আধুনিকদের এই যুক্তি পাণ্ডুর মনস্তত্ত্বে একেবারেই যে অপ্রযোজ্য, তা আমরা মনে করি না। একটা কথা মনে রাখতে হবে, ধৃতরাষ্ট্র পত্নী গান্ধারী যে, মহামতি ব্যাসের কাছে শত পুত্র লাভের বর লাভ করেছেন এবং তিনি যে ধৃতরাষ্ট্রের সন্তান গর্ভে ধারণ করেছেন– এ খবর পাণ্ডুর কাছে নিশ্চয়ই পৌঁছেছিল, কারণ ধৃতরাষ্ট্রের লোকেরা যে মাঝে মাঝে পাণ্ডুর কাছে যেতেন, সে খবর আমরা আগেই পেয়েছি।
আগেই বলে রাখি, মহাভারতের কবি এ সব সন্দেহের কথা উচ্চারণও করেননি। সেখানে শুধু দেখেছি–গান্ধারী কুন্তীর আগেই ধৃতরাষ্ট্রের সন্তান ধারণ করেছিলেন– ততঃ কালেন সা গর্ভং ধৃতরাষ্ট্রাদথাগ্রহীৎ–কিন্তু নির্ধারিত প্রসবের সময় পার হয়ে যাওয়ায় কুন্তীর পুত্র জন্যে যায়। আমাদের সন্দেহ ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক গান্ধারীর গর্ভাধানের খবর পেয়েই পাণ্ডু বনে প্ৰব্ৰাজিত অবস্থাতেও পুনরায় পুত্র-সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। নিজের দ্বারা না হলেও, এখন যে অন্য কোনওভাবে তিনি পুত্র লাভের পরামর্শ চাইছেন মুনিদের কাছে, সে মনে হয় সবটাই ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক গান্ধারীর গর্ভাধানের সংবাদের ফল। নইলে যে মানুষ অপত্যহীনতার কারণে বানপ্রস্থ অবলম্বন করলেন, অন্যের ঔরসে নিজের স্ত্রীদের গর্ভে পুত্রলাভ যার কাছে কুকুরের মতো অবাঞ্ছিত, সেই মানুষ এখন মহর্ষিদের ডেকে বলছেন– আমি যেভাবে আমার পিতার স্ত্রীর গর্ভে বেদব্যাসের ঔরসে জন্মেছিলাম–যথৈবাহং পিতুঃ ক্ষেত্রে জাতস্তেন মহর্ষিণা– সেইরকম এখন কোন উপায়ে আমি আমার স্ত্রীদের গর্ভে পুত্র লাভ করতে পারি– তথৈবাস্মিন্ মম ক্ষেত্রে কথং বৈ সম্ভবেৎ প্রজাঃ?
মুনিরা পাণ্ডুকে অভয় দিয়ে বললেন– আমরা দিব্য-চক্ষে দেখতে পাচ্ছি–আপনার পুত্রলাভ হয়েছে। আপনি এখন করণীয় কর্মটি করে ঘটনাটি ঘটান–দৈববাৰ্দিষ্টং নরব্যঘ্র কর্মেণেহোপোদয়। তপস্বীদের কথা শুনেই পাণ্ডু তথাকথিত মৃগ–মুনির দুঃখকর অভিশাপের কথা স্মরণ করলেন। প্রজনন-কর্মটি যে-তার দ্বারা সম্ভব হবে না–জানমুপহতাং ক্রিয়া সেটা জানতেন বলেই পাণ্ডু এবার পাকাপাকিভাবে বিকল্প চিন্তায় মন দিলেন। অর্থাৎ সেই নিয়োগ। স্বামী যদি চান তবে নিয়োগ-কর্ম সে যুগে খুব সহজেই হতে পারত। কিন্তু সেখানে সমস্যা একটাই–আপন স্ত্রীদের পুরুষান্তরের সংসর্গে রাজি করাতে হবে। সে খুব সহজ কথাও নয়।
অনেক ভাবনা-চিন্তা করে কথাটা একদিন বিজনে বসে কুন্তীর কাছে পাড়লেন পাণ্ডু। একেবারে প্রাথমিক ভণিতা। বললেন–আমাদের বড় আপদ-কাল চলছে, কুন্তী। আমার নিজের পুত্র উৎপাদন করার ক্ষমতা নেই। এই বিপদে অন্য কোনওভাবে যদি আমি পুত্র-লাভ করতে চাই, তবে তুমি তা নিশ্চয়ই সমর্থন করবে, কুন্তী–অপত্যোৎপাদনে যত্নমাপদি ত্বং সমর্থয়। পাণ্ডু কুন্তীকে পুত্রহীনতার সমস্যা এবং দুঃখ– দুইই অনেক বুঝিয়ে নিজের অসামর্থ্যের কথাটাও বুঝিয়ে বললেন।
বস্তুত পাণ্ডু এই মুহূর্তে তার প্রজনন-শক্তি নষ্ট হওয়ার জন্য মৃগ মুনির অভিশাপকে যেমন দায়ী করলেন, তেমনই সঙ্গে সঙ্গে এও বুঝি স্বীকার করে নিলেন যে, পূর্বেও এই বিষয়ে তার বেশ কিছু সমস্যা ছিল। কুন্তীকে তিনি বলেছেন–আমি অশিক্ষিতই রয়ে গেছি, তাই এমন নৃশংস কাজ করেছি। মৃগ মুনির অভিশাপে আমার প্রজনন-ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে, অবশ্য পূর্বেও আমার এই ক্ষমতা খানিকটা দুর্বলই ছিল– মৃগাভিশাপান্নষ্টং মে… যথৈবোপহতং পুরা। মহাভারতের টীকাকারেরা এই শ্লোকের অর্থ এমনভাবেই করার চেষ্টা করেছেন যাতে মনে হয়–মুনির অভিশাপেই পাণ্ডুর এই অবস্থা, আদতে তিনি ক্লীব ছিলেন না। যেটা খারাপই ছিল– যথৈব উপহতং পুরা– সেটা নষ্ট হয়ে গেছে– সোজাসুজি এই শ্লোকার্থ গ্রহণ না করে টীকাকারেরা বলেছেন– মৃগমুনির শাপে প্রজনন-ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে, তার মধ্যে এসে জুটেছে মরণের ভয়। সেই ভয়েই পাণ্ডুর দিক থেকে আর রতি ক্রিয়ার অবকাশ নেই। এটা শুধু অভিশাপের ভয়, পাণ্ডু নিশ্চয় ক্লীব ছিলেন না– নষ্ট অসদ্ৰপং জাতং জননং স্ত্রীসঙ্গাখ্যং রতিকর্ম, যত উপহত, যথা মৃগস্য তথৈবান্তরামৈথুনং মমাপি মরণপ্রাপ্তি–নিশ্চয়াৎ, ন তু ক্লীবত্বাৎ।
এই শ্লোকার্থে পাণ্ডুকে কেউ যদি কোনওভাবে ক্লীব বলেন, সেই রকম একটা আশঙ্কা এবং নিজস্ব কিছু পূর্ব-সচেতনতা আছে বলেই নীলকণ্ঠের মতো টীকাকারও এই মুহূর্তে চিন্তিত। নইলে, মুনির অভিশাপে স্ত্রী সঙ্গ মাত্রেই পাণ্ডুর মৃত্যু নির্ধারিত হয়েছে। এখানে পূর্বোপহত জননশক্তি মুনির শাপে নষ্ট হয়েছে– এ কথা বলার মানেই হল– প্রজননের ক্ষেত্রে পাণ্ডুর সমস্যা ছিল এবং তা পূর্বেই ছিল–যথৈবোপহতং পুরা।
পাণ্ডু সেই গোপন কথা স্ত্রীদের জানাননি। এখন তিনি সমাজ-সম্মত অন্য কোনও উপায়ে পুত্র লাভ করতে চাইছেন। পাণ্ডু মনু-কথিত ধর্ম শাস্ত্রের বচন অনুসারে ছয় রকমের পুত্রের কথা বলেছেন, যারা অনায়াসেই পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকারী হতে পারে– ইমে বৈ বন্ধুদায়াদাঃ ষট পুত্রা ধর্মদর্শনে। পৃথে। বিবাহিতা স্ত্রীর গর্ভে ঔরসজাত সন্তান ছাড়াও যে সমস্ত পুত্র পিতৃ-সম্পত্তির অধিকারী হতে পারে– এই কথাটা এই মুহূর্তে কুন্তীর কাছে বলা মানেই রাজ্যপাটের উত্তরাধিকার নিয়ে পাণ্ডুর সচেতনতা আছে। অর্থাৎ আধুনিকেরা প্রাচীনদের পুত্রোৎপাদনের মর্ম নিয়ে যে অভিসন্ধির কথাটা বলেন– সেটা তাহলে মিথ্যে নয়।
