বস্তুত নাগ-তপস্বীদের দেওয়া ফলের মধ্যে তক্ষক কৃমিকীট হয়ে লুকিয়ে ছিলেন– এ কথা তত আদরণীয় নয়। ঘটনার গতি প্রকৃতি দেখে অনুমান হয়–তপস্বী মুনি-ঋষির ভেকধারী অন্য অনুচর নাগদের মধ্যেই স্বয়ং তক্ষকই লুকিয়ে ছিলেন। একুট সুমিষ্ট ফলের বাইরের আকার দেখে ফলান্তগত কীটের যেমন সন্ধান পাওয়া যায় না, তেমনই সজ্জন সাধুর বেশধারী নাগ মুনি-ঋষিদের আপাত শান্ত আকৃতির মধ্যও তক্ষককে মোটেই চেনা যাচ্ছিল না। দিনের শেষবেলায় পরীক্ষিত উত্তেজিত; কিন্তু হয়নি, কেউ তাকে কিছু করতে পারেনি তাই তিনি হাসছেন-মৃত্যুর লক্ষণাঙ্কিত বোধ-বুদ্ধিহীন হাসি। মহাভারতের বর্ণনায় রূপক থেকে পুরাণকারেরা, বিশেষত ভাগবত-পুরাণের কবি আসল ঘটনাটা ঠিক ঠিক বার করে এনেছেন। সুমিষ্ট ফল অথবা ফলান্তৰ্গত কীটের কথা কবি উল্লেখও করেননি। তিনি একটি মাত্র দৃঢ় নিবদ্ধ পংক্তিতে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন–শৃঙ্গী মুনি তক্ষককে লাগিয়েছিলেন পরীক্ষিতকে মেরে ফেলার জন্য এবং তক্ষক সোজা ব্রাহ্মণ ঋষি মুনির ছদ্মবেশ ধারণ করে পরীক্ষিতের সামনে এসে তাকে দংশন করলেন–
তক্ষকঃ প্রহিতো বিপ্রাঃ ক্রুদ্ধেন দ্বিজ-সুনুনা।
দ্বিজরূপ প্রতিচ্ছন্নঃ কামরূপো’দশনুপম।
এটা দংশন, না আকস্মিক অস্ত্রাঘাত, তা সুধীজনেরা বিচার করুন তবে আমার মত ইতিহাস এবং নৃতত্তের বিশ্বসে এটাকে অস্ত্রাঘাত বলেই মনে করে। মনে রাখবেন–ভারতের চিরন্তন নীতিশাস্ত্রে সর্পের সব সময় খল জনের তুলনা দেওয়া হয়েছে। সর্পঃ ক্রঃ সপাৎ ক্রুরতরঃ খলঃ–এ সব সাধারণ নীতি উপদেশের কথা ছেড়েই দিলাম, এখানে অন্তত পনেরো থেকে কুড়িটা সংস্কৃত সুক্তিরত্ন আমি সাজিয়ে দিতে পারি যেখানে খলজনের সাজাত্যে সর্পের তুলনা এসেছে। তক্ষকও এই রকম এক খল প্রকৃতির ক্র মানুষ। পাণ্ডব বংশের ওপর তার ক্রোধ ছিল বহুদিনের। সেই যেদিন খাণ্ডব বন দহন করে অর্জুন তাকে স্থান–ষ্ট করেছিলেন, ততদিনের ক্রোধ। যদিও অর্জুন বেঁচে থাকতে তিনি কিছুই করতে পারেননি, কিন্তু অর্জুন মহাপ্রস্থানে যেতেই, তিনি তার সময় সুযোগ খুঁজছিলেন। এই অবসরে শৃঙ্গী মুনির পিতার কাছে কোনও কারণে পরীক্ষিতের অপরাধ ঘটে যাওয়ায় তক্ষক সেই সুযোগ পান।
শৃঙ্গী নিশ্চয় তক্ষকের সঞ্চিত ক্রোধের কথা জানতেন এবং তিনি সোজাসুজি তাকে নিযুক্ত করেন পরীক্ষিতকে মেরে ফেলার জন্য। নইলে মহাভারতের অন্যত্রও আমরা অনেক অভিশাপ শুনতে পাব। তাতে দেখবেন–তুই এই করেছিস, তোর এই, হবে, সেই হবে ইত্যাদি এইরকমই অভিশাপের নমুনা। কিন্তু এখানে শৃঙ্গী মুনির কথা কত পরিষ্কার, সে কথার কত জোর–আজ থেকে সাতদিনের মাথায়. তক্ষক সেই রাজাকে যমের বাড়ি নিয়ে যাবে এবং তা আমার বাক্যে, আমার কথায় প্ররোচিত হয়ে মাক্যবলচোদিতঃ। পুরাণ কথায় ভাগবতে, তো শৃঙ্গী মুনির কাজটা আরও পরিষ্কার। ক্রুদ্ধ মুনির দ্বারা প্রেরিত হয়ে তক্ষক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধরে এলেন পরীক্ষিতকে দংশন করতে প্রহিতো দ্বিজসূনুনা। আরে! ব্রাহ্মণ কি আর দংশন করে? খল এবং কুরপ্রকৃতির লোকই সাধু সেজে এসে পেছন থেকে ছুরি মেরেছে পরীক্ষিতকে। আজকের দিনে, নিজে যে পারে না, সে যেমন মাস্তান দিয়ে মার খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে, মাডারের ব্যবস্থা করে, তেমনই এখানেও নাগরাজ তক্ষক তার পুরনো হিস্যা’ মিটিয়ে নিলেন, যদিও তার নিমিত্ত হয়ে রইলেন শৃঙ্গী মুনি।
শৃঙ্গীর পিতা শমীক পান্ডব বংশের রাজত্বের অনুগামী। তিনি একদিকে পুত্রের অভিশাপের অনিবার্যতা স্বীকার করছেন। (কারণ তক্ষক তখন কাজে লেগে গেছেন–) আবার অন্যদিকে পরীক্ষিতের কাছে শিষ্য পাঠিয়ে তাকে সাবধান করছেন; খল সর্পের আঘাত থেকে বাঁচবার জন্য তাকে আত্মরক্ষার উপায় অবলম্বন করতে বলছেন। অভিশাপ যদি অনিবার্য হয়, তবে আত্মরক্ষার উপায় বৃথা, অন্তত তৎকালীন দিনের অভিশাপের মনস্তত্ত্ব তাই বলে। অথচ শমীক পরীক্ষিতকে আত্মরক্ষা করতে বলছেন। তার মানে, পুত্রের অভিশাপের অনিবার্যতার থেকেও তক্ষকের চোরাগোপ্তা আক্রমণের বাস্তবটুকু এখানে বেশি বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ। শৃঙ্গী-পিতা শমীক-মুনির পরস্পরবিরোধী কথা দুটি এবং পরীক্ষিতের দিক থেকে আত্মরক্ষার প্রবল চেষ্টা –এই দুটি ব্যবহারই বিপরীত দিক থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, নাগ। জনজাতির অন্যতম নায়ক ব্রাহ্মণ-সমাজের একাংশের অনুমোদন লাভ করে নিজের প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করেছেন মাত্র। রূপক-প্রিয় মহাকবি পরীক্ষিতের অপরাধ, ব্রাহ্মণের অভিশাপ আর বিষবাহী তক্ষক–দংশনের উপন্যাসে যে অসাধারণ গল্পটি লিখেছেন, তার মধ্যে ঐতিহাসিকের টিপ্পনি শুধু এক জায়গাতেই। তা হল–এই মাত্র পরীক্ষিতের এক স্তম্ভলম্বী রাজসভায় যে রাজনৈতিক খুনটি হয়ে গেল, তাতে অর্জুনের একান্ত আত্মবংশ পরীক্ষিত মারা গেলেন, এবং তাতে নাগরাজ তক্ষকের ব্যক্তিগত ক্রোধও কিছুটা শান্ত হল বটে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে নাগ-গোষ্ঠী বা জনজাতির ওপর এই খুনের প্রভাব পড়ল অন্যরকমভাবে। রক্তের বদলে রক্ত- আর্যগোষ্ঠী রক্তের বদলায় মেতে উঠলেন।
পরীক্ষিত মারা যেতেই ব্রাহ্মণেরা পরীক্ষিতের মন্ত্রী এবং পুরবাসীদের সঙ্গে একজোট হয়ে তার উপযুক্ত পুত্র জনমেজয়কে সিংহাসন বসালেন। জনমেজয় যখন পিতার সিংহাসনে বসেন, তখন তার বয়স অল্প। যদিও মহাভারতের কবি তাঁকে একেবারেই শিশু বলেছেন, তবে নিতান্ত শিশুটিই তিনি ছিলেন না। সিংহাসনে বসার কিছুকালের মধ্যেই তার বিয়ে হয়। তার স্ত্রীর নাম বপুষ্টমা। জনমেজয়ের এই অতীব স্পৃহণীয়া হৃদয়হারিণী পত্নীর সম্বন্ধে এখনই কোনও কথা বলছি না। যদি প্রসঙ্গ আসে, তবে সে আলোচনা পরে আসবে। আপাতত এইটুকুই জানাই–সিংহাসনে বসার সময়ে পিতার আকস্মিক মৃত্যু সম্বন্ধে তত সচেতন ছিলেন না এবং উপযুক্ত বয়স না হওয়া পর্যন্ত মন্ত্রী-ব্রাহ্মণেরাও তাকে তেমন করে কিছুই অবহিত করেননি। তাই বলে মন্ত্রীরা পরীক্ষিত-হন্তা তক্ষকের কথা ভুলে বসেছিলেন, তা নয়। আমরা জানি যে, জনমেজয় রাজা হয়ে এক সময় তক্ষশিলা জয় করতে গিয়েছিলেন এবং তারও আগে-পাঠক। স্মরণ করুন সেই কুকুরীর অভিশাপের কথা। কুকুরীর অভিশাপ মোচনের জন্য জনমেজয়। যাকে পৌরোহিত্যে বরণ করেন, সেই সোমশ্র ব্রাহ্মণ ঋষি কতবার ঔরস পুত্র বটে তবে। তার মা ছিলেন নাগ জাতীয়া। জনমেজয় তক্ষক নাগের হাতে পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে থাকবেন। তাই কুকুরী যখন অভিশাপ দিল- তোমারও ওপর ভয় নেমে আসবে অতর্কিতে– তখন জনমেজয় আবারও সপঘাতের কথাই ভেবেছেন হয়তো। অন্তত পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে নাগ জনজাতির সঙ্গে যে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শক্রতা আরম্ভ হয়েছিল তারই নিরিখে জনমেজয় এমন একজনকে চিরন্তন পৌরোহিত্যে নিয়োগ করলেন, যাঁর ঘনিষ্ঠ মেলা মেশা আছে নাগ জনজাতির সঙ্গে।
