশ্য কুন্তী যে এই মুহূর্তে পাণ্ডুর কাছে তার সমস্ত অতীতকে প্রচ্ছন্ন রেখে দিলেন, তার দুটি কারণ আছে। প্রথম কারণ, শৈশব কাল থেকে তার বিবাহ পর্যন্ত নানা দুঃখে আকীর্ণ হয়ে আছে তার জীবন। পিতার ঘর ছেড়ে এসে অন্যের ঘরে পালিত হওয়ার দুঃখও তিনি ভুলতে পারতেন, কিন্তু বিবাহের পূর্বাধ্যায়ে তার প্রথম যৌবনেই যে সৌর কলঙ্ক নিজের শরীরে বহন করলেন, তিনি তা সামাজিক দৃষ্টিতে আদরণীয় নয় বলেই প্রিয় স্বামীর কাছে কুন্তী বলতে পারেননি। সব জায়গায় দুঃখ পেয়ে অন্তত স্বামীর ঘরে তিনি সুখ পেতে চেয়েছিলেন। স্বামীর কাছে সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত থাকার জন্যই তোক অথবা স্বামী যদি এতকাল পরে এই অবৈধ-প্রসূতির কথা শুনে দুঃখ পান, সেই ভয়েই কুন্তী পাণ্ডুকে কিছু বলেননি। আসলে কুন্তী নিজেই অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রকৃতির মানুষ। পাণ্ডু নিজেই যেখানে কানীন পুত্র অথবা গূঢ়েৎপন্ন স্বৈরিণী পুত্রকেও নিজের পুত্র হিসেবে মেনে নিতে চাইছেন, সেখানে কুন্তী তার কানীন পুত্রের কথা বললে পাণ্ড যে মেনে নিতেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কুন্তী নিজের মধ্যেই এত জটিলতা বহন করছেন, এতই তিনি সংবেদনশীল যে, কোনও কারণে তার প্রিয় স্বামী যদি তাকে অবিশ্বস্ত মনে করেন, তাহলে তো সে দুঃখ আর তর সইবার উপায় থাকবে না।
